অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে প্রায় দুই দশক পর টেস্ট সিরিজ খেলতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের গুরুত্বপূর্ণ এই সফরকে ঘিরে ছিল বড় প্রত্যাশা। তবে সফর শুরুর আগেই একের পর এক ইনজুরিতে ছিটকে পড়ছেন দলের গুরুত্বপূর্ণ ক্রিকেটাররা। সবচেয়ে বড় ধাক্কা এসেছে গতিতারকা নাহিদ রানার অনুপস্থিতিতে। ফলে শক্তিশালী অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে বাংলাদেশের প্রস্তুতি ও পরিকল্পনা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
বাংলাদেশের পেস আক্রমণের প্রধান ভরসা নাহিদ রানা ১৭ জুলাই জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ওয়ানডে ম্যাচে বাঁ পাশের পেশিতে চোট পান। পরবর্তীতে এমআরআই পরীক্ষায় তার গ্রেড-২ সাইড স্ট্রেইন ধরা পড়ে। বিসিবির মেডিকেল বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চোট থেকে সেরে উঠতে চার সপ্তাহ বিশ্রাম প্রয়োজন। এরপর ধাপে ধাপে বোলিং ওয়ার্কলোড বাড়িয়ে প্রতিযোগিতামূলক ক্রিকেটে ফিরতে আরও দুই থেকে চার সপ্তাহ সময় লাগবে। ফলে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে দুই ম্যাচের পুরো টেস্ট সিরিজ থেকেই ছিটকে গেছেন এই ডানহাতি গতিতারকা।
ঘণ্টায় প্রায় ১৫০ কিলোমিটার গতিতে ধারাবাহিক বোলিং, নতুন বলে আক্রমণাত্মক স্পেল, পুরোনো বলে রিভার্স সুইং এবং দীর্ঘ সময় একই তীব্রতা ধরে রাখার সক্ষমতার কারণে নাহিদকে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় পেস সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। পাকিস্তান, দক্ষিণ আফ্রিকাসহ সাম্প্রতিক কয়েকটি টেস্ট সিরিজে তার পারফরম্যান্স আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও প্রশংসিত হয়েছে। অস্ট্রেলিয়ার বাউন্স ও গতিনির্ভর উইকেটে তিনিই হতে পারতেন বাংলাদেশের অন্যতম বড় অস্ত্র।
নাহিদের ইনজুরির পর ক্রিকেট অঙ্গনে আলোচনায় এসেছে আরেকটি প্রশ্ন—সামনে এত গুরুত্বপূর্ণ অস্ট্রেলিয়া সফর থাকলেও তুলনামূলক কম গুরুত্বপূর্ণ জিম্বাবুয়ে সিরিজে তাকে খেলানো কতটা যৌক্তিক ছিল? অনেকের মতে, বড় দলগুলো গুরুত্বপূর্ণ সিরিজের আগে তাদের প্রধান ফাস্ট বোলারদের ওয়ার্কলোড পরিকল্পিতভাবে নিয়ন্ত্রণ করে। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে বাংলাদেশের পরিকল্পনা ও দূরদর্শিতা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।
শুধু নাহিদ নন, ইনজুরিতে ভুগছেন আরও কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ ক্রিকেটার। বাঁহাতি পেসার শরিফুল ইসলাম হ্যামস্ট্রিংয়ের গ্রেড-১ চোটে পুনর্বাসনে রয়েছেন। প্রথম টেস্টে তার খেলার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ। দ্বিতীয় টেস্টের আগে ফিটনেস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারলেই কেবল দলে ফেরার সুযোগ মিলতে পারে।
উইকেটকিপার-ব্যাটার লিটন কুমার দাসও বাঁ পায়ের কাফ মাসলের চোটের চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুরে পিআরপি নিয়েছেন। ১৩ আগস্টের আগে তাকে পুরোপুরি ফিট ঘোষণা করা সম্ভব নয়। ফলে সিরিজের প্রথম টেস্টের পরিকল্পনায় থাকছেন না তিনিও।
এদিকে পেসার হাসান সাকিব ফ্র্যাকচারের কারণে দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসনে রয়েছেন। তার মাঠে ফিরতে বছরের শেষ ভাগ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হতে পারে। আর মোস্তাফিজুর রহমানও এখনও পুনর্বাসন প্রক্রিয়ায় আছেন। সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোলে ১৮ আগস্টের পর তিনি পুরোপুরি প্রস্তুত হতে পারবেন।
একসময় বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি হিসেবে বিবেচিত পেস আক্রমণ এখন ইনজুরির কারণে দুর্বল হয়ে পড়েছে। বিপরীতে স্বাগতিক অস্ট্রেলিয়া প্যাট কামিন্সের নেতৃত্বে পূর্ণ শক্তির দল নিয়ে মাঠে নামছে। বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের লড়াইয়ে প্রতিটি ম্যাচই তাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এমন বাস্তবতায় বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় নির্ভরতার জায়গা হতে পারতেন নাহিদ রানা। কিন্তু ইনজুরির কারণে তাকে ছাড়াই অস্ট্রেলিয়ার কঠিন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে টাইগারদের।
ফলে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে—গুরুত্বপূর্ণ এই সফরকে সামনে রেখে বাংলাদেশের ওয়ার্কলোড ম্যানেজমেন্ট ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা কতটা কার্যকর ছিল? নাহিদকে যদি জিম্বাবুয়ে সিরিজে বিশ্রাম দেওয়া হতো, তাহলে কি আজ তাকে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে পাওয়া যেত? এর নির্দিষ্ট উত্তর না মিললেও বিতর্ক ও আলোচনা আপাতত থামছে না।

প্রথম দর্পণ,স্পোর্টস ডেক্স