সুদানে আরএসএফের পক্ষে লড়তে কলম্বীয় ভাড়াটে যোদ্ধা পাঠিয়েছে আমিরাত: জাতিসংঘের প্রতিবেদন

  • প্রথম দর্পণ,আন্তর্জাতিক ডেস্ক
  • আপলোড সময় : ০৮ নভেম্বর ২০২৬, ১২:৪১ দুপুর
  • ১০২৮৪ বার পড়া হয়েছে

Banner Ad
https://prothomdorpan.com/admin/fav-icon-logo/image/1761146741.250..125.jpg
লিবিয়া, সোমালিয়া ও চাদ হয়ে যোদ্ধাদের সুদানে নেওয়ার অভিযোগ; এল-ফাশের অবরোধ ও দখলে অংশগ্রহণের তথ্য

সুদানের আধাসামরিক বাহিনী র‍্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেসের (আরএসএফ) হয়ে লড়াই করতে কলম্বিয়ার ভাড়াটে যোদ্ধাদের সুদানে পাঠানোর ব্যবস্থা করেছে সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই)। জাতিসংঘের তদন্তকারীদের একটি গোপন প্রতিবেদনে এ বিষয়ে অকাট্য প্রমাণ পাওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আমিরাতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকা একটি নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে লিবিয়া, সোমালিয়া ও চাদ হয়ে এসব যোদ্ধাকে সুদানে নেওয়া হয়। দারফুর অঞ্চলে আরএসএফের সামরিক অভিযান, বিশেষ করে এল-ফাশের অবরোধ ও দখলে তারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

গত সপ্তাহে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে জমা দেওয়া প্রতিবেদনটি পেয়েছে মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট আই। প্রতিবেদনটি কঠোরভাবে গোপনীয় হিসেবে চিহ্নিত; এটি প্রকাশ করা হবে না।

আমিরাত-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে যোদ্ধা পাঠানোর অভিযোগ

জাতিসংঘের তদন্তকারীদের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আমিরাতভিত্তিক গ্লোবাল সিকিউরিটি সার্ভিসেস গ্রুপ (জিএসএসজি) কলম্বীয় ভাড়াটে যোদ্ধাদের সুদানে পাঠানোর ব্যবস্থা করে। প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে আমিরাত সরকারের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

যোদ্ধাদের যাতায়াত ও প্রশিক্ষণের জন্য সোমালিয়ার আধা স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল পুন্টল্যান্ডের বোসাসোতে অবস্থিত পুন্টল্যান্ড মেরিটাইম পুলিশ ফোর্সের (পিএমপিএফ) ঘাঁটি ব্যবহার করা হয়েছে। বাহিনীটির সঙ্গেও আমিরাতের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। জাতিসংঘের তদন্তকারীদের তথ্য অনুযায়ী, আমিরাতের সামরিক বাহিনী পিএমপিএফকে অর্থায়ন, প্রশিক্ষণ ও তদারকি করেছে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, কলম্বীয় যোদ্ধাদের আমিরাতের আবুধাবি, গায়াথি ও আল-ওয়াথবায় প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। পাশাপাশি বোসাসোর পিএমপিএফ ঘাঁটিতেও তাদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা ছিল।

এল-ফাশের দখলে সামরিক ও প্রযুক্তিগত সহায়তা

জাতিসংঘের তদন্তকারীদের তথ্য অনুযায়ী, কলম্বীয় ভাড়াটে যোদ্ধারা দারফুরে আরএসএফের সামরিক অভিযানে অংশ নেন। তাঁরা ড্রোন পরিচালনা, কামান ব্যবহারে সহায়তা এবং পদাতিক বাহিনীর সঙ্গে সমন্বিত অভিযান পরিচালনার মতো সামরিক ও প্রযুক্তিগত সহায়তা দিয়েছেন।

গত বছরের অক্টোবরে ৫০০ দিনের বেশি সময় অবরোধের পর উত্তর দারফুরের রাজধানী এল-ফাশের দখল করে আরএসএফ। ওই অভিযানের সময় বাহিনীটির সদস্যদের বিরুদ্ধে হাজার হাজার বেসামরিক মানুষকে ধর্ষণ, হত্যা ও চাঁদাবাজির শিকার করার অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগী ও প্রত্যক্ষদর্শীরা। তাঁদের ভাষ্য অনুযায়ী, আটক ব্যক্তিদের কাছ থেকে রক্ত সংগ্রহের জন্য আরএসএফ যোদ্ধারা অস্থায়ী চিকিৎসাকেন্দ্রও স্থাপন করেছিলেন।

অস্ত্র সরবরাহের পথেও আমিরাত-সংশ্লিষ্ট নেটওয়ার্কের অভিযোগ

কলম্বীয় যোদ্ধাদের পাশাপাশি লিবিয়ায় খলিফা হাফতারের পরিবার ও তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন মিলিশিয়াদের নিয়ন্ত্রিত এলাকা ব্যবহার করে আরএসএফের কাছে অস্ত্র ও অন্যান্য সরঞ্জাম পাঠানোর অভিযোগও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

এ ছাড়া ইথিওপিয়া, চাদ এবং সোমালিয়ার দুটি বিচ্ছিন্নতাবাদী অঞ্চল পুন্টল্যান্ড ও সোমালিল্যান্ডের মধ্য দিয়েও এসব সরঞ্জাম পরিবহনের তথ্য দেওয়া হয়েছে। অঞ্চল দুটির সঙ্গে আমিরাতের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সোমালিল্যান্ডকে ইসরাইল স্বীকৃতি দিয়েছে।

