অভিযোগ রয়েছে, লটারিতে নাম ওঠার পরও অনেক কৃষক গুদামে ধান দিতে পারেননি। কৃষকের তালিকায় মৃত ব্যক্তির নাম, নামের সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ মোবাইল ফোন নম্বর এবং কৃষিকাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত নন—এমন ব্যক্তিদের নাম থাকার অভিযোগও পাওয়া গেছে। এ ছাড়া সিন্ডিকেটের সদস্যদের মধ্যে কৃষকদের নাম ভাগ করে দেওয়া এবং তাঁদের মাধ্যমে ধান সংগ্রহের অভিযোগও রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, রৌমারী খাদ্যগুদামের কৃষক তালিকায় ৩২২ জনের নাম থাকার কথা থাকলেও সেখানে ৩২৩ জনের নাম রয়েছে। চলতি মৌসুমে উপজেলায় ৯৬৬ মেট্রিক টন ধান সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। গত ২৪ মে ধান সংগ্রহ কার্যক্রমের উদ্বোধন করা হয়।
অভিযোগ রয়েছে, ধান সংগ্রহের ক্ষেত্রে ডিজিটালাইজড পদ্ধতি যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়নি। নতুন বস্তায় ধান সংগ্রহের নিয়ম থাকলেও পুরোনো ও জরাজীর্ণ বস্তায় ধান নেওয়ার অভিযোগও করেছেন কৃষকেরা।
খাদ্যগুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা লিটন কুমার রায়ের বিরুদ্ধে সরকারি ছুটির দিন ও রাতের আঁধারে ধান গুদামজাত করার অভিযোগও রয়েছে। স্থানীয় প্রশাসন ও সাংবাদিকদের ‘ম্যানেজ’ করার কথা বলে প্রতি ৩ মেট্রিক টন ধানের বিপরীতে কৃষকের কাছ থেকে ৩ হাজার ৩০০ টাকা করে উৎকোচ নেওয়ার অভিযোগ করেছেন কয়েকজন কৃষক। একই সঙ্গে সিন্ডিকেটের সদস্যদের একজনকে ২০ থেকে ৩০ জন কৃষকের বিল দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
উপজেলার বন্দবেড় গ্রামের কৃষক মাহমুদুল অভিযোগ করেন, লটারির তালিকায় তাঁর নাম থাকার পরও খাদ্যগুদামে তাঁর ধান গ্রহণ করা হয়নি। পরে তাঁর বিল অন্য কেউ উত্তোলন করেছেন কি না, তা জানতে চাইলে খাদ্যগুদামের কর্মকর্তা তাঁকে ১৯ হাজার টাকা নিয়ে বিষয়টি মীমাংসা করার প্রস্তাব দেন বলে দাবি করেন তিনি।
দাঁতভাঙ্গা ইউনিয়নের শান্তির গ্রামের কৃষক আশরাফুল ইসলাম বলেন, তালিকায় নাম থাকার পরও তাঁদের ধান নিতে খাদ্যগুদামের কর্মকর্তা রাজি হননি। পরে কুড়িগ্রাম-৪ আসনের সংসদ সদস্য মোস্তাফিজুর রহমানের সুপারিশ নিয়ে গেলেও কাজ হয়নি। একপর্যায়ে বিষয়টি সুরাহার জন্য প্রতি মণ ধানের বিপরীতে ১০০ টাকা দেওয়ার প্রস্তাব করা হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি।
একই গ্রামের বাসিন্দা আছুর উদ্দিন ও আজিজুল হক অভিযোগ করেন, তাঁদের গ্রাম থেকে খাদ্যগুদামের দূরত্ব প্রায় ২২ কিলোমিটার। তাঁরা চার দিন গুদামে গিয়ে ধান দিতে পারেননি। পরে গত ১২ আগস্ট বিকেলে খাদ্যগুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা তাঁদের ডেকে ৫০ হাজার টাকার বিনিময়ে বিষয়টি মীমাংসা করেন বলে দাবি করেন তাঁরা।
তবে ওই দিন দুপুরে লিটন কুমার রায় এই প্রতিবেদককে বলেছিলেন, ‘ধান গ্রহণ করা শেষ হয়েছে।’ ফলে ধান সংগ্রহ শেষ হওয়ার কথা জানানোর পরও একই দিন বিকেলে কীভাবে ওই কৃষকদের ধান গ্রহণ করা হলো, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
