বিশ্বকাপের বাণিজ্যিক মালিকানার অংশ বিক্রির পরিকল্পনায় ফিফা, তীব্র বিতর্কে ইনফান্তিনো

  • প্রথম দর্পণ,স্পোর্টস ডেক্স
  • আপলোড সময় : ৩০ জুলাই ২০২৬, ১০:২৪ দুপুর
  • ২১৬১ বার পড়া হয়েছে

Banner Ad
https://prothomdorpan.com/admin/fav-icon-logo/image/1761146741.250..125.jpg

বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ আসর ফিফা বিশ্বকাপের বাণিজ্যিক কার্যক্রমে বেসরকারি বিনিয়োগ আনার পরিকল্পনা করেছে আন্তর্জাতিক ফুটবল নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা। এ লক্ষ্যে বিশ্বকাপ ও ক্লাব বিশ্বকাপের বাণিজ্যিক অধিকার পরিচালনার জন্য নতুন একটি প্রতিষ্ঠান গঠন করে তার সর্বোচ্চ ২১ শতাংশ মালিকানা বিক্রির মাধ্যমে প্রায় ৪২০ কোটি ডলার সংগ্রহের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর এই উদ্যোগকে ঘিরে ইতোমধ্যে ফুটবল অঙ্গনে শুরু হয়েছে ব্যাপক বিতর্ক।

ফিফার প্রস্তাব অনুযায়ী, নতুন প্রতিষ্ঠান ‘ফিফা ফরওয়ার্ড এন্টারপ্রাইজেস (এফএফই)’ বিশ্বকাপ, ক্লাব বিশ্বকাপসহ সংস্থাটির সবচেয়ে লাভজনক প্রতিযোগিতাগুলোর বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালনা করবে। তবে প্রতিষ্ঠানটির সংখ্যাগরিষ্ঠ মালিকানা ফিফার কাছেই থাকবে এবং বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবেও ফিফা তার বর্তমান দায়িত্ব অব্যাহত রাখবে।

তবে পরিকল্পনাটি এখনো চূড়ান্ত হয়নি। এটি বাস্তবায়নের জন্য ফিফার ২১১টি সদস্য দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ সমর্থনের পাশাপাশি ৩৭ সদস্যের ফিফা কাউন্সিলের অনুমোদন প্রয়োজন হবে।

ফিফার দাবি, এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য মুনাফা নয়; বরং বিশ্বজুড়ে ফুটবলের উন্নয়ন ত্বরান্বিত করা। নতুন ফিফা ফাস্ট-ফরওয়ার্ড প্রোগ্রাম (এফএফএফপি)-এর আওতায় সংগৃহীত অর্থ সদস্য দেশগুলোর উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যয় করা হবে। এই তহবিল থেকে প্রতিটি সদস্য দেশ বিশেষ ও জরুরি প্রকল্পের জন্য অতিরিক্ত ২ কোটি ডলার পর্যন্ত সহায়তা পেতে পারে।

এ ছাড়া বর্তমানে ফিফার ফরওয়ার্ড প্রোগ্রামের আওতায় চার বছরে প্রতিটি সদস্য দেশ যে ৮০ লাখ ডলার পেয়ে থাকে, তা ২০২৭-৩০ মেয়াদে ২ কোটি ডলারে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে। ২০৩১-৩৪ চক্রে এ অনুদান বাড়িয়ে ২ কোটি ২০ লাখ ডলার এবং ২০৩৫-৩৮ মেয়াদে ২ কোটি ৪০ লাখ ডলার করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সংস্থাটি। অর্থাৎ আগামী এক দশকে সদস্য দেশগুলোর উন্নয়ন অনুদান প্রায় তিন গুণ বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।

পরিকল্পনার পক্ষে যুক্তি তুলে ধরে ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো বলেন, ফুটবল মানবিক ও সামাজিক উন্নয়নের একটি শক্তিশালী মাধ্যম। এর বাণিজ্যিক মূল্য বিশ্বের সব দেশের মধ্যে আরও ন্যায্যভাবে বণ্টন নিশ্চিত করাই ফিফার লক্ষ্য। তাঁর ভাষায়, ফুটবলের বাণিজ্যিক কার্যক্রম একটি বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পরিচালিত হলে সদস্য দেশগুলো আরও বেশি আর্থিক সুবিধা পাবে এবং নিজেদের ফুটবল উন্নয়নে কার্যকর ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে।

