বাঁশখালীতে এক দশকে ১৫ হাতির মৃত্যু, আতঙ্কে লোকালয়ের মানুষ

  • প্রথম দর্পণ,ডেস্ক
  • আপলোড সময় : ১৩ আগস্ট ২০২৬, ১১:১৪ দুপুর
  • ৬৫৩৫ বার পড়া হয়েছে

Banner Ad
https://prothomdorpan.com/admin/fav-icon-logo/image/1761146741.250..125.jpg

চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে গত এক দশকে বন্য হাতির আক্রমণে ১৩ জনের প্রাণহানি হয়েছে। একই সময়ে বিভিন্ন কারণে মারা গেছে অন্তত ১৫টি হাতি। হাতির আক্রমণে ক্ষতিগ্রস্ত ৪৫ কৃষককে সরকারি অনুদান হিসেবে দেওয়া হয়েছে ১৯ লাখ ১৫ হাজার টাকা।

বুধবার (১২ আগস্ট) বিশ্ব হাতি দিবস-২০২৬ উপলক্ষে বাঁশখালীতে আয়োজিত র‍্যালি ও আলোচনা সভায় এসব তথ্য তুলে ধরেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

আবাসস্থল ও চলাচলের পথ সংকুচিত হয়ে যাওয়ায় সাম্প্রতিক সময়ে বাঁশখালীসহ চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় লোকালয়ে বন্য হাতির বিচরণ বেড়েছে। বন উজাড়, পাহাড় কাটা, করিডর দখল এবং অপরিকল্পিত অবকাঠামো নির্মাণের কারণে হাতির স্বাভাবিক চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। খাবার ও নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে হাতির পাল লোকালয়ে ঢুকে পড়ায় বাড়ছে মানুষ ও হাতির সংঘাত।

বন বিভাগ ও হাতি গবেষকদের তথ্য অনুযায়ী, একসময় চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার এলাকায় বন্য হাতির চলাচলের জন্য ১২টি করিডর ছিল। এর মধ্যে কয়েকটি করিডর দখল, বন উজাড় ও বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফলে হাতির স্বাভাবিক বিচরণক্ষেত্র সংকুচিত হয়ে পড়েছে।

একটি পূর্ণবয়স্ক হাতি প্রতিদিন প্রায় ১৫০ থেকে ২০০ কেজি খাবার গ্রহণ করে। কিন্তু পাহাড় ও বন কেটে বসতি এবং বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণের কারণে হাতির খাবার ও আবাসস্থলের সংকট বাড়ছে। এতে নিরাপদ বিচরণ ও খাবারের সন্ধানে বন্য হাতি বাধ্য হয়ে লোকালয়ে চলে আসছে।

হাতি গবেষকদের মতে, পুরোনো চলাচলের পথ বাধাগ্রস্ত হওয়ায় সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় বন্য হাতির বিচরণ বেড়েছে। বিশেষ করে বাঁশখালী, সাতকানিয়া, আনোয়ারা, বোয়ালখালী ও লোহাগাড়ার পাহাড়ি এলাকায় প্রায়ই হাতির পাল দেখা যাচ্ছে। লোকালয়ে হাতির মুখোমুখি হয়ে গত কয়েক বছরে বেশ কয়েকজনের প্রাণহানিও ঘটেছে।

বাঁশখালী জলদী বন বিভাগের রেঞ্জ কর্মকর্তা মোহাম্মদ ফোরকান বলেন, লোকালয়ে হাতির উপস্থিতির কারণে মানুষের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হচ্ছে। একই সঙ্গে মানুষ ও হাতির মুখোমুখি সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটছে।

বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) চট্টগ্রাম বিভাগীয় সমন্বয়ক মনিরা পারভীন বলেন, মানুষ ও হাতির সংঘাত কমাতে হাতির আবাসস্থল সংরক্ষণ, চলাচলের করিডর দখলমুক্ত রাখা এবং বন উজাড় বন্ধে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করে হাতি সংরক্ষণে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাও প্রয়োজন।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মো. মনজুরুল কিবরিয়া বলেন, বিভিন্ন এলাকায় অপরিকল্পিত অবকাঠামো ও শিল্পকারখানা নির্মাণের কারণে মানুষ-হাতির দ্বন্দ্ব তৈরি হচ্ছে। মূলত মানুষের দখলের কারণেই হাতির আবাসস্থল সংকুচিত হয়েছে। হাতি তাদের পুরোনো এলাকায় ফিরে আসছে। তাই মানুষ ও হাতির সংঘাত এড়াতে পরিকল্পিতভাবে উন্নয়ন ও শিল্পকারখানা নির্মাণ করতে হবে।

