জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়ন, রাষ্ট্র ও রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে পরিবর্তন এবং আন্দোলনে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন জুলাই শহীদ পরিবারের সদস্যরা। একই সঙ্গে দেশের মানুষের সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অধিকার নিশ্চিত করার পাশাপাশি মেধাবী তরুণদের যোগ্যতা কাজে লাগানোর উপযুক্ত পরিবেশ তৈরির আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
শনিবার (৮ আগস্ট) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী সিনেট ভবনে গণঅভ্যুত্থান-২০২৪-এর দুই বছর পূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় এসব দাবি জানান শহীদ পরিবারের সদস্যরা।
‘ফ্যাসিবাদী সরকার পতনে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের ভূমিকা’ শীর্ষক এ আলোচনা সভার আয়োজন করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাদা দল ও ইউনিভার্সিটি টিচার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ইউট্যাব)।
আলোচনা সভায় শহীদ আবু সাঈদের বড় ভাই আবু হোসেন, শহীদ ওয়াসিমের বাবা শফিউল আলম এবং শহীদ মীর মুগ্ধর ভাই মীর মাহবুবুর রহমান স্নিগ্ধ বক্তব্য দেন।
শহীদ আবু সাঈদের বড় ভাই আবু হোসেন বলেন, ২০২৪ সালের ১৬ জুলাই তার ভাইকে নির্মমভাবে গুলি করে হত্যা করা হয়। এর পর কোটা সংস্কার আন্দোলন গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয় এবং ছাত্র-জনতা রাজপথে নেমে স্বৈরাচারী সরকারের পতন ঘটায়।
তিনি বলেন, ১৯৬৯ সালের গণআন্দোলনে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক শামসুজ্জোহা যেভাবে শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানেও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের পাশে থেকে সাহস, সহযোগিতা ও উদ্দীপনা দিয়েছেন। আন্দোলনকে এগিয়ে নেওয়া এবং সরকারের পতনে তাদের ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ।
আবু হোসেন বলেন, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানকে তুলনা করা যাবে না। তবে ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার আত্মত্যাগের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল ১৯৭১ সালে অর্জিত স্বাধীনতাকে পুনরুদ্ধার ও সুরক্ষিত করা।
সম্প্রতি জুলাই গণঅভ্যুত্থান নিয়ে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপের ঘটনায় হতাশা প্রকাশ করে তিনি বলেন, এ ধরনের কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষ থেকে প্রত্যাশিত প্রতিবাদ দেখা যায়নি। জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে অবমাননা বা ব্যঙ্গ-বিদ্রূপের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
তিনি আরও বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশে মানুষের সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। সাধারণ মানুষ যেন আগের সময়ের তুলনায় বর্তমান সরকারের আমলে ভালো থাকার কথা বলতে পারে—তবেই জুলাইয়ের শহীদদের আত্মত্যাগ পূর্ণতা পাবে।
শহীদ ওয়াসিমের বাবা শফিউল আলম বলেন, তাদের সন্তানরা কিছু প্রত্যাশা, আশা ও আকাঙ্ক্ষা নিয়ে রাস্তায় নেমেছিল। সেই আকাঙ্ক্ষা যেন কোনোভাবেই বিভ্রান্ত না হয় এবং ব্যবসা-বাণিজ্য কিংবা অন্য কোনো স্বার্থের কারণে নষ্ট না হয়, সে বিষয়ে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে।
তিনি বলেন, মেধার জন্যই শিক্ষার্থীরা আন্দোলনে নেমেছিল। দেশের প্রতিটি মেধাবী তরুণ-তরুণী যাতে তাদের মেধা ও যোগ্যতা কাজে লাগানোর সুযোগ পায়, সে ব্যবস্থা করতে হবে।
জুলাই শহীদদের হত্যার বিচার প্রসঙ্গে শফিউল আলম বলেন, নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর খুব বেশি সময় পার হয়নি। সরকারকে কাজ করার সুযোগ দিতে হবে এবং সহযোগিতা করতে হবে। সরকারের কোনো ভুল-ত্রুটি থাকলে তা সংশোধনের সুযোগ দেওয়ারও আহ্বান জানান তিনি।
শহীদ মীর মুগ্ধর ভাই মীর মাহবুবুর রহমান স্নিগ্ধ বলেন, শহীদদের আকাঙ্ক্ষাকে মূলত তিনটি বিষয়ে ভাগ করা যায়। এগুলো হলো—ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্র কাঠামোর পরিবর্তন, রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন এবং জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু বিচার।
তিনি বলেন, কোনো একজন তরুণ সংসদ সদস্য যদি পুরো একটি প্রজন্মের হয়ে কথা বলেন, তাহলে প্রশ্ন ওঠে—কোন জাতীয় সম্মেলন বা গণভোটের মাধ্যমে তাকে পুরো প্রজন্মের প্রতিনিধিত্বের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে? আলোচনা, সমালোচনা ও সংশোধনের সুযোগ থাকলেও একটি প্রজন্মের কথা বলে নিজের রাজনৈতিক অবস্থান চাপিয়ে দেওয়া আরেক ধরনের ফ্যাসিবাদের লক্ষণ।
স্নিগ্ধ বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে পরিবর্তনের প্রত্যাশা ছিল। কিন্তু বিভিন্ন এলাকায় সিনিয়র রাজনীতিবিদদের নিয়ে যেভাবে বক্তব্য দেওয়া হচ্ছে, তা প্রত্যাশিত রাজনৈতিক সংস্কৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এ ধরনের রাজনৈতিক সংস্কৃতি ফ্যাসিবাদী সরকারের সময় দেখা গেছে। জুলাইয়ের ছাত্র-জনতা এমন রাজনৈতিক সংস্কৃতি চায়নি।
তিনি বলেন, শহীদদের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের দায়িত্ব শুধু সরকার বা সরকারি দলের নয়; বিরোধী দলসহ দেশের সব নাগরিকের সম্মিলিত দায়িত্ব রয়েছে।
‘শহীদরা আমাদের ওপর থেকে দেখছেন’—এ কথা মনে রেখে সবাইকে দায়িত্বশীল আচরণ করার আহ্বান জানান তিনি।
জুলাই হত্যাকাণ্ডের বিচার প্রসঙ্গে স্নিগ্ধ শহীদ আনাসকে গুলি করা পুলিশ সদস্যের তিন বছরের সাজা এবং সাবেক আইজিপি চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুনের পাঁচ বছরের সাজা নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেন। এ বিষয়ে সবাইকে সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
তিনি বলেন, ‘দেশকে বদলাতে হলে প্রথমে নিজেকে বদলাতে হবে। আমরা যদি নিজেদের পরিবর্তন করতে না পারি, তাহলে দেশকে পরিবর্তন করতে পারব না।’
আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ। বিশেষ অতিথি ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলামসহ দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাদা দলের আহ্বায়ক ও ইউট্যাবের মহাসচিব অধ্যাপক মো. মোরশেদ হাসান খানের সভাপতিত্বে আলোচনা সভাটি অনুষ্ঠিত হয়।

প্রথম দর্পণ,ডেস্ক