একজন মানুষের জীবনে একটি বিশ্বকাপ কাছ থেকে দেখাই যেখানে অনেকের জন্য বিরল সৌভাগ্য, সেখানে টানা ১৮টি ফুটবল বিশ্বকাপ কাভার করার অনন্য কীর্তি গড়েছেন আর্জেন্টিনার কিংবদন্তি ক্রীড়া সাংবাদিক এনরিকে ম্যাকাইয়া মার্কেস। ৯১ বছর বয়সেও কাঁধে অ্যাক্রেডিটেশন কার্ড ঝুলিয়ে বিশ্বকাপের মাঠে বিচরণ করেন তিনি। পেলের অভিষেক থেকে শুরু করে ম্যারাডোনার বিশ্বজয়, মেসির অশ্রু এবং অবশেষে বিশ্বকাপ জয়ের উচ্ছ্বাস—ফুটবল ইতিহাসের প্রায় সব মহাকাব্যিক মুহূর্তেরই প্রত্যক্ষ সাক্ষী এই প্রবীণ সাংবাদিক।
১৯৫৮ সালে সুইডেন বিশ্বকাপ দিয়ে শুরু হয়েছিল ম্যাকাইয়ার বিশ্বকাপযাত্রা। মাত্র ২৪ বছর বয়সে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ কাভার করতে গিয়ে তিনি যেমন দেখেছিলেন ১৭ বছর বয়সী পেলের বিস্ময়কর উত্থান, তেমনি প্রত্যক্ষ করেছিলেন চেকোস্লোভাকিয়ার কাছে আর্জেন্টিনার ৬-১ গোলের লজ্জাজনক পরাজয়। ইতিহাসে যা ‘ডিজাস্টার অব সুইডেন’ নামে পরিচিত।
সেই স্মৃতি আজও স্পষ্ট ম্যাকাইয়ার মনে। তার ভাষায়, “চেকোস্লোভাকিয়া সম্পর্কে আমাদের কোনো ধারণাই ছিল না। তারা আমাদের পুরোপুরি বিস্মিত করেছিল। আর্জেন্টিনার জন্য সেটি ছিল ভয়াবহ এক পরাজয়।”
প্রায় সাত দশকের সাংবাদিকতা জীবনে ফুটবলের অসংখ্য পরিবর্তনের সাক্ষী হয়েছেন তিনি। সাদাকালো টেলিভিশন থেকে ডিজিটাল যুগ, হাতে লেখা নোট থেকে তাৎক্ষণিক পরিসংখ্যান—সবই দেখেছেন খুব কাছ থেকে। তবে একটি বিশ্বাস কখনো বদলাননি—কাউকে খুব দ্রুত বিচার করা উচিত নয়।
এই দর্শনের কারণেই ২০১৮ সালে লিওনেল স্কালোনি আর্জেন্টিনার কোচ হওয়ার পর অন্যদের মতো তড়িঘড়ি সমালোচনায় যোগ দেননি তিনি। সময়ই প্রমাণ করেছে সেই ধৈর্যের মূল্য। স্কালোনির অধীনে আর্জেন্টিনা জিতেছে কোপা আমেরিকা, ফিনালিসিমা এবং বিশ্বকাপ।
সদ্য সমাপ্ত বিশ্বকাপেও সংবাদ সম্মেলন শেষে আর্জেন্টিনার কোচ লিওনেল স্কালোনি নিজে এগিয়ে এসে ম্যাকাইয়ার সঙ্গে ছবি তোলেন। ফুটবল অঙ্গনে তার প্রতি শ্রদ্ধা যে কতটা গভীর, এই ঘটনাই তার বড় প্রমাণ।
প্রিয় ফুটবলারের নাম জানতে চাইলে কোনো দ্বিধা ছাড়াই ম্যাকাইয়া বলেন, “অবশ্যই লিওনেল মেসি।” তবে সর্বকালের সেরা ফুটবলার নির্বাচন করতে তিনি অনাগ্রহী। তার মতে, “ভিন্ন সময়ের খেলোয়াড়দের তুলনা করা সম্ভব নয়। সময় বদলেছে, প্রতিপক্ষ বদলেছে, ফুটবলও বদলেছে। প্রত্যেকেই নিজ নিজ সময়ের সেরা।”
একইভাবে পেলে ও ম্যারাডোনা বিতর্কেও তিনি নিরপেক্ষ অবস্থান নেন। তার ভাষায়, “১৯৭০ সালের ব্রাজিল আর ১৯৮৬ সালের আর্জেন্টিনাকে একই মানদণ্ডে বিচার করা যায় না। দুই দলের ফুটবলই ছিল ভিন্ন ধাঁচের।”
তবে একজন আর্জেন্টাইন হিসেবে তার সবচেয়ে প্রিয় স্মৃতি নিঃসন্দেহে ১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপ। ডিয়েগো ম্যারাডোনার নেতৃত্বে আর্জেন্টিনার বিশ্বজয় আজও তাকে আবেগাপ্লুত করে। তিনি বলেন, “ম্যারাডোনার হাতে বিশ্বকাপ ট্রফি ওঠার মুহূর্তটি মনে হয়েছিল তার আজীবনের স্বপ্নপূরণের চূড়ান্ত অধ্যায়।”
ম্যাকাইয়ার কাছে বিশ্বকাপ শুধু শিরোপা জয়ের গল্প নয়; এটি জয়ের পাশাপাশি পরাজয়ের ইতিহাসও। তার বিশ্বাস, “শুধু জয় নয়, পরাজয়ও ইতিহাসের অংশ।”
প্রায় ৭০ বছর ধরে বিশ্বকাপ কাভার করার পর অবসর প্রসঙ্গ এখন প্রায়ই উঠে আসে। তবে বিষয়টি নিয়ে রসিকতাও করেন তিনি। স্প্যানিশ সাংবাদিক এলিজাবেথ কনওয়ের সঙ্গে আলাপকালে হেসে বলেছিলেন, “একদিন না একদিন তো অবসর নেবই। আমি এখনই অবসর নিচ্ছি... আচ্ছা, ফোনটা রাখি, বাকিটা আরেক দিন হবে।”
ফুটবলপ্রেমীদের বিশ্বাস, সেই ‘আরেক দিন’ হয়তো ২০৩০ বিশ্বকাপেও দেখা মিলবে এনরিকে ম্যাকাইয়া মার্কেসের। কারণ, পেলে থেকে মেসি—ফুটবলের প্রতিটি স্বর্ণালি অধ্যায়ের নীরব সাক্ষী এই মানুষটি নিজেই যেন বিশ্বকাপের এক চলমান ইতিহাস।

প্রথম দর্পণ,বিনোদন ডেক্স