দেশের সব কারাগারে নিরাপত্তা জোরদার, অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং দায়িত্ব পালনে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে সাত দফা নির্দেশনা বাস্তবায়ন করছে কারা অধিদপ্তর। নির্দেশনার আওতায় লকআপের পরবর্তী কার্যক্রমে কঠোর নিয়ন্ত্রণ, সার্বক্ষণিক সিসিটিভি নজরদারি, দায়িত্বে অননুমোদিত অনুপস্থিতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা এবং তত্ত্বাবধায়ক কর্মকর্তাদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
শুক্রবার (৬ নভেম্বর) বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়।
কারা অধিদপ্তরের নেওয়া সাত দফা পদক্ষেপের মধ্যে রয়েছে—লকআপের পরবর্তী কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ, ২৪ ঘণ্টা সিসিটিভি পর্যবেক্ষণ, দায়িত্বস্থল থেকে অনুমতি ছাড়া অনুপস্থিতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা, তত্ত্বাবধায়ক কর্মকর্তাদের জবাবদিহিতা, দায়িত্বে অবহেলাকারী কর্মীদের পুনঃপ্রশিক্ষণ, প্রতিকূল আবহাওয়ায় বিশেষ নিরাপত্তাব্যবস্থা এবং নিয়মিত তদারকির পাশাপাশি আকস্মিক পরিদর্শন।
কারাগারে দায়িত্ব পালনে অবহেলা, শৃঙ্খলাহীনতা ও প্রচলিত নিয়ম যথাযথভাবে অনুসরণ না করার কারণে নিরাপত্তাঝুঁকি তৈরি হতে পারে। এতে কারাগারের সার্বিক ব্যবস্থাপনাও ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এসব ঝুঁকি মোকাবিলা এবং কারা প্রশাসনে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যেই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
কারা অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক কর্নেল মেসবাহুল আলম সেলিম জানান, সাত দফা নির্দেশনার বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে অধিদপ্তর পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা জোরদার করেছে। এর অংশ হিসেবে দেশের প্রতিটি কারাগারে প্রতিদিন তদারকি করা হচ্ছে। পাশাপাশি সব কারাগারকে নিয়মিতভাবে কারা কর্তৃপক্ষের কাছে অগ্রগতি ও মতামত জমা দিতে বলা হয়েছে।
নির্দেশনাগুলো যথাযথভাবে অনুসরণ করা হচ্ছে কি না, তা পর্যবেক্ষণের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে অধিদপ্তরের অপারেশনাল শাখাকে। এ ছাড়া দেশের কারাগারগুলোতে নজরদারি বাড়াতে ডেপুটি জেলারসহ অতিরিক্ত জনবল নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
কর্নেল মেসবাহুল আলম সেলিম বলেন, নির্দেশনাগুলোর অন্তত ৯০ শতাংশ বাস্তবায়ন করা হয়েছে। আগামী তিন থেকে চার মাসের মধ্যে এসব পদক্ষেপের সুফল দৃশ্যমান হবে বলে আশা করছে অধিদপ্তর। দায়িত্ব পালনে অবহেলার দায়ে অভিযুক্ত কারা কর্মীদের এক কারাগার থেকে অন্য কারাগারে বদলির নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।
লকআপ ও সিসিটিভি নজরদারিতে কঠোরতা
নির্দেশনা অনুযায়ী, উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের অনুমোদিত জরুরি পরিস্থিতি ছাড়া লকআপের পরবর্তী কার্যক্রম কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। এ সময় কোনো ব্যতিক্রমী কার্যক্রম পরিচালনার প্রয়োজন হলে জেলারের লিখিত অনুমোদন নিতে হবে। পাশাপাশি কার্যক্রমের নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ এবং সংশ্লিষ্ট রেজিস্টারে তা বাধ্যতামূলকভাবে লিপিবদ্ধ করতে হবে।
প্রতিটি কারাগারে ২৪ ঘণ্টা সিসিটিভি নজরদারি নিশ্চিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সম্ভব হলে পৃথক পর্যবেক্ষণ কক্ষ স্থাপন করে সেখানে প্রশিক্ষিত ও তথ্যপ্রযুক্তিতে দক্ষ কারারক্ষী নিয়োগ করতে হবে। পৃথক পর্যবেক্ষণ কক্ষের ব্যবস্থা না থাকলে উপযুক্ত স্থানে মনিটর স্থাপনের মাধ্যমে সার্বক্ষণিক নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে।
দায়িত্বে অবহেলায় শূন্য সহনশীলতা
নিরাপত্তার ত্রুটি প্রতিরোধে দায়িত্বস্থল থেকে অনুমতি ছাড়া অনুপস্থিতির বিষয়ে শূন্য সহনশীলতার নীতি গ্রহণ করেছে কারা অধিদপ্তর। কোনো প্রহরী বা নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা কর্মীকে অনুমতি ছাড়া নির্ধারিত স্থান ত্যাগ করতে দেখা গেলে তাৎক্ষণিকভাবে লিখিত প্রতিবেদন দিতে হবে। এ ক্ষেত্রে প্রচলিত বিধি অনুযায়ী বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
শুধু দায়িত্বে অবহেলাকারী কর্মীই নন, এ ধরনের ঘটনা গোপন করা, প্রতিবেদন দিতে বিলম্ব করা কিংবা দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হলে সংশ্লিষ্ট তত্ত্বাবধায়ক কর্মকর্তাদেরও জবাবদিহির আওতায় আনা হবে।
একই সঙ্গে দায়িত্ব পালনে বারবার অবহেলার অভিযোগ পাওয়া কর্মীদের পুনঃপ্রশিক্ষণ, কাউন্সেলিং ও অনুপ্রেরণামূলক কার্যক্রমের আওতায় আনার বিধান রাখা হয়েছে। প্রয়োজন অনুযায়ী প্রশাসনিক স্বার্থে তাদের বদলি অথবা প্রচলিত বিধি অনুসারে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।
প্রতিকূল আবহাওয়ায় বিশেষ নিরাপত্তা
বৃষ্টি, বজ্রপাতসহ প্রতিকূল আবহাওয়ায় কারাগারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এ সময় প্রহরীদের নিজ নিজ দায়িত্বস্থলে অবস্থান করতে হবে এবং সর্বোচ্চ সতর্কতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করতে হবে।
এ ছাড়া কারাগারের সুপারিনটেনডেন্ট, জেলার ও অন্যান্য দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের নিয়মিত তদারকি এবং আকস্মিক পরিদর্শন করতে বলা হয়েছে। এসব পরিদর্শনে নিরাপত্তা চৌকি, সিসিটিভি পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা, প্রহরীদের দায়িত্ব পালন এবং সার্বিক নিরাপত্তাব্যবস্থার কার্যকারিতা যাচাই করতে হবে। কোনো ত্রুটি পাওয়া গেলে তাৎক্ষণিকভাবে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।
উল্লেখ্য, গত আগস্টে জারি করা সাত দফা নির্দেশনায় কারাগারের অভ্যন্তরে যেকোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা পুরো কারা প্রশাসনের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করতে পারে এবং জনমনে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে বলে সতর্ক করা হয়েছিল।
কারাগারের নিরাপত্তা ঘাটতি দূর করা, প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং প্রশাসনের প্রতিটি স্তরে জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের এসব নির্দেশনা দ্রুত বাস্তবায়নের নির্দেশ দিয়েছে কারা অধিদপ্তর।

প্রথম দর্পণ,ডেস্ক