কুঁচিয়া শিকারেই জীবিকার চাকা, সিলেট থেকে লক্ষ্মীপুরে জীবনের সংগ্রাম

  • প্রথম দর্পণ,ডেস্ক
  • আপলোড সময় : ০৭ আগস্ট ২০২৬, ০৩:০৭ দুপুর
  • ৮৬০৪ বার পড়া হয়েছে

Banner Ad
https://prothomdorpan.com/admin/fav-icon-logo/image/1761146741.250..125.jpg

ভোরের আলো পুরোপুরি ফোটার আগেই কাঁধে বাঁশের তৈরি বিশেষ ‘চাঁই’ আর হাতে একমুঠো কেঁচো নিয়ে জলাভূমির পথে হাঁটেন নিতাই চন্দ্র সরকার। কেঁচোই তার সারাদিনের মূলধন। সেই কেঁচোর টোপে ধরা পড়ে কুঁচিয়া, আর সেই কুঁচিয়া বিক্রির আয়েই চলে আট সদস্যের পরিবারের জীবিকা।

বাংলাদেশের বিচিত্র পেশাগুলোর মধ্যে কুঁচিয়া শিকার একটি ব্যতিক্রমী জীবিকা। জীবিকার তাগিদে সিলেটের হবিগঞ্জ থেকে শত শত কিলোমিটার দূরে লক্ষ্মীপুরের রামগঞ্জ উপজেলার খাল-বিল ও জলাভূমিতে এসে বসতি গড়েছেন একদল মানুষ। কুঁচিয়া সংগ্রহ করেই চলছে তাদের সংসার।

স্থানীয় ভাষায় কেঁচোকে বলা হয় ‘মেটোসাপ’। এই কেঁচো বাঁশের তৈরি বিশেষ ফাঁদে গেঁথে পানিতে ডুবিয়ে রাখা হয়। পরদিন ভোরে ফাঁদ তুলে সংগ্রহ করা হয় কুঁচিয়া। তবে প্রতিটি ফাঁদে কুঁচিয়া ধরা পড়ে না; অনেক সময় শিং, কৈ কিংবা টাকি মাছও উঠে আসে।

হবিগঞ্জ জেলার বাসিন্দা নিতাই চন্দ্র সরকার প্রায় ৯ থেকে ১০ বছর আগে উন্নত আয়ের আশায় রামগঞ্জ উপজেলার বালুয়া চৌমুহনী এলাকায় আসেন। নিজ এলাকাতেও একই পেশায় যুক্ত থাকলেও সেখানে আয় ছিল অনেক কম। বর্তমানে বাবা-মা, স্ত্রী ও সন্তানসহ আট সদস্যের পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি তিনি।

নিতাইয়ের মতো সিলেট অঞ্চলের আরও ২০ থেকে ২৫ জন কুঁচিয়া শিকারি বর্তমানে রামগঞ্জ উপজেলার ভোলাকোট, ভাটরা, ভাদুর, লামচর, দরবেশপুর ও চণ্ডীপুরসহ বিভিন্ন এলাকার খাল-বিল ও জলাভূমিতে কুঁচিয়া সংগ্রহ করছেন। কৃষিকাজে লোকসান, কর্মসংস্থানের সংকট এবং দারিদ্র্যই তাদের এই পেশায় আসতে বাধ্য করেছে।

কুঁচিয়া ধরা অত্যন্ত ধৈর্যের কাজ। দিনের বড় একটি সময় ব্যয় হয় কেঁচো সংগ্রহে। এরপর সেই কেঁচো ফাঁদে গেঁথে পানিতে ডুবিয়ে রাখা হয়। সংগ্রহ করা কুঁচিয়া জীবিত অবস্থায় সংরক্ষণ করা হয় এবং পর্যাপ্ত পরিমাণ হলে ঢাকায় পাঠানো হয়। প্রতি কেজি কুঁচিয়া ২৫০ থেকে ৩০০ টাকায় বিক্রি হয়। দেশের পাশাপাশি বিদেশের বাজারেও এর উল্লেখযোগ্য চাহিদা রয়েছে।

বর্ষাকাল কুঁচিয়া শিকারিদের সবচেয়ে ব্যস্ত মৌসুম। এ সময়ে মাসে ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত আয় করা সম্ভব হয়। তবে বছরের বাকি সময় কুঁচিয়ার প্রাপ্যতা কমে যাওয়ায় আয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পায়। ফলে সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হয় তাদের।

কুঁচিয়া শিকারি নিতাই চন্দ্র সরকার বলেন, “বর্ষাকালে কিছুটা ভালো আয় হয়। কিন্তু বছরের অন্য সময় খুব কষ্টে চলতে হয়। আগের মতো এখন আর কুঁচিয়া পাওয়া যায় না।”

আরেক শিকারি স্বপন চন্দ্র বলেন, “জীবিকার তাগিদে আমরা সুদূর সিলেট থেকে এখানে এসেছি। বর্ষাকালে মোটামুটি ভালো আয় হলেও শীতকালে কুঁচিয়া প্রায় পাওয়া যায় না। তখন বাধ্য হয়ে অন্য কাজ খুঁজতে হয়।”

রামগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সাব্বির আহমেদ সিফাত বলেন, কুঁচিয়া পরিবেশের জন্য অত্যন্ত উপকারী প্রাণী। এটি ক্ষতিকর পোকামাকড় খেয়ে মাটির উর্বরতা বৃদ্ধি এবং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই এর প্রাকৃতিক আবাস সংরক্ষণ করা প্রয়োজন।

উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা আবুল কাশেম বলেন, কুঁচিয়া একটি মূল্যবান প্রাণিজ সম্পদ। এতে প্রচুর আমিষ ও ভিটামিন রয়েছে। রামগঞ্জে স্থানীয় বাজার না থাকলেও ঢাকা, চট্টগ্রামসহ বিদেশের বাজারে এর ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। কেউ কুঁচিয়া চাষে আগ্রহী হলে মৎস্য বিভাগের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় কারিগরি সহযোগিতা দেওয়া হবে।

জীবিকার প্রয়োজনে ভিটেমাটি ছেড়ে দূর জেলায় এসে কুঁচিয়া শিকারকে পেশা হিসেবে বেছে নেওয়া এসব মানুষের জীবনসংগ্রাম নীরব হলেও অনন্য। বর্ষায় কিছুটা স্বস্তি মিললেও বছরের অধিকাংশ সময় অনিশ্চয়তা ও সীমিত আয়ের মধ্যেই কাটে তাদের দিন। খাল-বিল আর জলাভূমিকেই সঙ্গী করে তারা অবিরাম ঘুরিয়ে চলেছেন জীবিকার চাকা।




কমেন্ট করুন:

ফেসবুকে আমরা
সর্বশেষ সংবাদ
Sidebar Ad