চট্টগ্রাম বন্যপ্রাণী ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ কর্মকর্তা দীপান্বিতা ভট্টাচার্য বলেন, বন্য হাতির আক্রমণে ক্ষতিগ্রস্তদের বন বিভাগের পক্ষ থেকে নির্ধারিত নিয়মে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হচ্ছে। বন্য হাতিকে জোর করে অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়। হাতি স্বাভাবিকভাবেই নিরাপদ আবাসস্থলে ফিরে যাবে। তিনি হাতির চলাচলের সময় স্থানীয় বাসিন্দাদের সতর্কতা অবলম্বন এবং নিজেদের নিরাপদ রাখার আহ্বান জানান।

এদিকে বিশ্ব হাতি দিবস উপলক্ষে বুধবার সকালে বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগ, চট্টগ্রামের উদ্যোগে বাঁশখালীর নাপোড়া শেখেরখীল উচ্চ বিদ্যালয়ের হলরুমে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। এর আগে বিদ্যালয় প্রাঙ্গণ থেকে একটি র‍্যালি বের করা হয়।

সভায় সভাপতিত্ব করেন বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা, প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ বিভাগের কর্মকর্তা দীপান্বিতা ভট্টাচার্য। প্রধান অতিথি ছিলেন বাঁশখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. রুহুল আমিন।

বাঁশখালী ইকোপার্কের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. ইসরাইল হকের সঞ্চালনায় সভায় বক্তব্য দেন সরকারি আলাওল কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ মো. আজিজুর রহমান, নাপোড়া শেখেরখীল উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. জাহাঙ্গীর আলম, উপজেলা প্রাণিসম্পদ সম্প্রসারণ দপ্তরের কর্মকর্তা ডা. শাহজাদা জুলকার নাইন, উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মো. রেজাউল করিম, সাংবাদিক শিব্বির আহমদ রানা ও প্রকাশ বড়ুয়া।

সভায় বক্তারা বলেন, হাতি বাংলাদেশের জীববৈচিত্র্য ও প্রাকৃতিক পরিবেশের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। হাতির আবাসস্থল ও বন রক্ষা, মানুষ-হাতির সংঘাত কমানো এবং স্থানীয় জনগণের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। একই সঙ্গে হাতির নিরাপদ বিচরণক্ষেত্র নিশ্চিত করতে বন সংরক্ষণ ও অবৈধ দখল রোধে গুরুত্ব দিতে হবে।

অনুষ্ঠানে বন্য হাতির আক্রমণে ক্ষতিগ্রস্ত ৪৫ কৃষকের মধ্যে সরকারি অনুদান হিসেবে মোট ১৯ লাখ ১৫ হাজার টাকার চেক বিতরণ করা হয়। এছাড়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিভাগভিত্তিক চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতায় বিজয়ীদের পুরস্কার এবং শতাধিক শিক্ষার্থীর মাঝে বিভিন্ন ধরনের ফলদ গাছের চারা বিতরণ করা হয়।

অনুষ্ঠানে বনকর্মী, শিক্ষক, সংবাদকর্মী, সমাজকর্মী, স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি ও শিক্ষার্থীরা উপস্থিত ছিলেন।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বাঁশখালীতে গত এক দশকে বন্য হাতির আক্রমণে অন্তত ১২ থেকে ১৩ জনের প্রাণহানি হয়েছে। একই সময়ে বিভিন্ন কারণে প্রায় ১৪ থেকে ১৫টি বন্য হাতির মৃত্যু হয়েছে। বর্তমানে উপজেলার বনাঞ্চলে আনুমানিক ১৫ থেকে ২০টি বন্য হাতি বিচরণ করছে।




কমেন্ট করুন:

ফেসবুকে আমরা
সর্বশেষ সংবাদ
Sidebar Ad