পিরোজপুরের নেছারাবাদ (স্বরূপকাঠী) উপজেলাকে ঘিরে বিকশিত হয়েছে দেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় জাহাজ নির্মাণ শিল্প। সন্ধ্যা নদী ও এর শাখা-প্রশাখার তীরজুড়ে গড়ে ওঠা ২১টি ডকইয়ার্ডে নির্মিত হচ্ছে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক মানের বিভিন্ন ধরনের স্টিলবডি জাহাজ। শিল্পটির বিকাশে সরাসরি ও পরোক্ষভাবে কর্মসংস্থান হয়েছে প্রায় ২৫ হাজার মানুষের।
প্রায় তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে নেছারাবাদের ছারছিনা, কালীবাড়ি, বরছাকাঠি, বালিহারী, ডুবিরহাটসহ সন্ধ্যা নদীর বিভিন্ন তীরবর্তী এলাকায় গড়ে উঠেছে এসব ডকইয়ার্ড। এখানে কার্গো জাহাজ, তেলবাহী জাহাজ, বালুবাহী জাহাজ, বাল্কহেড, ট্রলার, লঞ্চসহ বিভিন্ন ধরনের স্টিলের নৌযান নির্মাণ করা হচ্ছে।
ডকইয়ার্ড সংশ্লিষ্টরা জানান, দক্ষ দেশীয় কারিগরদের হাতে নির্মিত জাহাজের মান ও স্থায়িত্ব দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ব্যবসায়ীদের আস্থা অর্জন করেছে। ফলে ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে উদ্যোক্তারা তুলনামূলক কম খরচে উন্নতমানের জাহাজ নির্মাণের জন্য নেছারাবাদে ছুটে আসছেন। এখানকার কিছু জাহাজ ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক রুটেও চলাচল করছে।
শিল্পসংশ্লিষ্টদের দাবি, দেশের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় এখানে কম ব্যয়ে এবং অল্প সময়ে জাহাজ নির্মাণ সম্ভব। বর্তমানে ৩০০ থেকে ৩৫০ ফুট দৈর্ঘ্যের বড় আকারের জাহাজও নির্মাণ করা হচ্ছে।
এই শিল্পকে ঘিরে কাঠমিস্ত্রি, ওয়েল্ডার, লোহার কারিগর, রংমিস্ত্রিসহ বিভিন্ন পেশার হাজারো মানুষ জীবিকা নির্বাহ করছেন। ফলে দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনীতিতে জাহাজ নির্মাণ শিল্প গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে।
স্থানীয় উদ্যোক্তারা বলছেন, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা, সহজ শর্তে ঋণ, আধুনিক প্রযুক্তি এবং আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করা গেলে নেছারাবাদের জাহাজ নির্মাণ শিল্প বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের অন্যতম খাতে পরিণত হতে পারে।
একজন জাহাজ নির্মাণ উদ্যোক্তা বলেন, “কম খরচে উন্নতমানের জাহাজ নির্মাণ করতে পারি বলেই দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে নিয়মিত অর্ডার আসে। সরকারি সহযোগিতা ও প্রযুক্তিগত সহায়তা পেলে আন্তর্জাতিক বাজারের জন্য আরও উন্নতমানের জাহাজ তৈরি করা সম্ভব হবে।”
দীর্ঘদিন ধরে জাহাজ নির্মাণ কাজে যুক্ত কারিগর সৈয়দ আলী বলেন, “আমরা অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে কাজ করছি। আধুনিক প্রশিক্ষণ ও নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত হলে আন্তর্জাতিক মানের জাহাজ নির্মাণে আরও দক্ষতা অর্জন করা সম্ভব হবে।”
জাহাজ নির্মাণ সমিতির সভাপতি হাজী গফ্ফার বলেন, “সরকারি নজরদারি, সহজ ঋণ, কারিগরি সহায়তা ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হলে এ শিল্প দেশের অর্থনীতিতে আরও বড় অবদান রাখবে। পাশাপাশি হাজারো মানুষের নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে।”
নেছারাবাদ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অমিত দত্ত বলেন, “সরকার শিল্পটির উন্নয়নে আন্তরিক। তবে অনেক প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র এখনও সম্পূর্ণ নয়। এসব আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হলে সরকারি সহায়তা ও প্রণোদনা প্রদান আরও সহজ হবে। বর্তমানে উপজেলার ২১টি জাহাজ নির্মাণ ডকইয়ার্ডই কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।”
ঐতিহ্য, দক্ষ জনশক্তি এবং প্রাকৃতিক নদীপথের সমন্বয়ে নেছারাবাদের জাহাজ নির্মাণ শিল্প আজ সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, সময়োপযোগী সরকারি উদ্যোগ, আধুনিক প্রযুক্তির সংযোজন এবং আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করা গেলে এই শিল্প শুধু দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনীতিই নয়, দেশের শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

প্রথম দর্পণ,ডেস্ক