উন্নত জীবনের আশায় ইতালি যাওয়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন মাদারীপুরের শিবচর উপজেলার যুবক ইকবাল মাদবর (২৫)। তবে সেই স্বপ্ন পূরণ হওয়ার আগেই লিবিয়ায় নির্মম নির্যাতনের শিকার হয়ে তার মৃত্যু হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। পরিবারের দাবি, মানবপাচারকারী দালালচক্রের মাধ্যমে লিবিয়ায় নেওয়ার পর তাকে স্থানীয় মাফিয়া চক্রের কাছে বিক্রি করে দেওয়া হয়। দীর্ঘদিন নির্যাতন ও মুক্তিপণের দাবির পর শেষ পর্যন্ত প্রাণ হারান তিনি।
এ ঘটনায় ইকবালের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনা এবং জড়িত দালালদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন তার স্বজনরা।
নিহত ইকবাল মাদবর শিবচর উপজেলার দক্ষিণ বহেরাতলা ইউনিয়নের সরকারেরচর গ্রামের কৃষক মোতালেব মাদবরের ছেলে।
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসে স্থানীয় দালাল মো. সাগরের মাধ্যমে ২০ লাখ টাকার চুক্তিতে ইকবালকে ইতালি পাঠানোর কথা বলা হয়। প্রথমে তাকে সৌদি আরবে নেওয়া হয়। পরে বিভিন্ন দেশ ঘুরিয়ে অবৈধ পথে লিবিয়ায় পৌঁছে দেওয়া হয়। সেখানে সমুদ্রপথে ইতালিতে যাওয়ার একবার চেষ্টা ব্যর্থ হলে তিনি আবার লিবিয়ায় ফিরে আসেন।
পরিবারের অভিযোগ, একপর্যায়ে লিবিয়ার পুলিশ তাকে আটক করে কারাগারে পাঠায়। কারামুক্ত হওয়ার পর তিনি স্থানীয় মাফিয়া চক্রের হাতে জিম্মি হন। এরপর তার ওপর অমানবিক নির্যাতন চালিয়ে পরিবারের কাছে মুক্তিপণ দাবি করা হয়।
স্বজনদের ভাষ্য অনুযায়ী, দফায় দফায় টাকা নেওয়ার পরও শেষ পর্যন্ত আরও চার লাখ টাকা দাবি করা হয়। সেই অর্থ পরিশোধ করতে না পারায় ইকবালের সঙ্গে পরিবারের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।
নিহতের বড় বোন মুক্তা আক্তার বলেন, দালাল সরাসরি ইতালিতে পাঠানোর আশ্বাস দিলেও বাস্তবে বিভিন্ন দেশ ঘুরিয়ে তাকে লিবিয়ায় নেওয়া হয়। একবার ইতালিতে যাওয়ার চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর পুলিশ তাকে আটক করে। দেশে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চলাকালে দালাল বারবার টাকা দাবি করে।
তিনি আরও বলেন, পরে জানতে পারেন ইকবালকে মাফিয়া চক্র অপহরণ করে নির্যাতন চালিয়ে ১২ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করে। পরিবার ৮ লাখ টাকা পরিশোধ করলেও এরপর আর তার সঙ্গে যোগাযোগ সম্ভব হয়নি।
মুক্তা আক্তার জানান, বুধবার লিবিয়ায় অবস্থানরত এক বাংলাদেশি ফোন করে তাদের ইকবালের মৃত্যুর খবর দেন। তিনি জানান, সেখানে তার জানাজা সম্পন্ন হয়েছে। পরিবারের দাবি, মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি এ ঘটনার জন্য দায়ী দালাল মো. সাগরের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হোক।
পরিবারের সদস্যরা জানান, এক বোন ও দুই ভাইয়ের মধ্যে ইকবাল ছিলেন মেজো। ছেলেকে বিদেশ পাঠাতে বাবা মোতালেব মাদবর জমি বিক্রি করার পাশাপাশি ঋণও করেছিলেন। পরিবারের আর্থিক অবস্থার উন্নতির আশায় বিদেশে যাওয়া সেই সন্তান আর জীবিত ফিরে এলেন না।
শিবচর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এইচ এম ইবনে মিজান বলেন, অবৈধভাবে বিদেশ গমন ব্যক্তি, পরিবার ও দেশের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। মানবপাচার ও অবৈধ অভিবাসন প্রতিরোধে জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং দালালচক্রের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণে উপজেলা প্রশাসন সর্বদা কাজ করে যাচ্ছে।
শিবচর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা কামাল হোসেন বলেন, এ ঘটনায় লিখিত অভিযোগ পেলে তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বিদেশে কর্মসংস্থানের প্রলোভন দেখিয়ে মানবপাচারকারী চক্র এখনও বিভিন্ন এলাকায় সক্রিয় রয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ায় একের পর এক পরিবার প্রতারণার শিকার হয়ে সর্বস্ব হারাচ্ছে।
উল্লেখ্য, গত বছর একই এলাকার নিশাত নামে আরেক যুবক ইতালিতে যাওয়ার পথে নৌকাডুবির ঘটনায় নিখোঁজ হন। এরপর থেকে তার আর কোনো সন্ধান মেলেনি। পরিবারের দাবি, দালালচক্রই তাদের নৌকাডুবিতে মৃত্যুর খবর জানিয়েছিল।

শাহিন রেজা,মাল্টিমিডিয়া ইনচার্জ