সীমান্তে নতুন প্রতিরোধের গল্প: বিজিবির সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে পাহারায় জনতা

  • প্রথম দর্পণ,ডেস্ক
  • আপলোড সময় : ০১ জুলাই ২০২৬, ০৮:৪৪ সকাল
  • ১৬২৯৩ বার পড়া হয়েছে

Banner Ad
https://prothomdorpan.com/admin/fav-icon-logo/image/1761146741.250..125.jpg

পুশইন ও অনুপ্রবেশ ঠেকাতে সীমান্তজুড়ে রাতভর টহল; নারী-তরুণদের সক্রিয় অংশগ্রহণ, অবকাঠামো উন্নয়নের দাবি স্থানীয়দের

বাংলাদেশের সীমান্তজুড়ে অনুপ্রবেশ ও কথিত পুশইনের আশঙ্কা মোকাবিলায় নতুন ধরনের জনসম্পৃক্ত প্রতিরোধ গড়ে উঠেছে। সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিজিবি)-এর পাশাপাশি স্থানীয় নারী, পুরুষ ও তরুণরা রাত জেগে পাহারা দিচ্ছেন। টর্চ, বাঁশি ও মাইকের মাধ্যমে সতর্কবার্তা ছড়িয়ে দিয়ে তারা সীমান্তে যেকোনো সন্দেহজনক তৎপরতা প্রতিহত করতে সহায়তা করছেন। স্থানীয়দের মতে, নিজেদের নিরাপত্তা ও দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষার দায়িত্ববোধ থেকেই এই স্বতঃস্ফূর্ত উদ্যোগ।

গত ২০ থেকে ২৪ জুন কুড়িগ্রাম, পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও, লালমনিরহাট, নওগাঁ ও জয়পুরহাটের বিভিন্ন সীমান্ত এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, সীমান্তে বিজিবির টহলের পাশাপাশি গ্রামবাসীও নিয়মিত নজরদারিতে অংশ নিচ্ছেন। বিজিবির সঙ্গে সমন্বয় করে তারা তথ্য আদান-প্রদান করছেন এবং যেকোনো অস্বাভাবিক পরিস্থিতিতে দ্রুত সতর্কবার্তা পৌঁছে দিচ্ছেন।

বিজিবির কয়েকজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, স্থানীয় জনগণের এই অংশগ্রহণ সীমান্তে নিরাপত্তা জোরদারে কার্যকর ভূমিকা রাখছে। ৫৬ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল সিরাজুল ইসলাম বলেন, পুশইনসহ সীমান্তের যেকোনো অপতৎপরতা প্রতিরোধে বিজিবি সর্বোচ্চ সতর্ক রয়েছে। তিনি জানান, বিজিবির পাশাপাশি আনসার-ভিডিপি সদস্য এবং স্থানীয় গ্রামবাসীও যৌথভাবে রাতের টহলে অংশ নিচ্ছেন।

সীমান্তবাসীর সাহসী অবস্থান

কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলার খলিশা কোটাল সীমান্তের বাসিন্দা সিরাজুল ইসলাম জানান, অতীতে বিএসএফের গুলিতে তার দুই ভাই নিহত হন। সেই স্মৃতি আজও বেদনাদায়ক হলেও এখন আর ভয় নয়, বরং নিজেদের জমি ও দেশের সীমান্ত রক্ষার দৃঢ় প্রত্যয় নিয়েই তারা মাঠে রয়েছেন।

একইভাবে ধুলারকুটি সীমান্তের বাসিন্দা রাসেল মিয়া কিশোর বয়সে বিএসএফের ছোড়া রাবার বুলেটে এক চোখের দৃষ্টিশক্তি হারান। স্থানীয়দের মতে, এমন বহু তিক্ত অভিজ্ঞতাই সীমান্তবাসীকে আজ আরও সচেতন ও ঐক্যবদ্ধ করেছে।

নারীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ

পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়া সীমান্তে দেখা গেছে, পুরুষদের পাশাপাশি নারীরাও নিরাপত্তা কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। স্থানীয় বাসিন্দা ফিরোজা খাতুন বলেন, সীমান্তে কোনো অস্বাভাবিক তৎপরতা চোখে পড়লেই তিনি দ্রুত বিজিবিকে খবর দেন এবং গ্রামবাসীকে সতর্ক করেন।

স্থানীয় কৃষক তাজুল ইসলাম বলেন, অনেক সময় নারীরাই সবার আগে এগিয়ে এসে লোকজনকে একত্রিত করেন। তাদের দ্রুত উপস্থিতি ও সচেতনতায় অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি মোকাবিলা সহজ হয়।

তরুণদের রাতভর পাহারা

স্থানীয় তরুণরাও সীমান্ত নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। এইচএসসি পরীক্ষার্থী শুভ পাটোয়ারী জানান, সন্দেহজনক কোনো খবর পেলেই তারা বিজিবির সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং রাতভর পাহারায় অংশ নেন। প্রয়োজন হলে মাইকিং করে পুরো গ্রামকে সতর্ক করা হয়।

তার ভাষায়, দেশের নিরাপত্তার প্রশ্নে সীমান্তের তরুণরা সবসময় প্রস্তুত।

পুশইন ইস্যুতে কূটনৈতিক তৎপরতা

কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে, সাম্প্রতিক সময়ে ভারতের বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে জোরপূর্বক মানুষ ঠেলে দেওয়ার অভিযোগ নিয়ে দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মধ্যে একাধিক পতাকা বৈঠক হয়েছে। বাংলাদেশ সরকারও বিষয়টি নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।

বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক আইন ও দ্বিপক্ষীয় প্রক্রিয়া অনুসরণ ছাড়া কোনো ব্যক্তিকে সীমান্তে ফেরত পাঠানো গ্রহণযোগ্য নয়। নাগরিকত্ব যাচাই এবং নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই এ ধরনের বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।

অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা

অনুসন্ধানে সীমান্ত এলাকার একটি বড় সমস্যা হিসেবে সামনে এসেছে যোগাযোগব্যবস্থার দুর্বলতা। স্থানীয়রা জানান, সীমান্তসংলগ্ন অনেক এলাকায় এখনো উন্নত সড়ক না থাকায় জরুরি পরিস্থিতিতে বিজিবির দ্রুত পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়ে।

বিজিবির কর্মকর্তারাও বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, অনেক সময় ভাঙাচোরা পথ কিংবা সাইকেলে করেই টহল দিতে হয়। সীমান্ত সড়ক উন্নয়ন করা গেলে নিরাপত্তা কার্যক্রম আরও কার্যকর হবে।

সীমান্তে সতর্কতার নতুন বাস্তবতা

সীমান্তজুড়ে এখন নিরাপত্তা ব্যবস্থায় একটি নতুন বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। বিজিবির পেশাদার দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি স্থানীয় জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ সীমান্তে নজরদারি আরও শক্তিশালী করেছে। বিশেষ করে নারী ও তরুণদের সক্রিয় উপস্থিতি সীমান্ত এলাকায় সচেতনতা ও প্রতিরোধের নতুন দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখা হচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, সীমান্ত নিরাপত্তা টেকসই করতে জনসম্পৃক্ত উদ্যোগের পাশাপাশি আধুনিক অবকাঠামো, উন্নত যোগাযোগব্যবস্থা এবং কূটনৈতিক তৎপরতা আরও জোরদার করা প্রয়োজন।




কমেন্ট করুন:

ফেসবুকে আমরা
সর্বশেষ সংবাদ
Sidebar Ad