তেল, দুধ ও চিনিতেও মিলছে মাইক্রোপ্লাস্টিক, বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি

  • প্রথম দর্পণ,ডেস্ক
  • আপলোড সময় : ৩০ জুলাই ২০২৬, ০২:৩৪ দুপুর
  • ৩০৯৯ বার পড়া হয়েছে

Banner Ad
https://prothomdorpan.com/admin/fav-icon-logo/image/1761146741.250..125.jpg

টুথপেস্টে ক্ষতিকর মাইক্রোপ্লাস্টিক বা অতি ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণার উপস্থিতি নিয়ে আলোচনার মধ্যেই এবার নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্য—সয়াবিন তেল, দুধ ও চিনিতেও উদ্বেগজনক মাত্রায় মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতির প্রমাণ মিলেছে। সাম্প্রতিক কয়েকটি গবেষণার ফলাফল জনস্বাস্থ্য নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।

গবেষকদের মতে, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, প্লাস্টিকের প্যাকেজিং এবং পরিবেশ দূষণের কারণে এসব খাদ্যে বিষাক্ত প্লাস্টিক কণা প্রবেশ করছে। দীর্ঘমেয়াদে এসব কণা মানবদেহে নানা ধরনের জটিল স্বাস্থ্যঝুঁকি সৃষ্টি করতে পারে।

খাদ্যে কতটা মাইক্রোপ্লাস্টিক?

গবেষণা অনুযায়ী, একজন প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি শুধু সয়াবিন তেলের মাধ্যমেই প্রতিদিন গড়ে ১৭ দশমিক ৬৫টি এবং বছরে প্রায় ৬ হাজার ৪৪১টি মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা গ্রহণ করছেন। অন্যদিকে একজন শিশু প্রতিদিন গড়ে ৭৭ দশমিক ২১টি এবং বছরে প্রায় ২৮ হাজার ১৮০টি প্লাস্টিক কণা খাদ্যের সঙ্গে গ্রহণ করছে, যা বিশেষজ্ঞদের মতে অত্যন্ত উদ্বেগজনক।

গবেষণায় দেখা গেছে, খোলা সয়াবিন তেলের প্রতি লিটারে প্রায় ৪৫ হাজার থেকে ৭০ হাজার এবং বোতলজাত সয়াবিন তেলের প্রতি লিটারে ৪৪ হাজার থেকে ৫৪ হাজার পর্যন্ত মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা রয়েছে।

দুধেও মিলেছে একই ধরনের দূষণ। প্রসেসড বা প্যাকেটজাত দুধের প্রতি ১০ মিলিলিটারে গড়ে ১৫৬ দশমিক ০৬টি এবং কাঁচা দুধের প্রতি ১০ মিলিলিটারে গড়ে ৯৩ দশমিক ৩৯টি মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা শনাক্ত হয়েছে।

চিনির ক্ষেত্রেও উদ্বেগজনক তথ্য উঠে এসেছে। প্রতি কেজি খোলা চিনিতে গড়ে প্রায় ৪০৩টি এবং প্যাকেটজাত ব্র্যান্ডের চিনিতে গড়ে প্রায় ৩২২টি মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা পাওয়া গেছে।

যেভাবে খাবারে প্রবেশ করছে প্লাস্টিক

গবেষকেরা খাদ্যে মাইক্রোপ্লাস্টিক প্রবেশের তিনটি প্রধান উৎস চিহ্নিত করেছেন—

প্লাস্টিকের বোতল, প্যাকেট ও বস্তার মতো প্যাকেজিং উপকরণ।

খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি, প্লাস্টিক ও অ্যালুমিনিয়ামের পাইপ এবং প্লাস্টিকের গ্লাভস।

পরিবেশ দূষণের কারণে মাটি, পানি ও বাতাসে ছড়িয়ে থাকা প্লাস্টিক বর্জ্য খাদ্যচক্রে প্রবেশ করা।

বাংলাদেশে প্রতিদিন প্রায় ৮ হাজার টন প্লাস্টিক বর্জ্য উৎপন্ন হলেও এর অর্ধেকের বেশি সঠিকভাবে ব্যবস্থাপনা করা হয় না, যা দূষণের অন্যতম কারণ বলে উল্লেখ করেছেন গবেষকেরা।

গবেষণায় যা উঠে এসেছে

যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টি ও খাদ্যপ্রযুক্তি বিভাগের অধ্যাপক মো. ওমর ফারুকের নেতৃত্বে পরিচালিত এক গবেষণায় দুধে পিটিএফই (টেফলন), পিইটি, নাইলন-৬ এবং পিভিসির মতো বিভিন্ন ধরনের প্লাস্টিক পলিমার শনাক্ত হয়েছে।

