ড. ইউনূস: ভিলেন নাকি ক্রান্তিকালের নায়ক?

  • মোঃ জাকির হোসাইন,সম্পাদক
  • আপলোড সময় : ২৮ জুন ২০২৬, ১০:৫৮ দুপুর
  • ২১৫৫৩ বার পড়া হয়েছে

Banner Ad
https://prothomdorpan.com/admin/fav-icon-logo/image/1761146741.250..125.jpg

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক বাস্তবতায় ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে ঘিরে বিতর্ক যেন থামছেই না। একদিকে কেউ তাকে রাষ্ট্র পুনর্গঠনের সাহসী কারিগর হিসেবে দেখছেন, অন্যদিকে একটি মহল তাকে পরিকল্পিতভাবে ‘ভিলেন’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করছে। প্রশ্ন হলো—ইতিহাস কি তাকে সমালোচকদের ভাষায় মূল্যায়ন করবে, নাকি সংকটময় সময়ে রাষ্ট্রের হাল ধরা একজন দূরদর্শী নেতৃত্ব হিসেবে স্মরণ করবে?

২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশ যখন রাজনৈতিক অস্থিরতা, প্রশাসনিক ভঙ্গুরতা এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল, ঠিক সেই সময় অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব নেন শান্তিতে নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস। তার সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল ভেঙে পড়া রাষ্ট্রব্যবস্থাকে স্থিতিশীল করা এবং একটি গ্রহণযোগ্য গণতান্ত্রিক উত্তরণের পথ তৈরি করা।

ড. ইউনূসের নেতৃত্বে রাষ্ট্র সংস্কারের যে উদ্যোগ নেওয়া হয়, তার কেন্দ্রবিন্দু ছিল ব্যক্তি নয়—প্রতিষ্ঠান। সংবিধান, নির্বাচন ব্যবস্থা, বিচার বিভাগ, জনপ্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন ও দুর্নীতি দমন কমিশনসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ খাতে সংস্কারের রূপরেখা প্রণয়ন করা হয়। উদ্দেশ্য ছিল এমন একটি রাষ্ট্রকাঠামো গড়ে তোলা, যেখানে ভবিষ্যতে কোনো ব্যক্তি বা দল সহজে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করতে না পারে।

নির্বাচন ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা ফিরিয়ে আনা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা জোরদার করা, ব্যাংকিং খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা, অর্থপাচারের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে নেওয়া পদক্ষেপগুলো তার সরকারের গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হিসেবে আলোচিত হয়। একই সঙ্গে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, মানবাধিকার সুরক্ষা এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি পুনর্গঠনের চেষ্টাও প্রশংসিত হয়েছে।

পররাষ্ট্রনীতিতেও ড. ইউনূস ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান গ্রহণের চেষ্টা করেন। যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, চীন, ভারত ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের পাশাপাশি বাংলাদেশের মর্যাদা ও স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার নীতি অনুসরণ করা হয়। তার আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা দেশের জন্য নতুন কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সুযোগ তৈরিতে সহায়ক হয়েছে বলেও অনেকের মূল্যায়ন।

তবে সব অর্জনের পরও সীমাবদ্ধতা ছিল। আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির দ্রুত উন্নয়ন, বাজার নিয়ন্ত্রণ এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে আনা—এসব ক্ষেত্রে সরকার প্রত্যাশিত সাফল্য অর্জন করতে পারেনি বলে সমালোচনা রয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলোর দ্রুত নির্বাচনের দাবি এবং দীর্ঘমেয়াদি সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করাও ছিল বড় চ্যালেঞ্জ।

কোনো রাষ্ট্রনায়কের মূল্যায়ন কেবল তার সমর্থক বা সমালোচকের ভাষ্যে হয় না; চূড়ান্ত বিচার করে ইতিহাস। তাই ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে নিয়ে আবেগ, বিদ্বেষ কিংবা রাজনৈতিক অবস্থান নয়, প্রয়োজন তথ্যনির্ভর ও নিরপেক্ষ মূল্যায়ন। তার সাফল্য যেমন আলোচনায় থাকবে, তেমনি সীমাবদ্ধতাও ইতিহাসে স্থান পাবে।

ড. ইউনূস ভিলেন, নাকি ক্রান্তিকালের নায়ক—এর উত্তর আজ নয়, সময়ই দেবে। তবে এটুকু নিশ্চিত, বাংলাদেশের এক সংকটময় সন্ধিক্ষণে তিনি এমন একটি দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন, যা সহজ ছিল না। সেই দায়িত্ব পালনের সাফল্য-ব্যর্থতার চূড়ান্ত রায় ইতিহাসের হাতেই ন্যস্ত থাকবে।




কমেন্ট করুন:

ফেসবুকে আমরা
সর্বশেষ সংবাদ
Sidebar Ad