জুলাই বিপ্লবে ছাত্র-জনতার ওপর সংঘটিত গুলিবর্ষণ ও সহিংস হামলার ঘটনায় চিহ্নিত আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের অধিকাংশ সশস্ত্র ক্যাডার এখনো আইনের আওতার বাইরে রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, সারা দেশে এ ধরনের ঘটনায় জড়িত প্রায় ২০০ জন অস্ত্রধারীকে শনাক্ত করা হলেও প্রায় দুই বছর পরও গ্রেপ্তার হয়েছে মাত্র ২৫ জন। বাকি অধিকাংশই পলাতক এবং তাদের অনেকেই সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে আশ্রয় নিয়েছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের সময় রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় পুলিশের পাশাপাশি সাদা পোশাকে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ ও স্বেচ্ছাসেবক লীগের নেতাকর্মীদের প্রকাশ্যে আগ্নেয়াস্ত্র হাতে গুলি চালাতে দেখা যায়। অনেক স্থানে তারা আন্দোলনকারী ছাত্র-জনতার ওপর লাঠিসোঁটা নিয়েও হামলা চালায়।
২০২৪ সালের ৬ অক্টোবর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত একটি ভিডিওতে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ৩৩ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর আসিফ আহমেদ সরকারকে ভারতের কলকাতার নিউ মার্কেট এলাকায় দেখা যায়। অভিযোগ রয়েছে, তিনি জুলাই আন্দোলনের সময় কাটা রাইফেল দিয়ে ছাত্রদের ওপর গুলি চালিয়েছিলেন। ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর তিনি দেশ ছেড়ে ভারতে পালিয়ে যান। তিনি সাবেক সেনাপ্রধান আজিজ আহমেদের ভাতিজা বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
জুলাই আন্দোলনের ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা সম্পর্কে জানতে চাইলে পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (জনসংযোগ ও মাল্টিমিডিয়া) এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন বলেন, জুলাই আন্দোলনকে কেন্দ্র করে সংঘটিত বেআইনি সশস্ত্র কর্মকাণ্ডের অভিযোগে আইনানুগ ব্যবস্থা চলমান রয়েছে। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তদন্ত-সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ৪ আগস্ট রাজধানীর মোহাম্মদপুরে ধারণ করা এক ভিডিওতে কাউন্সিলর আসিফ আহমেদের নেতৃত্বে স্থানীয় ছাত্রলীগ ও যুবলীগের নেতাকর্মীদের আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা ও গুলি চালাতে দেখা যায়।
একইভাবে মোহাম্মদপুরের বছিলা এলাকায় ধারণ করা আরেকটি ভিডিওতে গুলিবর্ষণকারী হিসেবে শনাক্ত হন ডিএনসিসির ৩৩ নম্বর ওয়ার্ডের আরেক সাবেক কাউন্সিলর তারেকুজ্জামান রাজীব (দরবেশ রাজীব)। আন্দোলনের পর তিনিও দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান বলে জানা যায়।
রাজধানীর মিরপুর-১০ গোলচত্বরে ৪ আগস্ট রিভলবার হাতে গুলি চালানোর অভিযোগ রয়েছে সাবেক সংসদ সদস্য এস এম জাহিদের বিরুদ্ধে। পুলিশ জানিয়েছে, তিনি বর্তমানে ভারতে অবস্থান করছেন।
ফেনীর মহিপাল এলাকায় ৪ আগস্ট বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনকারীদের ওপর হামলার সময় একে-৪৭ রাইফেল হাতে গুলি চালানোর ভিডিওতে দেখা যায় এক ব্যক্তিকে। পরে তাকে ফেনী জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সহসভাপতি জিয়াউদ্দিন বাবলু হিসেবে শনাক্ত করা হয়।
