মাত্র দুই হাজার টাকা চুরির ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাজধানীর মোহাম্মদপুরে সংঘটিত হয়েছিল আলোচিত জোড়া হত্যাকাণ্ড। সেই ঘটনায় গ্রেপ্তার হয়ে বর্তমানে গাজীপুরের কাশিমপুর মহিলা কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দি রয়েছেন গৃহকর্মী আয়েশা আক্তার (২০)। বিচারাধীন এই মামলায় কারাবন্দি জীবন কাটাতে গিয়ে তিনি এখন গভীর অনুশোচনায় ভুগছেন। স্বামী ও ছোট্ট সন্তানের মুখ মনে করে দিন কাটছে তার। নিজের ভুলের জন্য আজীবনের আফসোসই যেন তার একমাত্র সঙ্গী।
কারাগার সংশ্লিষ্ট একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়, আয়েশা প্রায়ই কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, “সেদিন যদি ওই ভুল না করতাম, তাহলে আজ স্বাভাবিক জীবন নিয়ে স্বামী-সন্তানকে নিয়ে থাকতে পারতাম।”
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র ও মামলার নথি অনুযায়ী, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সলিমগঞ্জ এলাকার বাসিন্দা আয়েশা আক্তার ২০২৫ সালের ১৭ ডিসেম্বর থেকে কারাগারে আছেন। এর আগে গত বছরের ৮ ডিসেম্বর মোহাম্মদপুরের শাহজাহান রোডের একটি বাসায় গৃহকর্ত্রী লায়লা আফরোজ (৪৮) এবং তার স্কুলপড়ুয়া মেয়ে নাফিসা লাওয়াল বিনতে আজিজ (১৫) হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।
জানা যায়, অল্প বয়সে গার্মেন্টসে চাকরি করার সময় রাব্বি নামে এক যুবকের সঙ্গে পরিচয় হয় আয়েশার। পরে তারা বিয়ে করে সাভারের হেমায়েতপুরে বসবাস শুরু করেন। তাদের সংসারে একটি কন্যাসন্তানের জন্ম হয়। সন্তান কিছুটা বড় হওয়ার পর সংসারের আর্থিক সংকট মোকাবিলায় আয়েশা আবার কাজ খুঁজতে শুরু করেন এবং মোহাম্মদপুরের ওই বাসায় খণ্ডকালীন গৃহকর্মীর চাকরি নেন। পরিবারের সদস্যদের কাছে তিনি হাসপাতালের আয়া হিসেবে কাজ করার কথা বলতেন।
তদন্তে উঠে এসেছে, ঘটনার কয়েকদিন আগে মোহাম্মদপুরের বিহারী ক্যাম্প এলাকায় একটি বৈদ্যুতিক সুইচ গিয়ার কুড়িয়ে নিজের ব্যাগে রেখে দেন তিনি। ঘটনার দিন সেটিই হত্যার অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
আয়েশার স্বীকারোক্তি অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ৮ ডিসেম্বর তিনি গৃহকর্ত্রীর ব্যাগ থেকে দুই হাজার টাকা চুরি করেন। বিষয়টি ধরা পড়ে গেলে গৃহকর্ত্রী তাকে ভর্ৎসনা করেন, চড় মারেন এবং পুলিশে দেওয়ার হুমকি দেন। একপর্যায়ে ধস্তাধস্তির সময় গৃহকর্ত্রীর হাতে থাকা ফল কাটার ছুরির মুখোমুখি হয়ে তিনি ব্যাগ থেকে সুইচ গিয়ার বের করে আঘাত করেন।
গৃহকর্ত্রীর চিৎকার শুনে তার মেয়ে নাফিসা ঘটনাস্থলে এলে তাকেও একইভাবে আঘাত করা হয়। পরে রক্তমাখা পোশাক বদলে নিহত নাফিসার স্কুলড্রেস পরে বাসা থেকে বেরিয়ে যান আয়েশা।
হেমায়েতপুরে ফিরে গেলে তার স্বামী হাতে কাটা দাগ দেখে চিকিৎসার ব্যবস্থা করেন। পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া ঘটনার ছবি দেখে স্ত্রীকে জিজ্ঞাসাবাদ করলে আয়েশা হত্যার বিষয়টি স্বীকার করেন। এরপর তারা ঝালকাঠিতে চলে যান। সেখান থেকে পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে।
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তার আবেদনের পর ঢাকার অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে আয়েশা স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। জবানবন্দি রেকর্ড শেষে আদালত তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
মামলার এজাহার অনুযায়ী, ঘটনার দিন সকালে নিহত লায়লা আফরোজের স্বামী, শিক্ষক আজিজুল ইসলাম কর্মস্থলে চলে যান। পরে স্ত্রীর সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও ব্যর্থ হলে বাসায় ফিরে এসে স্ত্রীকে মৃত এবং গুরুতর আহত অবস্থায় মেয়েকে পড়ে থাকতে দেখেন। দ্রুত তাকে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
পুলিশের সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণে দেখা যায়, সকাল ৭টা ৫১ মিনিটে বোরকা পরে বাসায় প্রবেশ করেন আয়েশা। পরে সকাল ৯টা ৩৬ মিনিটে নিহত নাফিসার স্কুলড্রেস পরে নির্বিঘ্নে বাসা থেকে বেরিয়ে যান।
বর্তমানে মামলাটি বিচারাধীন। তদন্তে সংগৃহীত আলামত, সিসিটিভি ফুটেজ এবং আদালতে দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি মামলার গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
কারাগারের নিঃসঙ্গ প্রকোষ্ঠে বসে আয়েশা এখন শুধু একটি কথাই বারবার উচ্চারণ করেন—এক মুহূর্তের লোভ ও ভুল সিদ্ধান্ত তার নিজের জীবন যেমন ধ্বংস করেছে, তেমনি দুটি নিরীহ প্রাণও অকালে ঝরে গেছে।

প্রথম দর্পণ,ডেস্ক