রাষ্ট্রপতি পদে বিএনপির মনোনয়ন পাচ্ছেন মির্জা ফখরুল, প্রতিদ্বন্দ্বী অলি আহমদ

  • প্রথম দর্পণ,ডেস্ক
  • আপলোড সময় : ১০ আগস্ট ২০২৬, ০৯:৪২ সকাল
  • ৫১৭৮ বার পড়া হয়েছে

Banner Ad
https://prothomdorpan.com/admin/fav-icon-logo/image/1761146741.250..125.jpg

বাংলাদেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচন এবার ভোটাভুটিতে গড়াচ্ছে। দীর্ঘ ৩৫ বছর পর সংসদ সদস্যদের ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। ক্ষমতাসীন বিএনপির পক্ষ থেকে দলের মহাসচিব ও স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নাম প্রায় চূড়ান্ত হয়েছে। তবে দলটি এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে প্রার্থীর নাম ঘোষণা করেনি।

অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী হিসেবে লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদ, বীর বিক্রমকে মনোনয়ন দিয়েছে। ফলে শেষ পর্যন্ত মনোনয়নপত্র বহাল থাকলে আগামী ২০ আগস্ট রাষ্ট্রপতি পদে সংসদ সদস্যদের প্রকাশ্য ভোট অনুষ্ঠিত হবে।

নির্বাচন কমিশনের (ইসি) তফসিল অনুযায়ী, আগামী ১৩ আগস্ট রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার শেষ দিন। ১৬ আগস্ট মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই এবং ১৮ আগস্ট প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ দিন। ভোট হবে ২০ আগস্ট জাতীয় সংসদ ভবনে।

মির্জা ফখরুলের নাম প্রায় চূড়ান্ত

ক্ষমতাসীন বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের সূত্র জানিয়েছে, রাষ্ট্রপতি পদে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের মনোনয়ন প্রায় চূড়ান্ত। সম্প্রতি দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী মনোনয়নের দায়িত্ব দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ওপর দেওয়া হয়।

রাষ্ট্রপতি পদে বিএনপির পক্ষ থেকে দুটি মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করা হয়েছে। গতকাল সকালে নির্বাচন কমিশন ভবন থেকে মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেন জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি এবং প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবীর রিজভী।

তবে দুটি মনোনয়নপত্র নেওয়া হলেও একাধিক প্রার্থীর পক্ষে সেগুলো জমা দেওয়া হবে না বলে জানিয়েছেন চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি। ভুলত্রুটি এড়াতে একজন প্রার্থীর পক্ষেই দুটি মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার প্রস্তুতি রয়েছে।

বিএনপির শীর্ষ পর্যায়ের সূত্রগুলোর দাবি, মির্জা ফখরুলকে দলের দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত ও ত্যাগী নেতা হিসেবে রাষ্ট্রপতি পদে বেছে নেওয়ার বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে। শেখ হাসিনা সরকারের সময়ে তিনি দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম, মামলা, কারাবরণ ও নিপীড়নের মধ্যেও দলের নেতৃত্বে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন।

তবে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেনের নামও আলোচনায় রয়েছে। দলের বাইরে থেকে কাউকে রাষ্ট্রপতি করার ক্ষেত্রে সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান ও নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নামও আলোচনায় এসেছে। যদিও প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি পদে তার সঙ্গে কোনো যোগাযোগ বা আলোচনা হয়নি বলে জানা গেছে।

মির্জা ফখরুল রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়ন পেলে তাকে বিএনপির মহাসচিবের পদ ছাড়তে হবে। সেক্ষেত্রে দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবীর রিজভী ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব পেতে পারেন। একই সঙ্গে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়েও নতুন মুখ আসার সম্ভাবনা রয়েছে।

অলি আহমদ বিরোধী জোটের প্রার্থী

শনিবার রাতে জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সিদ্ধান্ত নেয়। পরে রোববার জোটের বৈঠক শেষে এলডিপি চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদকে রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী ঘোষণা করা হয়।

জোটের অন্যতম শরিক জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, ১১ দলীয় জোটের পক্ষ থেকে অলি আহমদকে রাষ্ট্রপতি প্রার্থী করা হয়েছে।

