দেশের রপ্তানি আয়ের প্রধান চালিকাশক্তি তৈরি পোশাক (আরএমজি) খাত আবারও বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। ২০২৬ সালের প্রথম চার মাসে বাংলাদেশের প্রধান দুই রপ্তানি গন্তব্য—ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) ও যুক্তরাষ্ট্রে পোশাক রপ্তানিতে উল্লেখযোগ্য পতন ঘটেছে। ক্রয়াদেশ কমে যাওয়া, আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদা হ্রাস এবং মূল্য কমে যাওয়ায় উদ্বেগ বেড়েছে রপ্তানিকারক ও শিল্প উদ্যোক্তাদের মধ্যে।
দেশের মোট রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশের বেশি আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে। এর মধ্যে প্রায় ৭০ শতাংশ রপ্তানি হয় যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে। ফলে এসব বাজারে চাহিদা কমে যাওয়ায় শুধু রপ্তানি আয়ই নয়, শিল্প উৎপাদন, কর্মসংস্থান এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের পরিসংখ্যান সংস্থা ইউরোস্ট্যাট-এর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত ইইউতে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৯ দশমিক ৩৩ শতাংশ কমেছে। চার মাসে রপ্তানি আয় দাঁড়িয়েছে ৬০৮ দশমিক ৬২ কোটি ইউরো, যা ২০২৫ সালের একই সময়ে ছিল ৭৫৪ দশমিক ৪৭ কোটি ইউরো। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে প্রায় ১৪৬ কোটি ইউরো রপ্তানি আয় কমেছে।
এপ্রিল মাসের চিত্রও একই রকম। ওই মাসে ইইউতে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি কমেছে ১৯ দশমিক ৫৩ শতাংশ। রপ্তানি হয়েছে ১৪৯ দশমিক ৪৭ কোটি ইউরোর পোশাক, যেখানে আগের বছরের এপ্রিল মাসে এ পরিমাণ ছিল ১৮৫ দশমিক ৭৫ কোটি ইউরো।
ইইউর তথ্য বলছে, চলতি বছরের প্রথম চার মাসে বিশ্ববাজার থেকে তাদের মোট পোশাক আমদানি কমেছে ১০ দশমিক ৪২ শতাংশ। তবে বাংলাদেশের রপ্তানি কমেছে তার চেয়েও বেশি, যা দেশের বাজার অংশীদারিত্ব ধরে রাখার ক্ষেত্রে নতুন উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোর মধ্যে চীন থেকে ইইউর পোশাক আমদানি কমেছে ৪ দশমিক ৭০ শতাংশ, তুরস্ক থেকে ১৬ দশমিক ৬০ শতাংশ, ভারত থেকে ১২ দশমিক ১০ শতাংশ এবং ভিয়েতনাম থেকে মাত্র ০ দশমিক ৭০ শতাংশ। ফলে শীর্ষ ১০ সরবরাহকারী দেশের মধ্যে সবচেয়ে বেশি পতন হয়েছে বাংলাদেশের।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারেও একই ধরনের চিত্র দেখা গেছে। দেশটির অফিস অব টেক্সটাইলস অ্যান্ড অ্যাপারেল (ওটেক্সা)-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম চার মাসে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রে ২৯৮ কোটি ডলারের তৈরি পোশাক রপ্তানি করেছে, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১১ দশমিক ২৪ শতাংশ কম।
শুধু রপ্তানি আয় নয়, ইউনিটপ্রতি গড় মূল্য এবং রপ্তানির পরিমাণ—উভয় ক্ষেত্রেই পতন ঘটেছে। এ সময়ে ইউনিটপ্রতি গড় মূল্য কমেছে ২ দশমিক ৪৫ শতাংশ এবং রপ্তানির পরিমাণ কমেছে ৯ দশমিক ১ শতাংশ।
রপ্তানিকারকদের মতে, গত বছর যুক্তরাষ্ট্রে আরোপিত অতিরিক্ত শুল্ক এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার প্রভাব এখনো বাজারে বিদ্যমান। পাশাপাশি উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও সুদের হারের কারণে মার্কিন ভোক্তাদের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ায় পোশাকের চাহিদাও সংকুচিত হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, যদিও যুক্তরাষ্ট্রে চীন ও ভারতের রপ্তানিও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে, তবু সেই সুযোগ পুরোপুরি কাজে লাগাতে পারেনি বাংলাদেশ। বরং একই সময়ে ভিয়েতনামের রপ্তানি ১ দশমিক ৩১ শতাংশ এবং কম্বোডিয়ার রপ্তানি ১৪ দশমিক ৭ শতাংশ বেড়েছে, যা প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।
এদিকে রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি)-এর তথ্য অনুযায়ী, সদ্য সমাপ্ত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের মোট পণ্য রপ্তানি আয় আগের অর্থবছরের তুলনায় ০ দশমিক ৫৮ শতাংশ কমে ৪৮ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে। অর্থবছরের শেষ মাস জুনে প্রায় ২৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হলেও আগের মাসগুলোর নেতিবাচক প্রবণতা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়নি। ফলে সরকারের নির্ধারিত ৫৫ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি লক্ষ্যমাত্রাও অর্জিত হয়নি।
অর্থনীতিবিদদের মতে, বৈশ্বিক বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়ার পাশাপাশি ক্রেতাদের পরিবর্তিত চাহিদার সঙ্গে দ্রুত খাপ খাওয়ানো, পণ্যের বৈচিত্র্য বৃদ্ধি, উৎপাদন ব্যয় কমানো এবং নতুন বাজার সম্প্রসারণের উদ্যোগ না নিলে দেশের তৈরি পোশাক খাতের ওপর চাপ আরও বাড়তে পারে।

প্রথম দর্পণ,ডেস্ক