টাকা ছাপিয়ে দুর্বল ব্যাংকগুলোকে দেওয়া ধার ছাড়াল ৮৫ হাজার কোটি টাকা

  • প্রথম দর্পণ,ডেস্ক
  • আপলোড সময় : ১৩ আগস্ট ২০২৬, ১০:৩২ দুপুর
  • ১৪২৪ বার পড়া হয়েছে

Banner Ad
https://prothomdorpan.com/admin/fav-icon-logo/image/1761146741.250..125.jpg

দুর্বল ও তারল্যসংকটে থাকা ব্যাংকগুলোকে টিকিয়ে রাখতে বাংলাদেশ ব্যাংকের দেওয়া তারল্য সহায়তার পরিমাণ ক্রমেই বাড়ছে। গত তিন মাসে নতুন করে প্রায় ১৭ হাজার কোটি টাকা সহায়তা দেওয়ায় এসব ব্যাংককে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দেওয়া মোট ধার ৮৫ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। তবে দীর্ঘদিন ধরে বিপুল অঙ্কের এই ধার পরিশোধ করতে পারছে না সংকটে থাকা ব্যাংকগুলো।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের আগে ও পরে দেশের একাধিক ব্যাংক ব্যাপক ঋণ অনিয়ম ও লুটপাটের কারণে আর্থিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে। বিশেষ করে এস আলম গ্রুপসহ কয়েকটি ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বিভিন্ন ব্যাংক থেকে বড় অঙ্কের অর্থ বের করে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এর ফলে কয়েকটি ব্যাংক গ্রাহকের আমানত ফেরত দিতেও হিমশিম খাচ্ছে।

এ পরিস্থিতিতে আওয়ামী লীগ সরকারের শেষদিকে সংকটে থাকা ব্যাংকগুলোকে টাকা ছাপিয়ে তারল্য সহায়তা দেওয়া শুরু করে বাংলাদেশ ব্যাংক। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ও ব্যাংকগুলোর সংকট প্রকট হওয়ায় এ সহায়তা অব্যাহত থাকে। পরে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগকে কেন্দ্র করে অস্থিরতা তৈরি হলে ব্যাংকটিকে আবারও তারল্য সহায়তা দিতে হয়।

১৩ ব্যাংককে ৮৫ হাজার কোটি টাকার বেশি

সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত ১৩টি ব্যাংককে টাকা ছাপিয়ে ৮৫ হাজার কোটি টাকার বেশি ধার দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর মধ্যে আওয়ামী লীগ সরকারের শেষদিকের গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদারের সময়ে দেওয়া হয় ১৭ হাজার ২৫০ কোটি টাকা। অন্তর্বর্তী সরকারের গভর্নর আহসান এইচ মনসুরের সময়ে দেওয়া হয় ৫১ হাজার কোটি টাকা। আর বর্তমান গভর্নর মোস্তাকুর রহমানের সময়ে দেওয়া হয়েছে প্রায় ১৭ হাজার কোটি টাকা।

খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, ব্যাংকগুলো লুটপাট ও অনিয়মের কারণে সংকটে পড়েছে—এটি বাস্তবতা। তবে এভাবে ধার দিয়ে দীর্ঘদিন ব্যাংকগুলোকে টিকিয়ে রাখা সম্ভব কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। কারণ, বিপুল অর্থ সহায়তা দেওয়ার পরও অনেক ব্যাংকের আর্থিক অবস্থার কাঙ্ক্ষিত উন্নতি হয়নি। কয়েকটি ব্যাংক একীভূত করার উদ্যোগ নেওয়া হলেও এ ক্ষেত্রেও অগ্রগতি সীমিত।

সংকটের নেপথ্যে

আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ব্যাংক খাতের বিভিন্ন অনিয়ম ও আর্থিক দুর্বলতা অনেকটাই আড়ালে ছিল। ২০২২ সালের শেষদিকে এস আলমের নিয়ন্ত্রণাধীন বিভিন্ন ব্যাংকে ঋণ জালিয়াতির খবর প্রকাশ্যে আসতে শুরু করলে গ্রাহকদের মধ্যে আস্থার সংকট তৈরি হয়। অনেক গ্রাহক ব্যাংক থেকে আমানত তুলে নিতে শুরু করায় ব্যাংকগুলো তারল্য সংকটে পড়ে।

