‘একজনকে মারতে কতগুলো গুলি লাগে স্যার?’ — পুলিশের গুলিতে ঝাঁজরা পুলিশ কর্মকর্তার ছেলে শহীদ তাইম

  • প্রথম দর্পণ,ডেস্ক
  • আপলোড সময় : ২০ জুলাই ২০২৬, ১০:৩৪ দুপুর
  • ৫৮২৯ বার পড়া হয়েছে

Banner Ad
https://prothomdorpan.com/admin/fav-icon-logo/image/1761146741.250..125.jpg

‘একজনকে মারতে কতগুলো গুলি লাগে স্যার?’— ছেলের গুলিবিদ্ধ মরদেহ দেখে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার উদ্দেশে পুলিশের এক এসআই বাবার এই প্রশ্নটি আজও নাড়া দেয় অনেককে। ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনে পুলিশের গুলিতে নিহত হন রাজারবাগ পুলিশ লাইনসে কর্মরত এসআই ময়নুল হোসেনের ছেলে ইমাম হাসান ভূঁইয়া তাইম (১৯)। রাষ্ট্রের সেবায় বাবার মতো পুলিশ কর্মকর্তা হওয়ার স্বপ্ন দেখা এই তরুণের জীবন শেষ হয় পুলিশের গুলিতেই।

২০২৪ সালের ২০ জুলাই শিক্ষার্থীদের ৯ দফা দাবির আন্দোলন দমনে তৎকালীন সরকার কারফিউ জারি করলে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচি পালন করে। সেদিন বন্ধুদের সঙ্গে রাজধানীর যাত্রাবাড়ী এলাকায় আন্দোলনে অংশ নেন তাইম।

প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, আন্দোলন চলাকালে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস, সাউন্ড গ্রেনেড ও গুলি ছুড়লে পুরো এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। প্রাণ বাঁচাতে তাইম, রাহাত হোসাইন ও শাহরিয়ার আজাদ কাজলা এলাকার লিটন স্টোরে আশ্রয় নেন। পরে পুলিশ দোকানের শাটার খুলিয়ে তাদের বের করে এনে মারধর করে।

তাইমের বন্ধু রাহাত হোসাইন জানান, কয়েকজন পুলিশ সদস্য তাদের আটকে রেখে একপর্যায়ে দৌড়ে পালাতে বলেন। ভয়ে আপত্তি করলেও তাইম দৌড় দিলে পেছন থেকে তাকে গুলি করা হয়। গুলি তার শরীর ভেদ করে বেরিয়ে যায়। আহত অবস্থায়ও তিনি প্রাণ বাঁচানোর চেষ্টা করলেও মাটিতে লুটিয়ে পড়েন।

রাহাতের দাবি, পরে তিনি তাইমকে উদ্ধার করতে গেলে সেখানে উপস্থিত এক পুলিশ কর্মকর্তা, যাকে তিনি যাত্রাবাড়ী থানার তৎকালীন পরিদর্শক (তদন্ত) জাকির হিসেবে শনাক্ত করেন, খুব কাছ থেকে আবারও গুলি করেন। এ সময় তাইম নিজের বাবার পরিচয় দিয়ে জীবন ভিক্ষা চাইলেও কোনো লাভ হয়নি বলে অভিযোগ করেন তিনি।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে দেখা যায়, গুলিবিদ্ধ তাইমকে তার এক বন্ধু টেনে নিরাপদ স্থানে নেওয়ার চেষ্টা করছেন, আর সামনের দিক থেকে পুলিশ গুলি ছুড়ছে। ভিডিওটি সে সময় ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে।

রাহাত হোসাইন নিজেও তাইমকে উদ্ধার করতে গিয়ে গুলিবিদ্ধ হন। তিনি জানান, তখনও তাইম জীবিত ছিলেন এবং দুর্বল কণ্ঠে বলছিলেন, ‘ভাই, আমার শরীরে শক্তি নেই, তুমি ছেড়ে দাও।’

তাইমের আরেক বন্ধু শাহরিয়ার আজাদের গায়েও সেদিন পুলিশের লোগোযুক্ত একটি টি-শার্ট ছিল, যা তার বাবার। তার বাবা পুলিশ কনস্টেবল আজাদ ব্যাপারী। শাহরিয়ার পরে গণমাধ্যমকে বলেন, তিনি পুলিশ সদস্যদের কাছে বারবার অনুরোধ করেছিলেন, ‘ও পুলিশের ছেলে, ওকে বাঁচান।’ জবাবে একজন পুলিশ সদস্য তাকে সরে যেতে বলেন, নইলে তাকেও গুলি করার হুমকি দেওয়া হয়।

পরে কয়েকজন পুলিশ সদস্য গুলিবিদ্ধ তাইমকে একটি ভ্যানে তুলে নিয়ে যায়। খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে ছুটে এসে তাইমের মা পারভিন আক্তার শুধু ছেলের রক্তাক্ত চিহ্ন দেখতে পান।

পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গিয়ে এসআই ময়নুল হোসেন ও তার স্ত্রী পারভিন আক্তার ছেলের মরদেহ শনাক্ত করেন। ছেলের ঝাঁজরা বুক দেখে শোকে ভেঙে পড়েন তারা। সে সময় ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে ফোন করে এসআই ময়নুল হোসেনের কণ্ঠে উচ্চারিত প্রশ্ন—‘স্যার, আমার ছেলে আর নেই। বুলেটে ওর বুক ঝাঁজরা হয়ে গেছে। একজনকে মারতে কতগুলো গুলি লাগে স্যার?’—সারা দেশে আলোড়ন তোলে।

তাইমের বড় ভাই রবিউল বলেন, ‘বাবা ২৭ বছর ধরে পুলিশে চাকরি করছেন। দাদা পুলিশে ছিলেন, চাচা সেনাবাহিনীতে। আমার ভাইও পুলিশ হতে চাইত। অথচ তাকেই পুলিশ গুলি করে হত্যা করেছে। আমরা এই হত্যাকাণ্ডের দৃষ্টান্তমূলক বিচার চাই।’

জুলাই আন্দোলনের অন্যতম আলোচিত ও হৃদয়বিদারক ঘটনাগুলোর একটি হিসেবে ইমাম হাসান ভূঁইয়া তাইমের মৃত্যুর ঘটনা এখনও মানুষের স্মৃতিতে গভীরভাবে গেঁথে আছে। তার পরিবারের প্রত্যাশা—এই হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু তদন্ত এবং দায়ীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত হবে।




কমেন্ট করুন:

ফেসবুকে আমরা
সর্বশেষ সংবাদ
Sidebar Ad