জোটের নেতারা জানান, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে প্রতিযোগিতামূলক ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় নেওয়ার লক্ষ্যেই তারা প্রার্থী দিয়েছেন। তাদের মতে, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন এবং সংবিধান সংস্কারের প্রক্রিয়া সম্পন্ন না করে বর্তমান ব্যবস্থায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করা হচ্ছে।

জামায়াতের আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেন, গণতন্ত্রের সৌন্দর্য হিসেবে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করাকে তারা দায়িত্ব হিসেবে নিয়েছেন। দেশের জন্য বিবেচনায় সর্বোত্তম ব্যক্তিকে তারা প্রার্থী করেছেন বলেও জানান তিনি।

এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম অভিযোগ করেন, সরকার গণভোটের রায় অনুযায়ী জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করছে না এবং সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের উদ্যোগও নেয়নি। বিএনপির নির্বাচন-পরবর্তী অবস্থান ও জুলাই সনদ বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি নিয়েও তিনি প্রশ্ন তোলেন।

কেন প্রার্থী দিল ১১ দলীয় জোট

জোটের নেতারা বলছেন, জুলাই সনদে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন পদ্ধতিতে পরিবর্তনের প্রস্তাব রয়েছে। সেখানে সংসদের উভয় কক্ষের সদস্যদের গোপন ভোটে সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের কথা বলা হয়েছে।

জুলাই সনদে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী হওয়ার সময় কোনো ব্যক্তি রাষ্ট্রীয়, সরকারি বা রাজনৈতিক দল কিংবা সংগঠনের পদে থাকতে পারবেন না। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের এই প্রস্তাবের সঙ্গে বিএনপি, জামায়াতসহ ২৯টি রাজনৈতিক দল একমত হয়েছিল। তবে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ এতে নোট অব ডিসেন্ট দেয়।

১১ দলীয় জোটের নেতাদের প্রত্যাশা ছিল, জুলাই সনদ বাস্তবায়নের পর সংস্কারকৃত সংবিধানের অধীনে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হবে। কিন্তু তা না হওয়ায় বর্তমান সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্যেই প্রতিদ্বন্দ্বিতায় যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় তারা।

বিএনপির রয়েছে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা

রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে মোট ভোটার ৩৪৯ জন। এর মধ্যে বিএনপির ২৪৭ সংসদ সদস্য রয়েছেন। দলটির জোটসঙ্গী ও সমমনা দলগুলোর আরও তিনজন সংসদ সদস্য রয়েছেন। সব মিলিয়ে বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোটের ভোট ২৫০।

অন্যদিকে জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের সংসদ সদস্য ৯০ জন। এর মধ্যে জামায়াতের ৭৭, এনসিপির আট, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের তিন, খেলাফত মজলিসের একজন এবং জাগপার একজন সংসদ সদস্য রয়েছেন। এছাড়া আটজন স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের একজন সদস্য রয়েছেন।

ফলে সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতার দিক থেকে বিএনপি জোট এগিয়ে থাকায় তাদের মনোনীত প্রার্থীর রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার সম্ভাবনাই সবচেয়ে বেশি।

রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে সংসদ সদস্যদের প্রকাশ্য ভোট দিতে হয়। সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের কারণে দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে ভোট দেওয়ার সুযোগ নেই। দলীয় সিদ্ধান্তের বিপক্ষে ভোট দিলে সংসদ সদস্যপদ হারানোর বিধান রয়েছে।

১৯৯১ সালের পর আবার ভোট

বাংলাদেশের ইতিহাসে এর আগে একবারই সংসদ সদস্যদের ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছিল। ১৯৯১ সালে বিএনপি সরকার গঠনের পর রাষ্ট্রপতি পদে ভোট অনুষ্ঠিত হয়।

ওই বছরের ৮ অক্টোবরের নির্বাচনে বিএনপি মনোনীত আবদুর রহমান বিশ্বাস ১৭২ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন। তার প্রতিদ্বন্দ্বী আওয়ামী লীগ সমর্থিত বিচারপতি বদরুল হায়দার চৌধুরী পেয়েছিলেন ৯২ ভোট।

এরপর সংসদীয় পদ্ধতির সরকারব্যবস্থায় রাষ্ট্রপতি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়নি। একক প্রার্থী থাকায় পরবর্তী রাষ্ট্রপতিরা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন।

এবার ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী ঘোষণার ফলে ৩৫ বছর পর আবারও রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোটের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের তফসিল

