চুল পড়া কমাতে কিংবা নতুন চুল গজানোর আশায় অনেকেই পেঁয়াজের রস, মেথি, কালোজিরা, জবা, কারিপাতা বা অ্যালোভেরার মতো প্রাকৃতিক উপাদান ব্যবহার করেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এসব উপাদান দিয়ে তৈরি বিভিন্ন তেল ও হেয়ার প্যাককে ‘স্থায়ী সমাধান’ হিসেবে প্রচারও করা হয়। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব উপাদান চুল পড়া বন্ধ বা নতুন চুল গজাতে কার্যকর—এমন শক্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি।
সম্প্রতি এক শিক্ষার্থী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের চুল পড়া নিয়ে হতাশা প্রকাশ করে সমাধান চান। এমন অভিজ্ঞতা শুধু তার নয়, চুল পড়ার সমস্যায় ভোগা অসংখ্য মানুষ প্রতিনিয়ত নানা ঘরোয়া উপায়ের ওপর নির্ভর করছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতিদিন ৫০ থেকে ১০০টি চুল পড়া স্বাভাবিক। তবে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি চুল ঝরলে এর কারণ খুঁজে বের করা জরুরি। বংশগত বৈশিষ্ট্য, হরমোনের পরিবর্তন, পুষ্টির ঘাটতি, মানসিক চাপ, দীর্ঘদিনের অসুস্থতা, আয়রনের অভাব, ফাঙ্গাল সংক্রমণ কিংবা কিছু ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায়ও চুল পড়তে পারে।
চর্মরোগ বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য, পেঁয়াজ, মেথি, জবা, আমলকি বা কালোজিরার মতো উপাদানে অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট ও অ্যান্টি-ইনফ্লেমেটরি উপাদান থাকায় মাথার ত্বকের যত্নে কিছুটা সহায়ক হতে পারে। তবে এগুলো ব্যবহার করলেই চুল পড়া বন্ধ হবে বা নতুন চুল গজাবে—এমন দাবির পক্ষে নির্ভরযোগ্য বৈজ্ঞানিক গবেষণা নেই।
বিশেষজ্ঞরা জানান, কিছু প্রাণীর ওপর গবেষণায় সীমিত ইতিবাচক ফল মিললেও মানুষের ক্ষেত্রে তা নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত হয়নি। তবে রোজমেরি তেল ব্যবহারে কিছু গবেষণায় আশাব্যঞ্জক ফলাফল দেখা গেছে।
তারা আরও বলেন, মানুষের মাথায় নির্দিষ্ট সংখ্যক হেয়ার ফলিকল থাকে। কোনো কারণে ফলিকল স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলে নতুন ফলিকল তৈরি হয় না। তাই চুল পড়া শুরু হলে ঘরোয়া পদ্ধতির ওপর দীর্ঘদিন নির্ভর না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই সবচেয়ে কার্যকর।
বিশেষজ্ঞদের মতে, হারবাল তেল দিয়ে মাথার ত্বকে হালকা ম্যাসাজ করলে রক্তসঞ্চালন কিছুটা বাড়তে পারে। এতে হেয়ার ফলিকলে পুষ্টি ও অক্সিজেন সরবরাহ উন্নত হয়, যা চুলের সামগ্রিক স্বাস্থ্যের জন্য সহায়ক হতে পারে। তবে এটিকে চুল গজানোর নিশ্চিত চিকিৎসা হিসেবে দেখা উচিত নয়।
বংশগতভাবে যাদের চুল পাতলা বা অল্প বয়সে অতিরিক্ত চুল পড়ছে, তাদের ক্ষেত্রে আধুনিক চিকিৎসার মাধ্যমে অনেক সময় চুল পড়া নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। তাই সমস্যা বাড়ার আগেই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা আরও বলেন, অ্যালোভেরা, আমলকি, পেঁয়াজ, মেথি, রসুনসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক উপাদানে চুলের জন্য উপকারী ভিটামিন ও খনিজ থাকলেও সেগুলো মাথায় মাখার চেয়ে খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করলে শরীর ও চুলের জন্য বেশি উপকার পাওয়া যায়।
অনলাইনে বিক্রি হওয়া বিভিন্ন হারবাল তেল বা হেয়ার প্যাক কেনার ক্ষেত্রেও সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন চিকিৎসকরা। কারণ এসব পণ্যে উপাদানের পরিমাণ, মান এবং সংরক্ষণ পদ্ধতি সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায় না। দীর্ঘদিন সংরক্ষিত হারবাল পণ্য ব্যবহারে উল্টো ক্ষতির আশঙ্কাও থাকে।
চর্মরোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, সবার জন্য নিয়মিত তেল ব্যবহারও উপযোগী নয়। যাদের মাথার ত্বক স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি তৈলাক্ত, তাদের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত তেল ব্যবহারে খুশকি ও চুল পাতলা হওয়ার ঝুঁকি বাড়তে পারে। অন্যদিকে শুষ্ক বা কোঁকড়া চুলে পরিমিত তেল ব্যবহার কন্ডিশনারের মতো উপকার দিতে পারে।
এছাড়া কারও কারও ক্ষেত্রে পেঁয়াজের রস, মেথি, জবা বা অ্যালোভেরার মতো উপাদান অ্যালার্জি বা অন্যান্য ত্বকের সমস্যা বাড়িয়ে দিতে পারে। তাই চুল পড়ার কারণ নির্ণয় করে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী চিকিৎসা গ্রহণই সবচেয়ে নিরাপদ ও কার্যকর উপায় বলে মত বিশেষজ্ঞদের।

প্রথম দর্পণ,ডেস্ক