২০ বছর পরও কাটেনি বিতর্ক, প্লুটো কি আবার গ্রহের মর্যাদা পাবে?

Banner Ad
https://prothomdorpan.com/admin/fav-icon-logo/image/1761146741.250..125.jpg
দুই দশক আগে সৌরজগতের গ্রহের তালিকা থেকে বাদ পড়ে বামন গ্রহের মর্যাদা পেয়েছিল প্লুটো। ২০০৬ সালের আগস্টে আন্তর্জাতিক জ্যোতির্বিজ্ঞান সংঘের (আইএইউ) সদস্যদের ভোটে নেওয়া সেই সিদ্ধান্তের ২০ বছর পূর্তিতে আবারও প্রশ্ন উঠেছে—প্লুটোকে কি নতুন করে গ্রহের মর্যাদা দেওয়া উচিত?

জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের একটি অংশ মনে করেন, ২০০৬ সালের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার সময় এসেছে। অন্যদিকে আইএইউর নির্ধারিত সংজ্ঞা অনুযায়ী প্লুটো এখনো গ্রহের মর্যাদা পাওয়ার শর্ত পূরণ করে না। ফলে দুই দশক পরও প্লুটোর শ্রেণিবিন্যাস নিয়ে বিতর্ক পুরোপুরি শেষ হয়নি।

কীভাবে শুরু হয়েছিল বিতর্ক?

প্লুটোর গ্রহত্ব নিয়ে প্রশ্ন ওঠা শুরু হয় ১৯৯০-এর দশকে। সে সময় নেপচুনের বাইরে কুইপার বেল্ট অঞ্চলে প্লুটোর মতো কক্ষপথে থাকা আরও বেশ কিছু দূরবর্তী মহাজাগতিক বস্তুর সন্ধান পাওয়া যায়।

বিতর্ক আরও তীব্র হয় ২০০৫ সালের জুলাইয়ে এরিস নামের একটি বস্তু আবিষ্কারের পর। সূর্য থেকে এরিসের দূরত্ব প্লুটোর চেয়েও বেশি এবং আকারও প্লুটোর কাছাকাছি। তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে, এরিস যদি গ্রহ হয়, তাহলে প্লুটোর অবস্থান কী হবে? আর এরিসকে গ্রহ হিসেবে স্বীকৃতি না দিলে প্লুটোকে গ্রহ হিসেবে রাখার বৈজ্ঞানিক ভিত্তিই বা কী?

এর আগে ২০০০ সালে জ্যোতির্বিজ্ঞানী নিল ডিগ্রাস টাইসন নিউইয়র্কের হেইডেন প্ল্যানেটেরিয়ামের গ্রহ প্রদর্শনী থেকেও প্লুটোকে সরিয়ে দিয়েছিলেন। শেষ পর্যন্ত ২০০৬ সালের আগস্টে আইএইউর বৈঠকে বিষয়টি নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা ও একাধিক প্রস্তাব-পাল্টাপ্রস্তাবের পর প্লুটোকে বামন গ্রহ হিসেবে পুনঃশ্রেণিবিন্যাস করা হয়। সে সময় সৌরজগতের স্বীকৃত গ্রহের সংখ্যা নয়টি থেকে কমে দাঁড়ায় আটটিতে।

কেন বাদ পড়ল প্লুটো?

আইএইউ ২০০৬ সালে গ্রহের সংজ্ঞা নির্ধারণ করতে তিনটি প্রধান শর্ত দেয়। প্রথমত, মহাজাগতিক বস্তুটির নিজস্ব মহাকর্ষের প্রভাবে সেটি প্রায় গোলাকার হতে হবে। দ্বিতীয়ত, সেটিকে সূর্যকে প্রদক্ষিণ করতে হবে। তৃতীয়ত, নিজের কক্ষপথের আশপাশের অঞ্চল থেকে অন্য মহাজাগতিক বস্তুগুলোকে সরিয়ে দিয়ে সেখানে মহাকর্ষীয়ভাবে প্রভাবশালী হতে হবে।

প্রথম দুটি শর্ত প্লুটো পূরণ করলেও তৃতীয় শর্তটি পূরণ করতে পারে না। প্লুটোর কক্ষপথ কুইপার বেল্টের অঞ্চলের সঙ্গে সম্পর্কিত এবং তার আশপাশে একই ধরনের আরও বহু মহাজাগতিক বস্তু রয়েছে। ফলে নিজের কক্ষপথের আশপাশ ‘পরিষ্কার’ করার মতো পর্যাপ্ত মহাকর্ষীয় প্রভাব প্লুটোর নেই।

