আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেছেন, ন্যায়বিচারে প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা মানবাধিকার নিশ্চিত করারই অংশ। প্রত্যেক মানুষের কিছু অবিচ্ছেদ্য, সহজাত ও সার্বজনীন অধিকার রয়েছে। নাগরিকরা যাতে এসব অধিকার যথাযথভাবে প্রয়োগ করতে পারেন, তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
শনিবার (১৫ আগস্ট) সকালে গাজীপুরের রাজেন্দ্রপুরে ব্র্যাক-সিডিএমে বিচারক, লিগ্যাল এইড কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের অংশগ্রহণে ‘অ্যাক্সেলারেটিং ডিজিটাল লিগ্যাল এইড সার্ভিসেস ইন বাংলাদেশ’ প্রকল্পের দুই দিনব্যাপী সমন্বয় সভার উদ্বোধনকালে তিনি এসব কথা বলেন।
সভায় সুবিধাবঞ্চিত ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে ডিজিটাল আইনি সহায়তা কার্যকরভাবে পৌঁছে দেওয়ার বিষয়টি গুরুত্ব পায়। এ লক্ষ্যে নয়টি জেলার ৫৭টি উপজেলা লিগ্যাল এইড কমিটি এবং ৪১৩টি ইউনিয়ন লিগ্যাল এইড কমিটির কার্যক্রম আরও কার্যকর ও সমন্বিত করার বিষয়ে আলোচনা হয়। জেলাগুলো হলো—রাজবাড়ী, হবিগঞ্জ, বরগুনা, নেত্রকোনা, জয়পুরহাট, ঠাকুরগাঁও, ঝিনাইদহ, খাগড়াছড়ি ও বগুড়া।
এসব কমিটিকে তৃণমূল পর্যায়ে আইনি সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার কার্যকর প্ল্যাটফর্ম হিসেবে গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। এর মাধ্যমে দরিদ্র, নারী, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি ও অন্যান্য সুবিধাবঞ্চিত মানুষ যাতে সহজে আইনি পরামর্শ ও সহায়তা পান এবং প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে আদালতে যাওয়ার আগেই মধ্যস্থতার মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তির সুযোগ পান, সে বিষয়ে আলোচনা করা হয়।
আইনমন্ত্রী বলেন, ন্যায়বিচারে প্রবেশাধিকার শুধু বিরোধ নিষ্পত্তি বা মধ্যস্থতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর মূল লক্ষ্য প্রত্যেক নাগরিকের মানবাধিকার সংরক্ষণ, সুরক্ষা ও নিশ্চিত করা। গুরুতর অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তিরও আত্মপক্ষ সমর্থনের অধিকার রয়েছে এবং রাষ্ট্রকে সেই অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।
তিনি বলেন, বিচারকদের শুধু আইনের কালো অক্ষরের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। মামলার বাস্তবতা, সামাজিক প্রেক্ষাপট এবং ন্যায়বিচারের উদ্দেশ্য বিবেচনায় নিয়ে আইনের ব্যাখ্যা করতে হবে। বিচারিক কর্মকর্তাদের সর্বোপরি জনগণের সেবা করতে হবে।
কর্মক্ষেত্রে অসাধারণ ও অনুকরণীয় ভূমিকা রাখা লিগ্যাল এইড কর্মকর্তাদের মূল্যায়ন ও উৎসাহিত করার ওপরও গুরুত্ব দেন আইনমন্ত্রী। তিনি বাংলাদেশ আইনগত সহায়তা অধিদপ্তরের মহাপরিচালককে দেশের আটটি বিভাগ থেকে একজন করে মোট আটজন ‘সেরা লিগ্যাল এইড অফিসার’কে স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেন।
এ ছাড়া বিচার বিভাগে কর্মরত কর্মকর্তাদের মধ্য থেকে অসাধারণ ও অনুকরণীয় কর্মসম্পাদনের ভিত্তিতে সারাদেশের ২০ জন বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তাকে স্বীকৃতি দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়ার কথাও বলেন তিনি।
আইনমন্ত্রী বলেন, এ ধরনের স্বীকৃতি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কর্মসম্পাদনে উৎসাহ বাড়াবে। পাশাপাশি আর্থিক প্রণোদনা এবং পদোন্নতি ও গুরুত্বপূর্ণ পদায়নের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনায় ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।
ডিজিটাল প্রযুক্তির গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, প্রযুক্তির মাধ্যমে আইনি সহায়তা সম্পর্কে জনসচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি আবেদন গ্রহণ, মামলার অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ এবং বিরোধ নিষ্পত্তির সুযোগ আরও সহজ করা সম্ভব। তবে এ ক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহারের সম্ভাব্য ঝুঁকিও বিবেচনায় নিতে হবে।
সভায় আইনগত সহায়তা প্রদান আইন, ২০০০-এর ২০২৬ সালের সংশোধনীর আলোকে অনলাইন বিরোধ নিষ্পত্তি (ওডিআর) ব্যবস্থা প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ এবং মধ্যস্থতার সঙ্গে ডিজিটাল আইনি সহায়তা ব্যবস্থার সমন্বয় নিয়েও আলোচনা হয়। এ সময় ডিজিটাল লিগ্যাল এইড সিস্টেমের নকশা, উন্নয়ন ও বাস্তবায়ন এবং এ বিষয়ে পরিচালিত গবেষণার ফলাফল উপস্থাপন করা হয়।
আইনমন্ত্রী জানান, বর্তমানে দেশে প্রায় ৪৫ লাখ বিচারাধীন মামলা রয়েছে। আগামী এক বছরের মধ্যে মামলার সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনার লক্ষ্য রয়েছে। এ ক্ষেত্রে লিগ্যাল এইড, মধ্যস্থতা, ডিজিটাল প্রযুক্তি ও বিচারিক কার্যক্রমের সমন্বিত ব্যবহার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. মঞ্জুরুল হোসাইনের সভাপতিত্বে সভায় ইউএনডিপি বাংলাদেশের সিনিয়র রুল অব ল, জাস্টিস অ্যান্ড সিকিউরিটি অ্যাডভাইজার রোমানা শোয়েগার, বাংলাদেশে ইউরোপীয় ইউনিয়নের চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স বাইবা জারিনা এবং আইন ও বিচার বিভাগের সচিব লিয়াকত আলী মোল্লা বক্তব্য দেন।
সভা চলবে আগামীকাল রোববার (১৬ আগস্ট) পর্যন্ত। দ্বিতীয় দিনের আলোচনায় জেলা ও দায়রা জজদের প্রশিক্ষণ, লিগ্যাল এইড কমিটির কার্যক্রম, আইনি সহায়তা-সংক্রান্ত তথ্য সংরক্ষণ ও প্রতিবেদন প্রণয়ন নিয়ে আলোচনা হবে। একই সঙ্গে নারী, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি ও দারিদ্র্যপীড়িত মানুষের জন্য বিচারিক সেবা ও আইনি সহায়তা নিশ্চিত করার বিষয়গুলো পর্যালোচনা এবং ডিজিটাল সেবা উন্নয়নের ক্ষেত্র চিহ্নিত করা হবে।

প্রথম দর্পণ,ডেস্ক