মহেশখালীর ভাসমান এলএনজি (এফএসআরইউ) টার্মিনাল বিকলের এক সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক করা সম্ভব হয়নি। দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞদের তত্ত্বাবধানেও কারিগরি ত্রুটি দ্রুত সমাধান না হওয়ায় দেশে গ্যাস সংকট আরও তীব্র হয়েছে। এতে আবাসিক, শিল্প-কারখানা, বিদ্যুৎকেন্দ্র ও সিএনজি স্টেশনগুলোতে সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় গ্যাসের দাবিতে বিক্ষোভও শুরু হয়েছে।
সরকার পরিস্থিতিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে। এ সংকট মোকাবিলায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের কাছে চিঠি পাঠানোর পাশাপাশি টেলিফোনে কথা বলে কারিগরি সহযোগিতা কামনা করেছেন।
মঙ্গলবার সচিবালয়ে নিজ দপ্তরে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, গত ২১ জুলাই কারিগরি ত্রুটির কারণে মহেশখালীর এফএসআরইউ থেকে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। এর ফলে প্রতিদিন প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ কমে গেছে, যার প্রভাব দেশের বিভিন্ন খাতে পড়েছে।
তিনি জানান, প্রধানমন্ত্রীর পাঠানো চিঠি ইতোমধ্যে শিক্ষা উপদেষ্টা মাহদী আমিন কুয়ালালামপুরে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর কাছে পৌঁছে দিয়েছেন। পরে দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে টেলিফোনে আলোচনা হয়। আলোচনায় বাংলাদেশের চলমান জ্বালানি সংকট তুলে ধরে সহযোগিতা চাওয়া হয়।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম আশ্বস্ত করেছেন, সংকট নিরসনে যেসব সহায়তা দেওয়া সম্ভব, সে বিষয়ে তিনি দ্রুত সংশ্লিষ্ট টিম ও মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা করে বাংলাদেশকে জানাবেন। একই সঙ্গে মালয়েশিয়া থেকে এলএনজি আমদানির সম্ভাবনা এবং দেশটির কারিগরি অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর বিষয়েও আলোচনা হয়েছে।
গ্যাস সংকটের কারণে দেশবাসীর ভোগান্তির জন্য দুঃখ প্রকাশ করে প্রতিমন্ত্রী বলেন, গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ায় শিল্প-কারখানা, বিদ্যুৎকেন্দ্র, সিএনজি স্টেশন ও আবাসিক গ্রাহকেরা ব্যাপক সমস্যার মুখে পড়েছেন। অনেক এলাকায় গ্যাসের চাপ এতটাই কম যে সিএনজি স্টেশনগুলো প্রয়োজনীয় পরিমাণ গ্যাস সংগ্রহ করতে পারছে না। ফলে বিভিন্ন স্থানে দীর্ঘ সারি ও সাময়িক জনদুর্ভোগ সৃষ্টি হয়েছে।
তিনি আরও জানান, সংকট দ্রুত কাটিয়ে উঠতে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ এক্সেলারেট এনার্জির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে নিয়মিত কাজ করছে। আশা করা হচ্ছে, আগামী সপ্তাহের শুরুতে দৈনিক ২৮০ থেকে ৩০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ পুনরায় চালু করা সম্ভব হবে এবং পরবর্তী সপ্তাহের শেষ দিকে এফএসআরইউ পুরোপুরি সচল হবে।
দীর্ঘমেয়াদে গ্যাস সংকট সমাধানে সরকার বিকল্প জ্বালানি উৎস অনুসন্ধান শুরু করেছে বলেও জানান প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেন, জাপানের প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টার নেতৃত্বাধীন একটি প্রতিনিধিদলের সঙ্গে জ্বালানি সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। সরকার গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করছে এবং কারিগরি সমস্যা সমাধান হলেই সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
এদিকে রাজধানীর মোহাম্মদপুর, আদাবরসহ বিভিন্ন এলাকায় গ্যাস সংকট চরম আকার ধারণ করেছে। বাসাবাড়িতে তিতাসের গ্যাস সরবরাহ প্রায় সম্পূর্ণ বন্ধ থাকায় রান্নাবান্নাসহ দৈনন্দিন জীবনযাত্রা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। স্থানীয়রা অভিযোগ করছেন, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে বারবার জানানো হলেও কার্যকর কোনো সমাধান মিলছে না।
মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা আবদুল্লাহ আল মামুন জানান, দিনের বেলায় গ্যাস থাকে না, মাঝেমধ্যে গভীর রাতে দুই-তিনটার দিকে সামান্য গ্যাস পাওয়া যায়। তার ভাষ্য, এলাকায় ত্রুটিপূর্ণ গ্যাস লাইন, পাইপলাইনে পানি জমে থাকা এবং গ্যাসের চাপ না থাকা—এই তিনটি কারণে দীর্ঘদিন ধরে সমস্যা চলছে। গত এক মাসে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়েছে।
চলমান সংকটের প্রতিবাদে আগামী শুক্রবার মোহাম্মদপুরে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশের ঘোষণা দিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। দুপুর ২টায় রিং রোডের জাপান গার্ডেন সিটির সামনে থেকে মিছিল শুরু হয়ে মোহাম্মদপুর বাসস্ট্যান্ডে গিয়ে সমাবেশ অনুষ্ঠিত হবে। নগর উন্নয়ন ফোরামের ব্যানারে আয়োজিত এ কর্মসূচিতে অংশ নিতে এলাকাবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন সংগঠনটির আহ্বায়ক রবিউল ইসলাম রুবেল।
এদিকে ঢাকা-১৩ আসনের সংসদ সদস্য ও প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ এক ভিডিও বার্তায় জানিয়েছেন, বিষয়টি নিয়ে তিতাস কর্তৃপক্ষ ও বিদ্যুৎ-জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা হচ্ছে। তিনি বলেন, লাইনে ১৪৮ মেগা কিউসেক গ্যাস সরবরাহের প্রয়োজন হলেও বর্তমানে সেই পরিমাণ গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না।

মো. জাকির হোসাইন,স্টাফ রিপোর্টার