এই কারণেই আইএইউর সংজ্ঞা অনুযায়ী প্লুটোকে পূর্ণাঙ্গ গ্রহের পরিবর্তে বামন গ্রহ হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়েছে।

বিজ্ঞানীদের একাংশের আপত্তি

আইএইউর সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করা বিজ্ঞানীদের মধ্যে অন্যতম অ্যালান স্টার্ন। তিনি প্লুটোকে অনুসন্ধানকারী নাসার নিউ হরাইজনস মিশনের প্রধান তদন্তকারী। ২০০৫ সালে যাত্রা শুরু করা নিউ হরাইজনস ২০১৫ সালে প্লুটোর কাছাকাছি পৌঁছে সেখানকার অভূতপূর্ব ছবি ও বৈজ্ঞানিক তথ্য পৃথিবীতে পাঠায়।

সেই পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, প্লুটো কোনো সাধারণ ছোট মহাজাগতিক বস্তু নয়। এর রয়েছে জটিল ভূ-প্রকৃতি, বায়ুমণ্ডল এবং সক্রিয় নাইট্রোজেনের হিমবাহসহ নানা বৈশিষ্ট্য। বিশেষ করে এর পৃষ্ঠের বিশাল হৃদয়াকৃতির অঞ্চল বিজ্ঞানীদের ব্যাপক আগ্রহ তৈরি করেছে।

এ কারণে বিজ্ঞানীদের একটি অংশ মনে করেন, শুধু কক্ষপথের আশপাশ ‘পরিষ্কার’ করার সক্ষমতার ভিত্তিতে প্লুটোকে গ্রহের তালিকা থেকে বাদ দেওয়া তার প্রকৃত বৈশিষ্ট্যকে যথাযথভাবে তুলে ধরে না।

প্লুটোকে গ্রহ হিসেবে ফেরানোর পক্ষে যুক্তি

ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটি ইন সেন্ট লুইসের গ্রহবিষয়ক জ্যোতির্বিজ্ঞানী পল বাইর্ন মনে করেন, প্লুটোকে আবার গ্রহ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া উচিত। তার মতে, শুধু প্লুটো নয়—সেরেস, এরিস, মাকেমাকে ও হাওমিয়াকেও গ্রহ হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে। সেডনা ও কোয়ারের মতো আরও কিছু দূরবর্তী বস্তুকেও তিনি কার্যত বামন গ্রহ হিসেবে দেখেন।

বাইর্নের যুক্তি হলো, এসব মহাজাগতিক বস্তু নিজেদের মহাকর্ষে গোলাকার হওয়ার মতো যথেষ্ট বড় এবং তাদের অভ্যন্তরে নানা ধরনের রাসায়নিক ও ভূতাত্ত্বিক প্রক্রিয়া ঘটতে পারে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে বায়ুমণ্ডল সৃষ্টি, গ্যাস নির্গমন, আগ্নেয়গিরির কার্যক্রম, পৃষ্ঠের পরিবর্তন কিংবা সাময়িক চৌম্বকক্ষেত্র তৈরির মতো ঘটনাও ঘটতে পারে।

এই দৃষ্টিকোণ থেকে তিনি চাঁদকেও গ্রহ হিসেবে বিবেচনা করেন। কারণ চাঁদেও গ্রহসদৃশ বিভিন্ন ভূতাত্ত্বিক প্রক্রিয়ার প্রমাণ রয়েছে।

তবে বাইর্ন নিজেই স্বীকার করেন, পুরো বিষয়টি অনেকাংশে সংজ্ঞা ও শ্রেণিবিন্যাসের ওপর নির্ভরশীল। প্রকৃতি কোনো মহাজাগতিক বস্তুকে মানুষ যে নামে ডাকছে, সেটি নিয়ে মাথা ঘামায় না।

গ্রহের সংজ্ঞাতেই কি সমস্যা?

আইএইউর সংজ্ঞার সবচেয়ে বিতর্কিত অংশ হলো ‘কক্ষপথ পরিষ্কার’ করার শর্ত। সমালোচকদের প্রশ্ন, কোনো গ্রহের কক্ষপথের আশপাশে অন্য মহাজাগতিক বস্তু থাকলেই কি তাকে গ্রহ বলা যাবে না?

