প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের চলাচল সহজ করতে আইন ও নীতিমালা থাকলেও দেশের অধিকাংশ গণপরিবহন এখনো তাদের জন্য ব্যবহারোপযোগী হয়ে ওঠেনি। বাস, ট্রেন, রিকশা, সিএনজি, ফুটপাত কিংবা রেলস্টেশন—প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই প্রতিনিয়ত নানা প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়ছেন তারা। ফলে শিক্ষা, কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্যসেবা ও স্বাভাবিক সামাজিক জীবনে অংশগ্রহণ কঠিন হয়ে পড়েছে লাখো প্রতিবন্ধী মানুষের জন্য।
রাজধানীতে কর্মরত ২৫ বছর বয়সী রিনি ইসলাম দুই বছর বয়সে পোলিও আক্রান্ত হয়ে শরীরের নিচের অংশের চলাচলের ক্ষমতা হারান। নারায়ণগঞ্জে বেড়ে ওঠা রিনি বর্তমানে ঢাকার একটি বায়িং হাউসে কাজ করেন। প্রতিদিন অফিসে যেতে রিকশার ওপর নির্ভর করতে হলেও অধিকাংশ চালক তাকে হুইলচেয়ারসহ বহন করতে অনীহা প্রকাশ করেন। অনেক সময় অতিরিক্ত ভাড়া না দিলে হুইলচেয়ার ভাঁজ বা বহনে সহযোগিতা করেন না বলেও জানান তিনি।
দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী রাহা আক্তার বলেন, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে রেলস্টেশনে ব্রেইল সাইনবোর্ড কিংবা অডিও নির্দেশনা না থাকায় প্রায়ই দিক হারিয়ে ফেলতেন। তার ভাষায়, দেশের যাতায়াত ব্যবস্থায় প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের প্রয়োজনীয় সুবিধা এখনো নিশ্চিত হয়নি।
একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানান রাষ্ট্রায়ত্ত একটি ব্যাংকের কর্মকর্তা হায়দার আলী। জন্মগতভাবে অস্টিওজেনেসিস ইমপেরফেক্টা (ব্রিটল বোন ডিজিজ) রোগে আক্রান্ত তিনি। প্রতিদিন মিরপুর থেকে মেট্রোরেলে কর্মস্থলে যাতায়াত করলেও অন্যান্য গণপরিবহন ব্যবহারে তাকে নানা ভোগান্তির শিকার হতে হয়। বাসে হুইলচেয়ার নিতে অনীহা, রিকশা ও সিএনজিতে পর্যাপ্ত জায়গার অভাব এবং বিকল্প পরিবহনের অতিরিক্ত ব্যয় তার চলাচলকে আরও কঠিন করে তুলেছে।
প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার সুরক্ষায় জাতিসংঘের প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকারসংক্রান্ত কনভেনশন (সিআরপিডি) ২০০৮ সালে কার্যকর হয়। এর ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ ২০১৩ সালে ‘প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইন’ প্রণয়ন করে। আইনের ৩২ ধারায় গণপরিবহনে প্রতিবন্ধীদের জন্য পাঁচ শতাংশ আসন সংরক্ষণের বিধান এবং পরিবহনকে প্রতিবন্ধীবান্ধব করার কথা উল্লেখ থাকলেও বাস্তবে তার কার্যকর বাস্তবায়ন এখনো দৃশ্যমান নয়।
বর্তমানে ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড (ডিএমটিসিএল) পরিচালিত মেট্রোরেল (এমআরটি লাইন-৬)-এ প্রতিবন্ধী যাত্রীদের একক টিকিটে ২৫ শতাংশ ভাড়া ছাড় দেওয়া হচ্ছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি সীমিত রুটের এই সেবা দেশের সামগ্রিক যাতায়াত সংকটের সমাধান নয়।
সংশ্লিষ্টদের মতে, রাজধানীর কয়েকটি আধুনিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছাড়া অধিকাংশ স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে র্যাম্প বা লিফটের ব্যবস্থা নেই। একইভাবে দেশের বাস, ট্রেন, লঞ্চ ও ফুটপাতের বড় অংশই এখনো প্রতিবন্ধীবান্ধব নয়। ফলে শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও স্বাস্থ্যসেবায় প্রবেশাধিকারে প্রতিবন্ধীরা নিয়মিত বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন।