নির্বাচন কমিশনের ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী—

মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার শেষ দিন: ১৩ আগস্ট

মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই: ১৬ আগস্ট

প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ দিন: ১৮ আগস্ট

ভোটগ্রহণ: ২০ আগস্ট

ভোটের স্থান: জাতীয় সংসদ ভবন

প্রধান নির্বাচন কমিশনার এএমএম নাসির উদ্দিন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে নির্বাচনি কর্তার দায়িত্ব পালন করবেন।

কীভাবে হবে ভোট

রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আইন, ১৯৯১ অনুযায়ী সংসদ সদস্যদের প্রকাশ্য ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হবেন। প্রত্যেক সংসদ সদস্যের একটি করে ভোট থাকবে।

নির্বাচন কমিশন প্রয়োজনীয় সংখ্যক ব্যালট পেপার প্রস্তুত করবে। ভোটার ব্যালট সংগ্রহের পর নির্দিষ্ট স্থানে প্রার্থীর নামের বিপরীতে স্বাক্ষর করে ভোট দেবেন এবং ব্যালট বাক্সে তা জমা দেবেন।

ভোটগ্রহণ শেষে নির্বাচন কমিশনার প্রকাশ্যে ভোট গণনা করবেন। যে প্রার্থী সর্বোচ্চসংখ্যক ভোট পাবেন, তাকে নির্বাচিত ঘোষণা করা হবে। প্রার্থীরা সমান ভোট পেলে লটারির মাধ্যমে ফল নির্ধারণের বিধান রয়েছে।

ইসির প্রস্তুতি

প্রথমে একক প্রার্থী ধরে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি নিচ্ছিল নির্বাচন কমিশন। কিন্তু বিরোধী জোট অলি আহমদকে প্রার্থী ঘোষণা করায় পরিস্থিতি বদলে গেছে।

রোববার প্রধান নির্বাচন কমিশনার এএমএম নাসির উদ্দিনের নেতৃত্বে কমিশনের অনির্ধারিত বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে ভোটকক্ষ প্রস্তুত, ব্যালট বাক্স ও ব্যালট পেপার তৈরিসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়।

মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাইয়ের পর একাধিক প্রার্থী থাকলে ১৮ আগস্ট ব্যালট পেপার ছাপানোর পরিকল্পনা রয়েছে। ভোটার সংখ্যা মাত্র ৩৪৯ জন হওয়ায় ভোটগ্রহণের প্রস্তুতি তুলনামূলক সহজ হবে বলে মনে করছে ইসি।

সংবিধানে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের বিধান

সংবিধানের ৪৮ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী বাংলাদেশের একজন রাষ্ট্রপতি থাকবেন এবং তিনি আইন অনুযায়ী সংসদ সদস্যদের দ্বারা নির্বাচিত হবেন।

রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী হওয়ার জন্য কোনো ব্যক্তির বয়স কমপক্ষে ৩৫ বছর হতে হবে। তাকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার যোগ্য হতে হবে এবং এর আগে সংবিধানের অধীনে অভিশংসনের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতির পদ থেকে অপসারিত হওয়া যাবে না।

২৩তম রাষ্ট্রপতি কে?

বর্তমান ২২তম রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন চুপ্পু গত ২৪ জুলাই পদত্যাগ করেন। এরপর জাতীয় সংসদের স্পিকার মেজর (অব.) মো. হাফিজউদ্দিন আহমদ, বীর বিক্রম ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করছেন।

এখন সবকিছু নির্ভর করছে ১৩ আগস্ট মনোনয়নপত্র জমা, ১৬ আগস্ট যাচাই-বাছাই এবং ১৮ আগস্ট প্রার্থিতা প্রত্যাহারের ওপর। অলি আহমদের মনোনয়ন বহাল থাকলে ২০ আগস্ট সংসদ সদস্যদের ভোটেই নির্ধারিত হবে দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি।

তবে বিএনপির সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার কারণে দলের মনোনীত প্রার্থীই নির্বাচনে এগিয়ে থাকবেন—এমন হিসাবই রাজনৈতিক অঙ্গনে সবচেয়ে বেশি আলোচিত হচ্ছে। সেই হিসাবে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের রাষ্ট্রপতি হওয়ার সম্ভাবনাই এখন সবচেয়ে বেশি।




কমেন্ট করুন:

ফেসবুকে আমরা
Sidebar Ad