প্লুটোর ক্ষেত্রে এই শর্তটি বড় বাধা হলেও একই যুক্তি কীভাবে পৃথিবী বা অন্য গ্রহের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা হবে, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। পৃথিবীর কাছাকাছি বহু গ্রহাণু রয়েছে। আবার নেপচুনের কক্ষপথও নানা ছোট মহাজাগতিক বস্তুর সঙ্গে সম্পর্কিত। ফলে ‘কক্ষপথ পরিষ্কার’ বলতে ঠিক কী বোঝানো হবে, তা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে।

এ ছাড়া আইএইউর সংজ্ঞা সৌরজগতের বাইরের কিছু সম্ভাব্য পরিস্থিতির ক্ষেত্রেও প্রশ্ন তৈরি করে। অন্য নক্ষত্রকে প্রদক্ষিণ করা বহির্গ্রহগুলোকে আমরা গ্রহ হিসেবে বিবেচনা করি। কিন্তু কোনো নক্ষত্রকে প্রদক্ষিণ না করে মহাকাশে মুক্তভাবে ঘুরে বেড়ানো ‘রোগ প্ল্যানেট’ বা ভাসমান গ্রহের অবস্থান এই সংজ্ঞায় স্পষ্ট নয়।

তাহলে কি সৌরজগতে ২০০ গ্রহ হতে পারে?

প্লুটোকে গ্রহ হিসেবে পুনর্বহালের বিরোধীদের অন্যতম যুক্তি হলো, প্লুটোর মতো আরও বহু মহাজাগতিক বস্তুকে গ্রহের মর্যাদা দিতে হলে সৌরজগতের গ্রহের সংখ্যা অনেক বেড়ে যেতে পারে। এতে ‘গ্রহ’ শব্দটির প্রচলিত ধারণাই বদলে যেতে পারে।

অন্যদিকে সমর্থকদের বক্তব্য, কোনো মহাজাগতিক বস্তুকে শুধু সংখ্যা কম রাখার সুবিধার জন্য আলাদা শ্রেণিতে রাখা বৈজ্ঞানিকভাবে যথার্থ নাও হতে পারে।

ভবিষ্যতে নেপচুনের বাইরের অঞ্চলে যদি প্লুটোর চেয়ে অনেক বড়—এমনকি মঙ্গল বা পৃথিবীর কাছাকাছি আকারের কোনো মহাজাগতিক বস্তু আবিষ্কৃত হয়, তাহলে বিতর্ক আরও জটিল হতে পারে। সেটি যদি নিজের কক্ষপথের আশপাশ পরিষ্কার করতে না পারে, আইএইউর বর্তমান সংজ্ঞা অনুযায়ী সেটিকেও গ্রহ বলা কঠিন হবে।

সামনে কী হতে পারে?

প্লুটোকে আবার গ্রহের মর্যাদা দিতে হলে শুধু আবেগ, ঐতিহাসিক স্মৃতি কিংবা এটি যুক্তরাষ্ট্রের জ্যোতির্বিজ্ঞানী ক্লাইড টমবাউ ১৯৩০ সালে আবিষ্কার করেছিলেন—এ ধরনের কারণ যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন হবে বৈজ্ঞানিকভাবে গ্রহণযোগ্য ও সবার জন্য সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি শ্রেণিবিন্যাস পদ্ধতি।

সম্ভাব্য একটি পদ্ধতি হতে পারে ‘বামন গ্রহ’ শব্দটির পরিবর্তে এমন একটি শ্রেণি তৈরি করা, যা মহাজাগতিক বস্তুগুলোর প্রকৃত বৈশিষ্ট্যকে আরও ভালোভাবে তুলে ধরে। তবে এর জন্য নতুন করে বৈজ্ঞানিক ঐকমত্য প্রয়োজন হবে।

শেষ পর্যন্ত প্লুটোকে গ্রহ বলা হবে, নাকি বামন গ্রহ—সেটি হয়তো মানুষের তৈরি একটি সংজ্ঞার ওপরই নির্ভর করবে। কিন্তু শ্রেণিবিন্যাস যাই হোক, নিউ হরাইজনসের পর্যবেক্ষণে স্পষ্ট হয়েছে, প্লুটো সৌরজগতের এক অনন্য ও জটিল জগৎ।

আর মানুষ তাকে যে নামেই ডাকুক না কেন—প্লুটো, তার বৈশিষ্ট্য ও বৈজ্ঞানিক গুরুত্ব নিয়ে আগ্রহ সম্ভবত কখনোই কমবে না।

সূত্র: স্পেস




কমেন্ট করুন:

ফেসবুকে আমরা
সর্বশেষ সংবাদ
Sidebar Ad