এ পরিস্থিতি পরিবর্তনে সরকার কিছু উদ্যোগ নিয়েছে। গত ২ জুলাই স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত প্রতিবন্ধীদের অধিকার ও সেবা নিশ্চিতকরণবিষয়ক ফলোআপ সভায় জানানো হয়, দেশের ৫০০ উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে পর্যায়ক্রমে প্রতিবন্ধীবান্ধব করা হবে। সেখানে র্যাম্প, লিফট ও বিশেষ টয়লেট নির্মাণ বাধ্যতামূলক করা হবে। পাশাপাশি বিদ্যুৎচালিত (ইভি) বাসেও হুইলচেয়ার ব্যবহারকারীদের জন্য সহজে ওঠানামার ব্যবস্থা রাখার পরিকল্পনা রয়েছে।
সভায় আরও জানানো হয়, নতুন সরকারি অবকাঠামো নির্মাণে প্রতিবন্ধীবান্ধব নকশা বাধ্যতামূলক করা হবে এবং প্রকল্প মূল্যায়নের সময় বিষয়টি কঠোরভাবে যাচাই করা হবে। প্রতিবন্ধী শিশুদের বিদ্যালয়ে ফিরিয়ে আনতে শিক্ষকদের বিশেষ প্রশিক্ষণের উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে।
সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমিন পুতুল বলেন, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার নিশ্চিত করা কোনো দয়া নয়; এটি রাষ্ট্রের প্রতি নাগরিকের ন্যায্য অধিকার।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রায় এক কোটি ৬০ লাখ মানুষ কোনো না কোনো ধরনের প্রতিবন্ধিতার সঙ্গে বসবাস করছেন। শুধু ঢাকা শহরেই তাদের সংখ্যা ১০ লাখের বেশি। এদের মধ্যে প্রায় ৭৫ শতাংশ প্রতিদিন যাতায়াতে সমস্যার মুখোমুখি হন।
বাংলাদেশ সোসাইটি ফর দ্য চেঞ্জ অ্যান্ড অ্যাডভোকেসি নেক্সাস (বি-স্ক্যান)-এর সাধারণ সম্পাদক সালমা মাহবুব বলেন, দেশের প্রায় ৯৫ শতাংশ সরকারি ও বেসরকারি বাসে হুইলচেয়ার ব্যবহারকারীদের জন্য র্যাম্প বা লিফট নেই। রেলস্টেশন থেকে ট্রেনে ওঠা পর্যন্ত পুরো ব্যবস্থাই এখনো প্রতিবন্ধীবান্ধব নয়। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে একাধিকবার আলোচনা হলেও কার্যকর অগ্রগতি হয়নি বলে অভিযোগ করেন তিনি।
উইমেন উইথ ডিজঅ্যাবিলিটিজ ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশনের (ডব্লিউডিডিএফ) নির্বাহী পরিচালক আশরাফুন নাহার মিষ্টি বলেন, দেশের নগর অবকাঠামো এখনো ‘ইউনিভার্সাল ডিজাইন’ নীতির বাইরে রয়েছে। তার মতে, শুধু কয়েকটি আসন সংরক্ষণ করলেই প্রতিবন্ধীবান্ধব পরিবহন নিশ্চিত হয় না; বরং পরিবহন ব্যবস্থার প্রতিটি ধাপকে সবার জন্য সহজ ও নিরাপদ করতে হবে। একই সঙ্গে অর্থায়নের ঘাটতি, রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব, সচেতনতার সংকট এবং প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের মতামত ছাড়া অবকাঠামো পরিকল্পনাকে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) ঢাকা বিভাগের উপপরিচালক (ইঞ্জিনিয়ারিং) কাজী মোরছালিন বলেন, ২০১৮ সালের সড়ক পরিবহন আইনে প্রতিবন্ধীবান্ধব মোটরযানের বিধান থাকলেও তা এখনো পুরোপুরি বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি। তিনি জানান, শারীরিক প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা বিশেষ উপযোগী মোটরযানের ড্রাইভিং লাইসেন্সের জন্য আবেদন করতে পারেন, তবে অনেকেই এ বিষয়ে অবগত নন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গড়ে তুলতে প্রতিবন্ধীবান্ধব গণপরিবহন নিশ্চিত করার বিকল্প নেই। নিরাপদ, সহজলভ্য ও বৈষম্যহীন যাতায়াত ব্যবস্থা নিশ্চিত হলেই শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও সামাজিক জীবনে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের পূর্ণ অংশগ্রহণ সম্ভব হবে।

প্রথম দর্পণ,জাতীয় ডেস্ক