চট্টগ্রামের মুরাদপুরে ১৬ জুলাই পিস্তল হাতে গুলি চালাতে দেখা যায় যুবলীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের সাবেক উপ-অর্থ সম্পাদক হেলাল আকবর চৌধুরীকে। পরদিন জামালখান এলাকায় ছাত্র-জনতার ওপর হামলার ঘটনায় সাবেক কাউন্সিলর শৈবাল দাশ সুমনের সঙ্গে অস্ত্র হাতে ছিলেন ছাত্রলীগের সাবেক কেন্দ্রীয় উপ-সমাজসেবা সম্পাদক ফরহাদুল ইসলাম।
নারায়ণগঞ্জে ১৭ জুলাই শিক্ষার্থীদের মিছিলে হামলার ঘটনায় সাবেক সংসদ সদস্য শামীম ওসমান, তার ছেলে অয়ন ওসমান এবং পরিবারের আরও কয়েকজন সদস্যকে অস্ত্র হাতে দেখা যায় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, তারা বর্তমানে দেশের বাইরে অবস্থান করছেন।
সাভারে আন্দোলনের বিভিন্ন দিনে গুলিবর্ষণের ঘটনায় আওয়ামী লীগ নেতা মেহেদী হাসান তুষার, ছাত্রলীগ নেতা আতিকুর রহমান আতিক এবং আওয়ামী লীগ নেতা সাইদুর রহমান সুজনকে ভিডিও ফুটেজের মাধ্যমে শনাক্ত করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
১৯ জুলাই নারায়ণগঞ্জের চাষাঢ়া এলাকায় সংঘটিত হামলার ঘটনায় শামীম ওসমান, তার ছেলে অয়ন ওসমান, শ্যালক তানভীর আহমেদ টিটু, বেয়াই সালাউদ্দিন লাভলু, ভিকি এবং ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি হাবিবুর রহমান রিয়াদের হাতে পিস্তল, শটগান ও অটোমেটিক অস্ত্র দেখা গেছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
ফেনীর মহিপালে ৪ আগস্ট সংঘটিত হামলায় নিজাম হাজারীর নেতৃত্বে সশস্ত্র হামলার অভিযোগ তুলে বলা হয়েছে, ওই ঘটনায় ঘটনাস্থলেই সাতজন নিহত হন। পরে পুলিশ যুবলীগ নেতা লুৎফর রহমান, নূর নবী, ছাত্রলীগ নেতা জিয়াউদ্দিন বাবলু, আওয়ামী লীগ নেতা আবদুর রউফ, হারুন মজুমদার, যুবলীগ নেতা দিদারুল কবির ও সম্রাটসহ একাধিক ব্যক্তিকে শনাক্ত করে।
এদিকে, যুবলীগ নেতা আশিকুর রহমানের বিরুদ্ধেও আন্দোলনকারীদের ওপর প্রকাশ্যে গুলি চালানোর অভিযোগ রয়েছে। তার বিরুদ্ধে হত্যা মামলা থাকলেও এখনো তাকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
রাজধানীর উত্তরা হাউস বিল্ডিং এলাকায় ১৯ জুলাই ছাত্র-জনতার ওপর গুলিবর্ষণের সময় গুলি শেষ হয়ে গেলে জনতার গণপিটুনিতে নিহত হন হামিদুল ইসলাম মোল্লা ওরফে জুয়েল মোল্লা। তিনি গাজীপুর সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র জাহাঙ্গীর আলমের ব্যক্তিগত সহকারী (পিএস) ছিলেন।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সূত্র বলছে, আন্দোলনের সময় ব্যবহৃত অনেক অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র এখনো উদ্ধার করা যায়নি। এসব অস্ত্র ভবিষ্যতে নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডে ব্যবহারের আশঙ্কাও রয়েছে।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, জুলাই আন্দোলনের সময় বিভিন্ন থানা ও পুলিশ ফাঁড়ি থেকে লুট হওয়া বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও গোলাবারুদের মধ্যে এখনো ১ হাজার ৩১৮টি অস্ত্র উদ্ধার হয়নি। এর মধ্যে রয়েছে চায়না রাইফেল, বিডি রাইফেল, এসএমজি, এলএমজি, পিস্তল, শটগান, গ্যাস গান, টিয়ারগ্যাস লঞ্চার ও সিগন্যাল পিস্তল। এসব অস্ত্র উদ্ধারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

প্রথম দর্পণ,ডেস্ক