মোরছালিনের বাড়ি জয়পুরহাট সদর উপজেলায়। বদলগাছী উপজেলার পাঁচঘড়িয়া গ্রামে শ্বশুরবাড়ির সূত্রে চাচাশ্বশুরের কাছ থেকে ১৪ শতাংশ জমি লিজ নিয়ে তিনি এই চাষ শুরু করেন। ইউটিউব ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্যাশন ফ্রুটের চাষপদ্ধতি এবং বাণিজ্যিক সম্ভাবনা সম্পর্কে জেনে উদ্যোগী হন তিনি।
সম্প্রতি তাঁর বাগানে গিয়ে দেখা যায়, মাচার ওপর লতানো গাছে থোকায় থোকায় ঝুলছে প্যাশন ফ্রুট। কোনোটি সবুজ, আবার কোনোটি পরিপক্ব হয়ে বেগুনি বা হলুদ রং ধারণ করেছে। ফলের ভেতরে রয়েছে রসালো শাঁস ও অসংখ্য বীজ। টক-মিষ্টি স্বাদ এবং বিশেষ সুগন্ধের কারণে ফলটি মানুষের কাছে আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে। দেশের বিভিন্ন এলাকায় এটি ‘আনারকলি’ বা ‘ট্যাং’ নামেও পরিচিত।
মোরছালিন জানান, পরীক্ষামূলকভাবে চাষ শুরুর জন্য কক্সবাজার থেকে প্যাশন ফ্রুটের চারা সংগ্রহ করেন তিনি। ১৪ শতাংশ জমিতে ৬২টি চারা রোপণ করেন। মাচা তৈরি, চারা সংগ্রহ ও জৈব সারসহ প্রাথমিক পর্যায়ে তাঁর ব্যয় হয়েছে প্রায় ৫০ হাজার টাকা। চারা রোপণের তিন মাসের মধ্যেই গাছে ফুল ও ফল আসতে শুরু করে। বর্তমানে নিয়মিত ফল সংগ্রহ করছেন তিনি।
দক্ষিণ আমেরিকার ফল, দেশেও বাড়ছে সম্ভাবনাপ্যাশন ফ্রুট দক্ষিণ আমেরিকার ব্রাজিল, প্যারাগুয়ে ও উত্তর আর্জেন্টিনার পার্বত্য অঞ্চলের ফল। পরবর্তী সময়ে আফ্রিকা ও ভারত মহাসাগরীয় দ্বীপপুঞ্জে এর পরিচিতি ছড়িয়ে পড়ে। বর্তমানে থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, মালয়েশিয়া ও ভারতেও বাণিজ্যিকভাবে ফলটির উৎপাদন হচ্ছে।
বাংলাদেশে পাহাড়ি অঞ্চলের মাধ্যমে ফলটির পরিচিতি বাড়ে। বর্তমানে বান্দরবান, খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি, সিলেট ও পঞ্চগড়সহ বিভিন্ন এলাকায় সীমিত পরিসরে এর চাষ হচ্ছে।
প্যাশন ফ্রুটের প্রধানত দুটি জাত রয়েছে—বেগুনি ও হলুদ। বেগুনি জাতের ফল আকারে তুলনামূলক ছোট এবং স্বাদে মিষ্টি। অন্যদিকে হলুদ জাতের ফল আকারে বড় এবং রসের পরিমাণ বেশি। উষ্ণ ও আর্দ্র আবহাওয়ায় হলুদ জাত ভালো জন্মে।
বাংলাদেশে বারি প্যাশন ফল-১ নামে একটি জাতের চাষ হচ্ছে। এটি হলুদ জাতের ফল। ফলটির গড় ওজন প্রায় ৬৮ গ্রাম এবং প্রতিটি ফলে প্রায় ৩০ গ্রাম রস পাওয়া যায়। প্যাশন ফ্রুটে ভিটামিন সি, ভিটামিন এ ও খাদ্য আঁশসহ বিভিন্ন পুষ্টি উপাদান রয়েছে। সরাসরি খাওয়ার পাশাপাশি জুস ও বিভিন্ন খাদ্যপণ্য তৈরিতেও ফলটি ব্যবহার করা হয়।
বাজারে ভালো দাম, সম্প্রসারণের প্রত্যাশামোরছালিন বলেন, অপ্রচলিত ফল হওয়ায় স্থানীয় বাজারে প্যাশন ফ্রুটের প্রতি ক্রেতাদের আগ্রহ রয়েছে। স্থানীয় বড় ফলের দোকান ও সুপারশপে প্রতি কেজি ৪০০ থেকে ৪৫০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। কৃষকদের মধ্যে এই ফল চাষের আগ্রহ বাড়লে ভবিষ্যতে উৎপাদন সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি হবে।
তবে বাণিজ্যিকভাবে চাষ বাড়াতে উৎপাদন খরচ, বাজারের চাহিদা, ফল সংরক্ষণের ব্যবস্থা এবং নিয়মিত ক্রেতা নিশ্চিত করা জরুরি বলে মনে করেন তিনি।
মোরছালিন আরও বলেন, বদলগাছীতে প্যাশন ফ্রুট চাষ শুরু করলেও এখন পর্যন্ত কৃষি কর্মকর্তাদের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা পাননি। কৃষি বিভাগের কারিগরি পরামর্শ ও সরকারি সহায়তা পেলে এই ফলের চাষ আরও সম্প্রসারণ করা সম্ভব হবে।
এ বিষয়ে বদলগাছী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. মেহেদী হাসান বলেন, মোরছালিনকে এ চাষে উৎসাহিত করার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় কারিগরি সহায়তা দেওয়ার সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হবে। সরকারি কোনো সহায়তার সুযোগ এলে তাঁকে সহযোগিতা করা হবে।

প্রথম দর্পণ,জাতীয় ডেস্ক