সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে জানা গেছে, এসব সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি বিমান পরিবহন পরিকল্পনা, বাণিজ্যিক স্বার্থ এবং ঢাকাকে আঞ্চলিক এভিয়েশন হাবে পরিণত করার উদ্যোগ নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে। বিশেষ করে ভবিষ্যতে নতুন বিমানবন্দর নির্মাণের সুযোগ সীমিত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
১০০ কিলোমিটারে ১৫ বছর প্রতিযোগী বিমানবন্দর নয়
চুক্তির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শর্ত অনুযায়ী, শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ১০০ কিলোমিটারের মধ্যে আগামী ১৫ বছর কোনো প্রতিযোগী বেসামরিক বিমানবন্দরের বাণিজ্যিক কার্যক্রম চালু করা যাবে না। বিশ্লেষকদের মতে, এ শর্তের প্রভাব থার্ড টার্মিনালের সীমানা ছাড়িয়ে দেশের ভবিষ্যৎ বিমান পরিবহন অবকাঠামো পরিকল্পনার ওপরও পড়তে পারে।
বর্তমানে শাহজালাল বিমানবন্দরে একটি রানওয়ে রয়েছে। চারপাশে অপরিকল্পিত নগরায়ণের কারণে নতুন স্বতন্ত্র রানওয়ে নির্মাণের সুযোগও সীমিত। থার্ড টার্মিনাল চালু হলে যাত্রীসেবা ও টার্মিনাল ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা বাড়বে। তবে শুধু টার্মিনাল সম্প্রসারণে রানওয়ের সক্ষমতাসংক্রান্ত সীমাবদ্ধতা দূর হবে না।
এ বিষয়ে উইং কমান্ডার (অব.) নজরুল ইসলাম বলেন, এটি একটি বাণিজ্যিক চুক্তি। দেশের উন্নয়ন পরিকল্পনা বা ভবিষ্যতে আরেকটি বিমানবন্দর নির্মাণের সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের নিজস্ব বিষয়।
রাজস্বের ভাগ নিয়ে আপত্তি
কনসেশন চুক্তি অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট রাজস্বের ২৭ শতাংশ পাওয়ার কথা বাংলাদেশের। তবে পরিচালনার প্রস্তুতি ও আংশিক কার্যক্রমের মধ্যবর্তী সময়ে এ হার কার্যকর হবে না। জাপানি কনসোর্টিয়ামের প্রস্তাব অনুযায়ী, প্রথম আট মাসে বাংলাদেশকে ১৩ দশমিক ৫ শতাংশ রাজস্ব দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। এই হার চূড়ান্তভাবে অনুমোদিত হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
সাময়িকভাবে রাজস্বের হার কম থাকলে যাত্রী চলাচল ও বাণিজ্যিক আয়ের পরিমাণের ওপর নির্ভর করে সরকার উল্লেখযোগ্য রাজস্ব হারাতে পারে বলে সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা।
নজরুল ইসলাম বলেন, আলোচনায় আরও কয়েকটি কোম্পানি থাকলে বাংলাদেশের দর-কষাকষির অবস্থান শক্তিশালী হতে পারত। তবে বর্তমান অবস্থান থেকেও ভালোভাবে আলোচনা চালানো সম্ভব।
গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ের দায় বিমানের
চুক্তির আরেকটি বিরোধপূর্ণ বিষয় বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং কার্যক্রম। জাপানি কনসোর্টিয়ামের শর্ত অনুযায়ী, গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ের সার্বিক দায়িত্ব ও ঝুঁকি বিমানকে বহন করতে হবে। অর্থাৎ বিমানবন্দর পরিচালনার দায়িত্ব বিদেশি অংশীদারদের হাতে থাকলেও গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং কার্যক্রমের দায় থাকবে রাষ্ট্রীয় বিমান সংস্থার ওপর। এ ক্ষেত্রে বিমান কীভাবে আয়ের অংশ পাবে, তার নিশ্চয়তার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ।
এ ছাড়া বাংলাদেশের আইন পরিবর্তিত হলে তার প্রভাব চুক্তিতে কীভাবে পড়বে এবং নির্মাণত্রুটি শনাক্ত ও সংশোধনের দায় কত দিন থাকবে—এসব বিষয়েও দুই পক্ষের মধ্যে মতপার্থক্য ছিল।
আইনি সুরক্ষা ও ত্রুটি সংশোধনের সময়সীমা
জাপানি পক্ষ চুক্তির ক্ষেত্রে বিশেষ আইনি সুবিধা ও সুরক্ষা চেয়েছে। অন্যদিকে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল, সরকার সাধারণভাবে কোনো আইন প্রণয়ন বা পরিবর্তন করলে তা সংশ্লিষ্ট বিদেশি প্রতিষ্ঠানসহ সবার ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য হবে। দেশের সাধারণ আইনি কাঠামোর বাইরে কোনো প্রতিষ্ঠানকে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার বিষয়ে সরকার একমত নয় বলে জানানো হয়েছে।
থার্ড টার্মিনালের নির্মাণত্রুটি শনাক্ত ও সংশোধনের সময়সীমা বা ডিফেক্ট লায়াবিলিটি পিরিয়ড (ডিএলপি) নিয়েও মতপার্থক্য রয়েছে। বাংলাদেশ এ সময়সীমা নয় মাস রাখার পক্ষে। তবে জাপানি পক্ষ তা বাড়িয়ে ১২ মাস করার দাবি জানিয়েছে।
চুক্তি স্বাক্ষরের প্রক্রিয়া
বেবিচক সূত্র জানায়, আলোচনা শেষে সংশোধিত কনসেশন চুক্তির প্রতিটি ধারা পর্যালোচনার জন্য জাপানি কনসোর্টিয়ামের কাছে পাঠানো হয়েছে। এরপর চুক্তিটি আইন মন্ত্রণালয়, অর্থ মন্ত্রণালয় এবং অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করতে হবে।
আগামী ১৫ নভেম্বরের নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে চুক্তি স্বাক্ষর কঠিন হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন। তবে নভেম্বরের মধ্যেই চুক্তি সম্পন্ন হওয়ার বিষয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন তিনি।
একক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনায় দর-কষাকষির প্রশ্ন
থার্ড টার্মিনাল পরিচালনার জন্য জাপানি কনসোর্টিয়ামের সঙ্গে এককভাবে আলোচনা চালানোর সিদ্ধান্ত নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। বেবিচকের সাবেক চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল (অব.) এম মফিদুর রহমান এর আগে সতর্ক করেছিলেন, বিকল্প কোনো বিশ্বাসযোগ্য পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান আলোচনায় না থাকায় বাংলাদেশের দর-কষাকষির অবস্থান দুর্বল হতে পারে।
তার মতে, একমাত্র সম্ভাব্য পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরশীলতা কনসোর্টিয়ামকে নিজেদের অনুকূলে সুবিধাজনক শর্ত আদায়ের সুযোগ দিয়েছে। বেবিচকের প্রাথমিক আপত্তি সত্ত্বেও বিতর্কিত শর্তগুলো অনুমোদনের ঘটনায় সেই উদ্বেগ নতুন করে সামনে এসেছে।
তথ্যসূত্র: বেবিচক-সংশ্লিষ্ট সূত্র, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য এবং ৩ নভেম্বর ২০২৬ প্রকাশিত মূল প্রতিবেদন।

প্রথম দর্পণ,জাতীয় ডেস্ক