জানা গেছে, প্রকল্পটির আর্থিক উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করছে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ বিনিয়োগ ব্যাংক জেপি মরগ্যান। সম্ভাব্য বিনিয়োগকারীদের মধ্যে রয়েছে থ্রাইভ ইটারনাল, যার প্রতিষ্ঠাতা মার্কিন উদ্যোক্তা জশুয়া কুশনার। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারের ভাই। এছাড়া অ্যাপোলো স্পোর্টস ক্যাপিটালও সম্ভাব্য বিনিয়োগকারী হিসেবে আলোচনায় রয়েছে।

ফিফার এ পরিকল্পনা প্রকাশের পরই ইউরোপীয় ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা উয়েফা কঠোর প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। এক বিবৃতিতে সংস্থাটি বলেছে, ফুটবলের আত্মা ও এর শাসনব্যবস্থা কোনো বিক্রয়যোগ্য সম্পদ নয় এবং এ ধরনের সিদ্ধান্ত নিয়ন্ত্রক সংস্থার সীমা অতিক্রম করে।

একই ধরনের উদ্বেগ প্রকাশ করেছে কনকাকাফ। সংস্থাটির অভিযোগ, এত গুরুত্বপূর্ণ একটি সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে তাদের সঙ্গে কোনো আনুষ্ঠানিক আলোচনা করা হয়নি। ইংল্যান্ড ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনও পর্যাপ্ত তথ্য ছাড়াই পরিকল্পনাটি উপস্থাপনের সমালোচনা করেছে।

স্পেনের লা লিগা সভাপতি হাভিয়ের তেবাস সামাজিক মাধ্যমে লিখেছেন, এটি কোনো সংস্কার নয়; বরং ভবিষ্যতের ফুটবলকে বন্ধক রেখে পরিচালিত একটি নির্বাচনি প্রচারণা। তাঁর মতে, ইনফান্তিনো এখন সমস্যার সমাধান নয়, বরং সমস্যারই অংশ হয়ে উঠেছেন।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসম্যান জেমি রাসকিনও পরিকল্পনার সমালোচনা করে বলেন, বিশ্বকাপের টিকিট ইতোমধ্যে সাধারণ সমর্থকদের নাগালের বাইরে চলে গেছে। নতুন বেসরকারি বিনিয়োগ ভবিষ্যতে ফুটবলকে আরও করপোরেট নিয়ন্ত্রণের দিকে ঠেলে দিতে পারে।

তবে ফিফার এই উদ্যোগের সমর্থকরাও রয়েছেন। তাদের মতে, স্পেনের লা লিগা, ফ্রান্সের লিগ ওয়ানসহ বিশ্বের বিভিন্ন ক্রীড়া সংস্থা ইতোমধ্যে বাণিজ্যিক কার্যক্রমে বেসরকারি বিনিয়োগ গ্রহণ করেছে। ফলে ফিফার পদক্ষেপ পুরোপুরি নজিরবিহীন নয়।

অর্থনৈতিক দিক থেকেও ফিফার অবস্থান শক্তিশালী। সংস্থাটির হিসাব অনুযায়ী, ২০২৩-২৬ চক্রে বিশ্বকাপ ও ক্লাব বিশ্বকাপ মিলিয়ে ফিফার মোট আয় প্রায় ১৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাবে, যা আগের চার বছরের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। এরপরও ইনফান্তিনোর বিশ্বাস, পৃথক বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান গঠন করলে বিশ্বকাপ, ক্লাব বিশ্বকাপ এবং নারী ফুটবলের প্রতিযোগিতা থেকে আরও বেশি রাজস্ব অর্জন সম্ভব হবে।

এখন দৃষ্টি ফিফার ২১১ সদস্য দেশের দিকে। সদস্য দেশগুলোর সমর্থন মিললে বিশ্ব ফুটবলের ইতিহাসে অন্যতম বড় বাণিজ্যিক রূপান্তরের সূচনা হবে। আর প্রস্তাবটি প্রত্যাখ্যাত হলে ইনফান্তিনোর বহুল আলোচিত এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের আগেই থেমে যেতে পারে।




কমেন্ট করুন:

ফেসবুকে আমরা
সর্বশেষ সংবাদ
Sidebar Ad