অভিযোগ অস্বীকার আমিরাতের

আমিরাত এবং সরবরাহ নেটওয়ার্কের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অন্য পক্ষগুলো অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার করেছে। এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে মিডল ইস্ট আই আমিরাতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করলেও কোনো সাড়া পায়নি। তবে প্রতিবেদনের সঙ্গে যুক্ত এক চিঠিতে আমিরাত জানিয়েছে, সুদানের সংঘাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কোনো অনিয়মের অভিযোগ তারা প্রত্যাখ্যান করছে। ভাড়াটে যোদ্ধাদের বিষয়ে ওঠা অভিযোগকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে বলেও জানিয়েছে দেশটি।

সুদানে ২০২৩ সালের এপ্রিল থেকে সেনাবাহিনী ও আরএসএফের মধ্যে সংঘাত চলছে। দারফুরে গণহত্যার অভিযোগ রয়েছে আরএসএফের বিরুদ্ধে। জাতিসংঘ ও যুক্তরাষ্ট্রও দারফুরে গণহত্যা সংঘটনের জন্য বাহিনীটিকে দায়ী করেছে।

জাতিসংঘের মহাসচিব পদে আমিরাতের কূটনীতিকের প্রার্থিতা নিয়ে বিতর্ক

আমিরাতের বিরুদ্ধে সুদানের যুদ্ধে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ এমন সময়ে সামনে এসেছে, যখন দেশটির শীর্ষ কূটনীতিকদের একজন লানা নুসেইবেহ জাতিসংঘের পরবর্তী মহাসচিব হওয়ার প্রচার চালাচ্ছেন।

যুক্তরাজ্যে নিযুক্ত সুদানের রাষ্ট্রদূত বাবিকার আল-সিদ্দিক আল-আমিন বলেছেন, সুদানে আরএসএফকে আমিরাতের সমর্থনের বিষয়টি আড়াল করতে নুসেইবেহর প্রার্থিতা ব্যবহার করা উচিত নয়। তাঁর ভাষায়, ‘যাদের হাতে সুদানের মানুষের রক্ত লেগে আছে, তাদের আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর নেতৃত্ব দেওয়া উচিত নয়।’ নুসেইবেহ মহাসচিব নির্বাচিত হলে জাতিসংঘের বিশ্বাসযোগ্যতা বড় ধরনের ধাক্কা খাবে বলেও সতর্ক করেন তিনি।

নুসেইবেহ ২০১৩ সালে জাতিসংঘে আমিরাতের প্রথম নারী স্থায়ী প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব নেন। ২০২৪ সাল পর্যন্ত তিনি এ পদে ছিলেন। এ সময়ে তিনি জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সহসভাপতি, জাতিসংঘ নারী সংস্থার নির্বাহী বোর্ডের সভাপতি এবং দুইবার নিরাপত্তা পরিষদের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন।

আমিরাতের বিরুদ্ধে আরএসএফকে সমর্থনের অভিযোগ নুসেইবেহ অস্বীকার করে আসছেন। সাম্প্রতিক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, জাতিসংঘের মহাসচিব হলে সুদান বিষয়ে নিরপেক্ষ থাকতে পারবেন। তবে আরএসএফকে আমিরাতের সমর্থনের অভিযোগ সরাসরি মোকাবিলা করেননি। চলতি সপ্তাহে পলিটিকোকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, আরএসএফের সংঘটিত নৃশংসতার জন্য জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে এবং জাতিসংঘের তথ্য অনুসন্ধানকারী সংস্থাগুলোর কাজে তিনি সমর্থন দেবেন।

আগের প্রতিবেদনেও আমিরাতের বিরুদ্ধে অভিযোগ

এ বছরের আরেকটি প্রতিবেদনে জাতিসংঘের তদন্তকারীরা আমিরাতের বিরুদ্ধে আরএসএফকে ভাড়াটে যোদ্ধা সরবরাহের অভিযোগ তুলেছিলেন। ওই যোদ্ধারা এল-ফাশের আক্রমণেও অংশ নিয়েছিলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

জুলাইয়ে নিরাপত্তা পরিষদে তদন্তকারীরা তাঁদের প্রমাণ উপস্থাপনের পর আমিরাতের জাতিসংঘের রাষ্ট্রদূত প্রতিবেদনটির ‘গুরুতর ত্রুটিগুলো অবিলম্বে সংশোধনের’ দাবি জানান। আমিরাতের ঘনিষ্ঠ মিত্র ও নিরাপত্তা পরিষদের অস্থায়ী সদস্য বাহরাইন কয়েক মাস ধরে প্রতিবেদনটি আটকে রেখেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

গত সেপ্টেম্বরে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রতিষ্ঠান অ্যানথ্রোপিক উচ্চ মাত্রার নিশ্চয়তার সঙ্গে জানায়, সুদানে আমিরাতের ভূমিকার সমালোচক এবং জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞদের লক্ষ্য করে চালানো একটি প্রভাব বিস্তারকারী তৎপরতার পেছনে আমিরাত রয়েছে।

এদিকে কলম্বীয় যোদ্ধাদের সুদানে পাঠানোর অভিযোগে উঠে আসা জিএসএসজি প্রতিষ্ঠানটি নিয়েও নতুন তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। বৃহস্পতিবার নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, আমিরাতের প্রেসিডেন্সির একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা প্রতিষ্ঠানটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। প্রতিষ্ঠানটির নিজস্ব ওয়েবসাইটে নিজেদের আমিরাতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও প্রেসিডেন্সিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ‘পছন্দের নিরাপত্তা সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।




কমেন্ট করুন:

ফেসবুকে আমরা
সর্বশেষ সংবাদ
Sidebar Ad