একপর্যায়ে কয়েকটি ব্যাংক বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে বিধিবদ্ধ নগদ জমা সংরক্ষণ বা সিআরআর এবং সরকারি সিকিউরিটিজ হিসেবে এসএলআর সংরক্ষণেও ব্যর্থ হয়। এরপরও তৎকালীন গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদারের সময়ে এসব ব্যাংককে বিভিন্ন সুবিধা দিয়ে টিকিয়ে রাখার অভিযোগ ওঠে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানান, বাংলাদেশ ব্যাংকের মতিঝিল অফিসে প্রতিটি ব্যাংকের একটি চলতি হিসাব থাকে। এ হিসাবের মাধ্যমে সিআরআর ও এসএলআর সংরক্ষণ, আন্তঃব্যাংক লেনদেন নিষ্পত্তি এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে দেওয়া পুনঃঅর্থায়নসহ বিভিন্ন লেনদেন সম্পন্ন হয়।

সাধারণত সিআরআর ও এসএলআরে ঘাটতি থাকলেও চলতি হিসাবে ঘাটতি হওয়ার কথা নয়। তবে এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণাধীন কয়েকটি ব্যাংকের ঋণযোগ্য তহবিল শেষ হয়ে যাওয়ার পর তাদের চলতি হিসাব ঋণাত্মক করে লেনদেনের সুযোগ দেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। ২০২২ সালের শেষদিকে শরিয়াহভিত্তিক পাঁচটি ব্যাংকের ক্ষেত্রে এ ধরনের ব্যবস্থা চালু করা হয়। এর ফলে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ব্যাংকগুলো লেনদেন চালিয়ে যেতে সক্ষম হয়।

সরকার পতনের পর নতুন গভর্নর আহসান এইচ মনসুর দায়িত্ব নিয়ে এ ধরনের অনিয়মের সুযোগ বন্ধ করেন। একই সঙ্গে তিনি টাকা ছাপিয়ে ব্যাংকগুলোকে আর তারল্য সহায়তা না দেওয়ার অবস্থান জানান। কিন্তু ব্যাংকগুলোর সংকট তীব্র হওয়ায় সেই সিদ্ধান্ত বেশিদিন কার্যকর রাখা সম্ভব হয়নি। চলতি হিসাবে ঘাটতি এবং নতুন করে টাকা না পাওয়ায় গ্রাহকদের অর্থ ফেরত দিতে সমস্যায় পড়ে ব্যাংকগুলো। বিভিন্ন শাখায় অস্থিরতা দেখা দিলে আবারও টাকা ছাপিয়ে তারল্য সহায়তা দিতে শুরু করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

কোন ব্যাংক কত টাকা ধার পেয়েছে

বাংলাদেশ ব্যাংকের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, টাকা ছাপিয়ে সবচেয়ে বেশি ধার দেওয়া হয়েছে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশকে—১৭ হাজার কোটি টাকা। এরপর ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক পেয়েছে ১৫ হাজার ৮১০ কোটি টাকা।

এ ছাড়া এক্সিম ব্যাংককে ১২ হাজার ১০ কোটি, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংককে ১০ হাজার ৮৪১ কোটি, ন্যাশনাল ব্যাংককে ১০ হাজার ৫৬৮ কোটি, ইউনিয়ন ব্যাংককে ৫ হাজার ৪২০ কোটি এবং প্রিমিয়ার ব্যাংককে ৪ হাজার ৯০০ কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে।

অন্যদিকে এবি ব্যাংককে ৪ হাজার ২৭০ কোটি, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংককে ৩ হাজার ৩ কোটি, বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংককে ৬২৪ কোটি, আইসিবি ইসলামিক ব্যাংককে ২৫২ কোটি, পদ্মা ব্যাংককে ২৫২ কোটি এবং বেসিক ব্যাংককে ১৯৫ কোটি টাকা ধার দেওয়া হয়েছে।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান বলেন, এভাবে তারল্য সহায়তা দেওয়া আর ঠিক হবে না। তবে আমানতকারীরা অর্থ ফেরত না পেলে ব্যাংক খাতে আস্থাহীনতা তৈরি হয়ে সংকট আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কা থাকায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক অনেকটা বাধ্য হয়েই এসব সহায়তা দিচ্ছে।




কমেন্ট করুন:

ফেসবুকে আমরা
সর্বশেষ সংবাদ
Sidebar Ad