রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যা মামলায় সামরিক আদালতের রায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত পলাতক মেজর (অব.) মোজাফফর হোসেনকে ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট থেকে চট্টগ্রাম ক্যান্টনমেন্টে নেওয়া হয়েছে। সেনাবাহিনীর উচ্চপর্যায়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী গত ১৭ জুলাই তাকে চট্টগ্রাম সেনানিবাসে স্থানান্তর করা হয়, যেখানে ১৯৮১ সালের বহুল আলোচিত এই হত্যাকাণ্ডের বিচার অনুষ্ঠিত হয়েছিল। সংশ্লিষ্ট একাধিক বিশ্বস্ত সূত্র এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।
দীর্ঘ প্রায় ৪৫ বছর আত্মগোপনে থাকার পর গত বুধবার রাতে রাজধানীর বনানী ডিওএইচএস এলাকা থেকে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) তাকে গ্রেপ্তার করে। বৃহস্পতিবার বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে এবং একই দিন সন্ধ্যায় তাকে সেনাবাহিনীর হেফাজতে হস্তান্তর করা হয়। পরে সামরিক কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তে তাকে চট্টগ্রাম ক্যান্টনমেন্টে পাঠানো হয়।
১৯৮১ সালের ৩০ মে ভোরে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিহত হন। পরবর্তী সময়ে সামরিক আদালতে এ হত্যাকাণ্ডের বিচার হয় এবং কয়েকজন সেনা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডসহ বিভিন্ন সাজা ঘোষণা করা হয়। সে সময় মেজর পদমর্যাদার কর্মকর্তা মোজাফফর হোসেন রাষ্ট্রপতি জিয়ার হত্যাকাণ্ড ও মরদেহ গোপনের ঘটনায় জড়িত ছিলেন বলে অভিযোগ ওঠে। রায় ঘোষণার পর তিনি পালিয়ে যান এবং তাকে ধরিয়ে দিতে পুরস্কারও ঘোষণা করা হয়েছিল।
সামরিক সূত্র জানায়, গ্রেপ্তারের পর মোজাফফর হোসেনের বিরুদ্ধে আইনি প্রক্রিয়া দুই ধাপে সম্পন্ন হবে। প্রথমে সেনাবাহিনী থেকে পলায়নের অভিযোগে সামরিক আইন অনুযায়ী বিচার হবে। এরপর রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যা মামলায় সামরিক আদালতের পূর্বঘোষিত মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হবে।
ভারতে আত্মগোপন ও ছদ্মনাম ব্যবহারের তথ্য
অনুসন্ধানে জানা গেছে, স্বাধীনতার পর মোজাফফর হোসেন জাতীয় রক্ষীবাহিনীতে কমিশন লাভ করেন। পরে রক্ষীবাহিনী বিলুপ্ত হলে তিনি সেনাবাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত হন। ১৯৮১ সালে তিনি ২৪ পদাতিক ডিভিশনে কর্মরত ছিলেন।
হত্যাকাণ্ডের পর তিনি ভারতে পালিয়ে যান এবং দীর্ঘদিন সেখানে আত্মগোপনে ছিলেন বলে দাবি করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তিনি কলকাতায় অবস্থানকালে ‘বিপ্লব সরকার’ ও ‘জয় ব্যানার্জি’ নামে ছদ্মনাম ব্যবহার করতেন। ১৯৯৬ সালে গোপনে দেশে ফিরে এসে দীর্ঘদিন পরিচয় গোপন রেখে বসবাস করেন।
কললিস্টের সূত্রে অবস্থান শনাক্তের দাবি
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, সম্প্রতি গ্রেপ্তার হওয়া অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর মোবাইল ফোনের কললিস্ট ও যোগাযোগের তথ্য বিশ্লেষণ করে গোয়েন্দারা মোজাফফর হোসেনের অবস্থান সম্পর্কে ধারণা পান। তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো বক্তব্য দেয়নি।
নতুন তদন্তের দাবি
নিরাপত্তা-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্রের মতে, রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যা, পরবর্তী সময়ে মেজর জেনারেল এম. এ. মঞ্জুরের মৃত্যু এবং তৎকালীন রাজনৈতিক-সামরিক ঘটনাপ্রবাহের পেছনের প্রকৃত নেপথ্য কারণ উদ্ঘাটনে নতুন করে বিস্তৃত তদন্তের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
এ প্রেক্ষাপটে সামরিক ও বেসামরিক সংস্থার সমন্বয়ে একটি জাতীয় তদন্ত কমিশন গঠনের বিষয়েও আলোচনা চলছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে। কমিশন গঠিত হলে সেনাবাহিনী, ডিজিএফআই, এনএসআই, এএফডি, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পুলিশের বিশেষায়িত কর্মকর্তাদের অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে বলেও জানা গেছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা
মোজাফফর হোসেন গ্রেপ্তারের খবর প্রকাশের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। বিভিন্ন মহল এ ঘটনাকে দীর্ঘদিনের আলোচিত একটি হত্যাকাণ্ডের বিচারিক প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে দেখছেন। পাশাপাশি অনেকেই নিরপেক্ষ ও পূর্ণাঙ্গ তদন্তের মাধ্যমে ১৯৮১ সালের ঘটনাবলির সব দিক জনসমক্ষে তুলে ধরার আহ্বান জানিয়েছেন।

এইচএম মোকাদ্দেস,নির্বাহী সম্পাদক