জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)-এর আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম বলেছেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) শিক্ষার্থীদের মিছিলের জন্য তারা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতেন। তার ভাষায়, “আমরা যখন জুলাই আন্দোলন করতাম, তখন অপেক্ষা করতাম— কখন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের মিছিল আসবে।”
মঙ্গলবার (২৮ জুলাই) জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মিলনায়তনে ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান: স্ফুলিঙ্গ থেকে চলমান বিপ্লব’ শীর্ষক আলোচনা সভা ও পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকী উপলক্ষে জাতীয় ছাত্রশক্তি, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শাখা অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।
নাহিদ ইসলাম বলেন, জুলাই আন্দোলনে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অবদান ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যে বিশ্ববিদ্যালয়ে শহীদ রয়েছেন, সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হওয়া গর্বের বিষয় উল্লেখ করে তিনি জুলাইয়ের সব শহীদ ও আন্দোলনে আত্মত্যাগকারী সবাইকে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি গণতান্ত্রিক আন্দোলনে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন। অথচ প্রতিষ্ঠানটি তার প্রাপ্য মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি থেকে অনেকাংশেই বঞ্চিত হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পেছনেও তৎকালীন জগন্নাথ কলেজের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল উল্লেখ করে তিনি বলেন, দেশের ইতিহাসে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অবদানও সমানভাবে স্মরণীয়।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়নের ওপর গুরুত্বারোপ করে নাহিদ ইসলাম বলেন, রাজধানীর কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত হওয়ায় দেশের বিভিন্ন প্রান্তের মেধাবী শিক্ষার্থীরা এখানে পড়ার সুযোগ পান। তাই বিশ্ববিদ্যালয়টিকে আরও আধুনিক ও উন্নত প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা সময়ের দাবি। তিনি সংশ্লিষ্ট সবার প্রতি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতি বিশেষ নজর দেওয়ার আহ্বান জানান।
অনুষ্ঠানে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদ ও আহতদের পরিবারের সদস্য, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা বক্তব্য দেন।
জুলাই আন্দোলনে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের একমাত্র শহীদ ইকরামুল হক সাজিদের মা আবেগঘন বক্তব্যে বলেন, এখনও তিনি ছেলের গেঞ্জি বুকে জড়িয়ে ঘুমান এবং নিজেকে ‘জিন্দা লাশের মতো’ বেঁচে থাকা একজন মা বলে অনুভব করেন।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (জকসু) ভিপি মো. রিয়াজুল ইসলাম বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদদের আত্মত্যাগ নতুন প্রজন্মকে সাহস জুগিয়েছে। তিনি বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন।
জবি শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ড. ইমরানুল হক বলেন, জুলাইয়ের শহীদদের আত্মত্যাগ কখনো বিস্মৃত হওয়ার নয়। বৈষম্য দূর করে দেশকে এগিয়ে নেওয়ার প্রেরণা হিসেবে জুলাইকে ধারণ করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, “সাজিদের মতো মৃত্যু আর কারও ভাগ্যে যেন না আসে।”
জবি প্রক্টর অধ্যাপক ড. মো. নাসির উদ্দিন বলেন, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগকে আর ক্যাম্পাসে ফিরতে দেবে না। একই সঙ্গে শিক্ষাঙ্গনে সহিংস রাজনীতির পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে সবাইকে সচেষ্ট থাকার আহ্বান জানান তিনি।
জুলাই আন্দোলনে গুলিবিদ্ধ যোদ্ধা মাহাদী আমিনের বাবা আল-আমিন আন্দোলনের সময়কার স্মৃতিচারণ করে বলেন, যাত্রাবাড়ীতে তার ছোট একটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ছিল। আন্দোলনের সময় তিনি আন্দোলনকারীদের পানি দিয়ে সহযোগিতা করতেন। পরে ছেলের মাথায় গুলি লাগার পর তাদের পরিবারের জীবন আমূল বদলে যায়।
জাতীয় ছাত্রশক্তির সাধারণ সম্পাদক আবু বাকের মজুমদার বলেন, স্বৈরাচারের পতন, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের সংস্কার এবং বেকারত্ব দূর করা ছিল জুলাই আন্দোলনের অন্যতম লক্ষ্য। তিনি বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতা নিয়েও সমালোচনামূলক বক্তব্য দেন।
সংগঠনটির সভাপতি জাহিদ আহসান বলেন, জুলাই আন্দোলনের অন্যতম লক্ষ্য ছিল বৈষম্য দূর করা। তিনি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের বাজেট, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং প্রশাসনিক বিভিন্ন বিষয় নিয়েও বক্তব্য রাখেন।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য আব্দুল্লাহ আল-আমিন বলেন, অতীতে অনেক বিশ্ববিদ্যালয় রাজনৈতিক দমন-পীড়নের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল। এখন উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে জ্ঞানচর্চা ও গবেষণার প্রাণকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। রাজনৈতিক পরিচয়ের আড়ালে কোনো অন্যায় বা জুলুম বরদাশত করা হবে না বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
জবি ছাত্রশক্তির আহ্বায়ক ফয়সাল মুরাদ দাবি করেন, কোটা সংস্কার আন্দোলনের শুরু থেকেই জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা সক্রিয় ভূমিকা পালন করলেও তাদের অবদান পর্যাপ্ত গণমাধ্যম কাভারেজ পায়নি।
অনুষ্ঠানের বক্তারা জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গঠন, শিক্ষাঙ্গনে রাজনৈতিক নিপীড়ন বন্ধ এবং জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বান জানান।

মো. জাকির হোসাইন,স্টাফ রিপোর্টার