তার ভাষ্য, খামার থেকে সংগ্রহ, পরিবহন এবং প্রক্রিয়াজাতকরণের প্রতিটি ধাপেই দুধ প্লাস্টিকের সংস্পর্শে আসে। ফলে শিশুরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।

এদিকে আন্তর্জাতিক সাময়িকী জার্নাল অব ফুড কম্পোজিশন অ্যান্ড অ্যানালিসিস-এ প্রকাশিত জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ও বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস (বিইউপি)-এর যৌথ গবেষণায় সয়াবিন তেলে অত্যন্ত উচ্চমাত্রার মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি উঠে এসেছে।

গবেষণা দলের প্রধান, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক ড. শফি মুহাম্মদ তারেক এ পরিস্থিতিকে ‘ভয়াবহ’ উল্লেখ করে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।

একই সাময়িকীতে প্রকাশিত আরেক গবেষণায় ঢাকায় বিক্রি হওয়া সাত ধরনের চিনিতে ১২ মাইক্রোমিটার থেকে ৩ দশমিক ১৯ মিলিমিটার আকারের প্লাস্টিক কণা শনাক্ত হয়েছে। গবেষকদের মতে, পরিবহন ও প্লাস্টিকের বস্তা ব্যবহারের কারণেই এ দূষণ ঘটছে।

এর আগে দেশের বাজারে বিক্রি হওয়া ১৯টি ব্র্যান্ডের ৩৪টি টুথপেস্ট পরীক্ষা করে ২৬টিতে মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া যায়। শিশুদের জন্য তৈরি ছয়টি টুথপেস্টের চারটিতেও এ ধরনের কণার উপস্থিতি শনাক্ত হয়েছিল।

স্বাস্থ্যঝুঁকি কতটা?

আন্তর্জাতিক গবেষকদের মতে, ১৩০ মাইক্রোমিটারের চেয়ে ছোট প্লাস্টিক কণা সরাসরি মানুষের রক্তে প্রবেশ করতে পারে।

লন্ডনের ইম্পেরিয়াল কলেজের গবেষক স্টেফানি রাইট জানিয়েছেন, উচ্চ তাপমাত্রা বা গরম পানির সংস্পর্শে প্লাস্টিক থেকে আরও বেশি কণা নির্গত হয়। এসব কণা পরিপাকতন্ত্রের সমস্যা, হরমোনের ভারসাম্যহীনতা, প্রদাহ এবং দীর্ঘমেয়াদে বিভিন্ন অঙ্গের কোষের ক্ষতির কারণ হতে পারে।

বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণায় মানুষের হৃদযন্ত্রের ধমনী, জয়েন্ট, কঙ্কাল পেশি এবং মস্তিষ্কেও মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। নিউ মেক্সিকো বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ম্যাথিউ ক্যাম্পেন জানিয়েছেন, ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত মৃত ব্যক্তিদের মস্তিষ্কে সুস্থ মানুষের তুলনায় প্রায় ১০ গুণ বেশি প্লাস্টিক কণা পাওয়া গেছে।

জাতিসংঘ পরিবেশ কর্মসূচি (ইউএনইপি)-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালে বিশ্বে প্রায় ২৭ লাখ টন মাইক্রোপ্লাস্টিক পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ে। ২০৪০ সালের মধ্যে এ পরিমাণ দ্বিগুণ হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

বিএসটিআই ও সরকারের অবস্থান

বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই) জানিয়েছে, বিষয়টি নিয়ে অযথা আতঙ্কিত না হয়ে সচেতন থাকতে হবে। পূর্ণাঙ্গ বৈজ্ঞানিক ও আইনগত যাচাই ছাড়া কোনো ব্র্যান্ড বা পণ্যকে অনিরাপদ ঘোষণা করা সমীচীন নয়। প্রতিষ্ঠানটি গবেষণা সংস্থা, প্রস্তুতকারক ও আমদানিকারকদের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করছে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের কথা জানিয়েছে।

সরকারের তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান বলেছেন, মাইক্রোপ্লাস্টিক এখন বৈশ্বিক জনস্বাস্থ্যের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। শুধু টুথপেস্ট নয়, খাবার ও পানিতেও এ দূষণ ছড়িয়ে পড়েছে। জননিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে তিনি জানান।




কমেন্ট করুন:

ফেসবুকে আমরা
সর্বশেষ সংবাদ
Sidebar Ad