কৃষকদের অভিযোগ, ধান সংগ্রহের সময় শেষ হয়ে গেলেও মানিক উল্লাহ, নছু শেখ, শিরিয়াসহ আরও অনেক কৃষকের ধান গ্রহণ করা হয়নি। তাঁদের পরিবর্তে সিন্ডিকেটের সদস্যদের বিল দেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
প্রতিবেদকের হাতে আসা ধান সংগ্রহের তালিকা পর্যালোচনা করে দেখা যায়, চরশৌলামারী ইউনিয়নের সোলায়মান নামের এক কৃষকের নামের বিপরীতে বন্দবেড় গ্রামের নান্নু মিয়ার মোবাইল ফোন নম্বর ব্যবহার করা হয়েছে। নান্নু মিয়া বলেন, তিনি ধান দেওয়ার জন্য আবেদনই করেননি। তাঁর মোবাইল নম্বর কে বা কারা ব্যবহার করেছে, সে বিষয়ে তিনি কিছু জানেন না।
একইভাবে আব্দুল হামিদ, সোহেল রানা, জাহিদুল ইসলাম, খুকুমণি, আইয়ূব, জয়নাব বেগম, সাদাকাত, জুলফিকার, আলী হোসেন, নূর ছলিমা, শিরিয়া ও আছর উদ্দিনসহ আরও কয়েকজনের নাম ঠিক থাকলেও তালিকায় ব্যবহৃত মোবাইল নম্বর ভিন্ন ব্যক্তির বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। প্রতিবেদকের পক্ষ থেকে কয়েকটি নম্বরে যোগাযোগ করা হলেও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা তাঁদের পরিচয় দিতে রাজি হননি।
দাঁতভাঙ্গা ইউনিয়নের খেতারচর গ্রামের কৃষক মনিরুজ্জামান মনির আরও অভিযোগ করেন, রৌমারী খাদ্যগুদামে ধান ঢোকানোর জন্য তাঁর কাছ থেকে প্রতি মণে ৫০ টাকা করে নেওয়া হয়েছে।
অভিযোগের বিষয়ে রৌমারী খাদ্যগুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা লিটন কুমার রায়ের সঙ্গে কথা হলে প্রথমে তিনি জানান, তাঁর গুদামে ধান সংগ্রহ শেষ হয়েছে। তালিকায় নাম থাকা সত্ত্বেও অনেক কৃষক কেন ধান দিতে পারেননি—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘তাঁদের সঙ্গে আমার কথা হয়েছে, তাঁদের ধান নেব।’
কৃষক তালিকায় ভিন্ন ব্যক্তির নাম ও মোবাইল নম্বর ব্যবহারের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি কোনো উত্তর দেননি। এ সময় তিনি প্রতিবেদককে বারবার বলেন, ‘কী তথ্য লাগে বলেন।’
ধান সংগ্রহে অনিয়ম, উৎকোচ গ্রহণ, একজন কৃষকের বিল অন্যজনকে দেওয়াসহ কৃষক তালিকার বিভিন্ন অসংগতির অভিযোগের বিষয়ে কুড়িগ্রাম জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক (ভারপ্রাপ্ত) মোহাম্মদ কাজী হামিদুল হকের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘ঠিক আছে, বিষয়টি বুঝতে পেরেছি।’ এরপর তিনি ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।
অভিযোগের বিষয়ে কুড়িগ্রাম জেলা প্রশাসকের সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘রৌমারীর টিএনও আমার সামনেই আছেন। হোয়াটসঅ্যাপে টেক্সট করেন, বিষয়টি আমি দেখছি।’
রৌমারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাহবুবুল হাসান বলেন, ‘বিষয়টি আমি জেনেছি। যাচাই-বাছাই করে বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে।’

প্রথম দর্পণ অনলাইন,ডেক্স