মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রনির্ভর নিরাপত্তাব্যবস্থায় পরিবর্তনের ইঙ্গিত

  • প্রথম দর্পণ,আন্তর্জাতিক ডেস্ক
  • আপলোড সময় : ১২ আগস্ট ২০২৬, ১২:২৩ দুপুর
  • ৪২০০ বার পড়া হয়েছে

Banner Ad
https://prothomdorpan.com/admin/fav-icon-logo/image/1761146741.250..125.jpg

লোহিত সাগরকে ঘিরে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন ধরনের আঞ্চলিক নিরাপত্তাব্যবস্থা গড়ে ওঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সৌদি আরবের নেতৃত্বে ১৪ দেশের একটি বহুজাতিক সামুদ্রিক প্রতিরক্ষা জোট গঠনের উদ্যোগকে মধ্যপ্রাচ্যের প্রচলিত যুক্তরাষ্ট্রনির্ভর নিরাপত্তাব্যবস্থায় পরিবর্তনের সম্ভাব্য ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে। নতুন এই জোট কার্যকর হলে আঞ্চলিক নিরাপত্তা, সংঘাত ব্যবস্থাপনা ও স্থিতিশীলতা রক্ষায় স্থানীয় দেশগুলোর ভূমিকা আরও বাড়তে পারে।

গত ৩০ জুলাই সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে নতুন জোট প্রতিষ্ঠার ঘোষণায় সংশ্লিষ্ট দেশগুলো স্বাক্ষর করে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, জোটটির স্থায়ী সদর দপ্তর, সমন্বিত কমান্ড কাঠামো, যৌথ কমান্ড ও নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র, সামুদ্রিক অভিযান কেন্দ্র এবং স্থায়ী সচিবালয় সৌদি আরবে স্থাপন করা হবে।

তবে জোটটি এখনো পুরোপুরি কার্যকর হয়নি। কোন দেশ কী পরিমাণ সামরিক সক্ষমতা সরবরাহ করবে, প্রয়োজনে কীভাবে অভিযান পরিচালিত হবে এবং যুক্তরাষ্ট্র এতে আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্ত হবে কি না—এসব বিষয় এখনো স্পষ্ট নয়। ফলে আপাতত এটিকে রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ হিসেবেই দেখা হচ্ছে।

নতুন জোটের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সৌদি আরব ও মিসরের অংশগ্রহণ। ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে লোহিত সাগরের নিরাপত্তার জন্য ‘অপারেশন প্রসপারিটি গার্ডিয়ান’ শুরু হলেও সৌদি আরব ও মিসর এতে অংশ নেয়নি। এবার দেশ দুটি নতুন সামুদ্রিক জোটের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এর মধ্য দিয়ে সৌদি আরবসহ আঞ্চলিক দেশগুলো অন্যদের নেওয়া সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের পরিবর্তে নিজেদের নিরাপত্তাসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণে আরও বড় ভূমিকা নিতে চাইছে।

লোহিত সাগরকেন্দ্রিক এই উদ্যোগের সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যে সাম্প্রতিক অন্যান্য প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা সহযোগিতারও যোগসূত্র রয়েছে। ২০২৫ সালে সৌদি আরব ও পাকিস্তানের মধ্যে কৌশলগত পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি হয়। পরে তুরস্ক ও মিসরের মধ্যে সামরিক ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা জোরদারের উদ্যোগ নেওয়া হয়। গত ৭ আগস্ট মক্কায় তুরস্ক, পাকিস্তান ও সৌদি আরবের মধ্যে ত্রিপক্ষীয় সহযোগিতার নতুন কাঠামো নিয়েও সমঝোতা হয়েছে। পাশাপাশি সৌদি আরব, পাকিস্তান, মিসর ও তুরস্ককে নিয়ে ‘আর৪’ নামে একটি রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা সহযোগিতা কাঠামোও গড়ে উঠেছে।

এদিকে মধ্যপ্রাচ্যে প্রচলিত কঠোর সামরিক জোটের পরিবর্তে প্রয়োজন ও স্বার্থভিত্তিক একাধিক সহযোগিতা কাঠামো গড়ে ওঠার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। অর্থাৎ সব দেশের জন্য একই ধরনের সামরিক জোট গঠনের বদলে নির্দিষ্ট ইস্যুতে নির্দিষ্ট দেশগুলো পারস্পরিক সহযোগিতায় যুক্ত হচ্ছে।

লোহিত সাগর অঞ্চলে হুথিদের কর্মকাণ্ডকে নতুন জোট গঠনের অন্যতম কারণ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। ২০২৩ ও ২০২৪ সালে হুথিদের হামলার প্রধান লক্ষ্য ছিল ইসরাইল-সংশ্লিষ্ট ও পশ্চিমা বাণিজ্যিক জাহাজ। তবে সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে তাদের কর্মকাণ্ডের প্রভাব সৌদি আরবের অর্থনৈতিক স্বার্থের ওপরও পড়তে শুরু করেছে।

হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ায় সৌদি আরবের তেল রপ্তানির একটি অংশ লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দর দিয়ে পরিচালনার প্রয়োজন বাড়ছে। ফলে লোহিত সাগরে নিরাপত্তাহীনতা দেশটির জ্বালানি রপ্তানি ও অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। একই সঙ্গে বাব আল-মান্দাব প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের ওপর হুথিদের নিয়ন্ত্রণ বা সম্ভাব্য ফি আরোপের আশঙ্কাও নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।

বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, এমন পরিস্থিতি তৈরি হলে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে রাষ্ট্রের বাইরে থাকা কোনো সশস্ত্র গোষ্ঠীর দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রভাব বাড়তে পারে।

সব মিলিয়ে লোহিত সাগরকেন্দ্রিক নতুন সামুদ্রিক প্রতিরক্ষা জোটকে শুধু একটি সামরিক উদ্যোগ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি মধ্যপ্রাচ্যের পরিবর্তিত নিরাপত্তা বাস্তবতারও প্রতিফলন। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি ও প্রভাব বজায় থাকলেও আঞ্চলিক দেশগুলো নিজেদের নিরাপত্তা ও কৌশলগত স্বার্থ রক্ষায় আরও সক্রিয় ভূমিকা নিতে চাইছে।

তবে নতুন জোট ও সহযোগিতা কাঠামোগুলো বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। সদস্য দেশগুলোর সামরিক অবদান, যৌথ সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতি এবং সংকটের সময় পারস্পরিক সহযোগিতার বিষয়গুলো স্পষ্ট হওয়ার পরই বোঝা যাবে—লোহিত সাগরে সত্যিই নতুন কোনো কার্যকর আঞ্চলিক নিরাপত্তা জোট গড়ে উঠছে, নাকি এটি মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তাব্যবস্থায় আরও বড় পরিবর্তনের সূচনা।




কমেন্ট করুন:

ফেসবুকে আমরা
সর্বশেষ সংবাদ
Sidebar Ad