২০২৬-২৭ অর্থবছরের চূড়ান্ত বাজেটে সিগারেটের মূল্যস্তর পুনর্গঠন, সুনির্দিষ্ট শুল্ক (Specific Tax) আরোপ এবং সব ধরনের তামাকপণ্যের কার্যকর মূল্যবৃদ্ধির দাবি জানিয়েছেন অর্থনীতিবিদ, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও তামাকবিরোধী সংগঠনের নেতারা। তাদের মতে, এ পদক্ষেপ বাস্তবায়িত হলে একদিকে যেমন ধূমপান কমবে, অন্যদিকে সরকারের রাজস্ব আয়ও উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাবে।
বৃহস্পতিবার জাতীয় প্রেস ক্লাবে গবেষণা ও অ্যাডভোকেসি প্রতিষ্ঠান ‘প্রজ্ঞা (প্রগতির জন্য জ্ঞান)’ এবং ‘অ্যান্টি টোব্যাকো মিডিয়া অ্যালায়েন্স (আত্মা)’ আয়োজিত বাজেট-পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে এ দাবি জানানো হয়।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থাপিত তথ্যে বলা হয়, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হিসাব অনুযায়ী ২০২৫ সালের তুলনায় ২০২৬ সালে মাথাপিছু আয় বেড়েছে ১০ দশমিক ২৭ শতাংশ। একই সময়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেড়েছে প্রায় ৩০ থেকে ৮৯ শতাংশ পর্যন্ত। কিন্তু দেশের সিগারেট বাজারের প্রায় ৭৫ শতাংশ দখল করে থাকা নিম্নস্তরের সিগারেটের দাম বাড়ানো হয়েছে মাত্র ৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ, অর্থাৎ প্রতি শলাকায় মাত্র ২০ পয়সা।
বক্তারা বলেন, মধ্যম, উচ্চ ও প্রিমিয়াম স্তরের সিগারেটের দাম যথাক্রমে ১৫ শতাংশ, ১৪ দশমিক ২৯ শতাংশ এবং ১৩ দশমিক ৫১ শতাংশ বাড়ানো হলেও করহার অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। ফলে মূল্যবৃদ্ধির একটি বড় অংশ সরাসরি তামাক কোম্পানির মুনাফায় যোগ হচ্ছে। উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়, প্রিমিয়াম স্তরের প্রতি প্যাকেট সিগারেটের দাম ২৫ টাকা বাড়লেও এর মধ্যে প্রায় ৪ টাকা ২৫ পয়সা কোম্পানির কাছেই থেকে যাবে।
তামাকবিরোধী নেতারা অভিযোগ করেন, প্রস্তাবিত বাজেটে বিড়ি, জর্দা ও গুলের দাম এবং করহার অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে নিকোটিন পাউচ ও হিটেড টোব্যাকো পণ্যের ওপর শুল্ক আরোপের মাধ্যমে নতুন ধরনের তামাকপণ্য বাজারে আরও বিস্তারের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. রুমানা হক বলেন, নিম্ন ও মধ্যম স্তরের সিগারেট একীভূত করে প্রতি ১০ শলাকার খুচরা মূল্য ১০০ টাকা নির্ধারণ এবং বিদ্যমান করের পাশাপাশি সব স্তরে ৪ টাকা সুনির্দিষ্ট শুল্ক আরোপ করলে রাজস্ব বৃদ্ধি ও জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা—উভয় লক্ষ্যই অর্জন সম্ভব।
ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরামের (ইআরএফ) সভাপতি দৌলত আকতার মালা বলেন, তরুণ ও নিম্নআয়ের জনগোষ্ঠীর নাগালের বাইরে নিতে সব ধরনের তামাকপণ্যের দাম আরও বাড়ানো প্রয়োজন।
সংবাদ সম্মেলনে প্রজ্ঞার পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, তাদের প্রস্তাবিত কর ও মূল্যকাঠামো বাস্তবায়িত হলে সরকারের অতিরিক্ত প্রায় ৪৪ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আয় সম্ভব। একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদে প্রায় ৪ লাখ মানুষের অকালমৃত্যু প্রতিরোধ করা যাবে, প্রায় ৫ লাখ প্রাপ্তবয়স্ক ধূমপান ত্যাগে উৎসাহিত হবেন এবং ৩ লাখ ৭২ হাজারের বেশি তরুণ ধূমপান শুরু করা থেকে বিরত থাকবে।
অনুষ্ঠানে আত্মার কো-কনভেনর নাদিরা কিরণের সঞ্চালনায় বক্তব্য দেন ডেইলি টাইমস অব বাংলাদেশের হেড অব অনলাইন (বাংলা) মো. মনির হোসেন লিটন, সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) প্রোগ্রাম অ্যাসোসিয়েট আয়েশা সুহায়মা রব, আত্মার কনভেনর মর্তুজা হায়দার লিটন, কো-কনভেনর মিজান চৌধুরী, প্রজ্ঞার নির্বাহী পরিচালক এবিএম জুবায়েরসহ বিভিন্ন তামাকবিরোধী সংগঠনের প্রতিনিধিরা। অনুষ্ঠানে প্রস্তাবিত বাজেটের বিশ্লেষণ ও সুপারিশ তুলে ধরেন প্রজ্ঞার হেড অব প্রোগ্রামস হাসান শাহরিয়ার।

মো. জাকির হোসাইন,স্টাফ রিপোর্টার