মির্জা ফখরুলের রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ, শুরু নতুন অধ্যায়

  • প্রথম দর্পণ,ডেস্ক
  • আপলোড সময় : ২২ আগস্ট ২০২৬, ১০:৪৪ দুপুর
  • ৫৯২৪ বার পড়া হয়েছে

Banner Ad
https://prothomdorpan.com/admin/fav-icon-logo/image/1761146741.250..125.jpg

বিএনপির দীর্ঘদিনের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বাংলাদেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নিয়েছেন। শুক্রবার (২১ আগস্ট) সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় বঙ্গভবনের ঐতিহাসিক দরবার হলে জাতীয় সংসদের ভারপ্রাপ্ত স্পিকার কায়সার কামাল তাকে শপথবাক্য পাঠ করান।

শপথ গ্রহণের মধ্য দিয়ে দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব নিলেন ৭৮ বছর বয়সী এই প্রবীণ রাজনীতিক। শপথ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, তার সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান, মন্ত্রিসভার সদস্য, সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ও নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস, বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান, প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী, প্রধান নির্বাচন কমিশনার এএমএম নাসির উদ্দিনসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা, বিচারপতি, কূটনীতিক, তিন বাহিনীর প্রধান এবং সামরিক-বেসামরিক কর্মকর্তারা।

শপথ অনুষ্ঠানের শুরুতে বিউগল বাজানো এবং জাতীয় সংগীত ও কোরআন তেলাওয়াত করা হয়। এরপর ভারপ্রাপ্ত স্পিকার কায়সার কামাল নবনির্বাচিত রাষ্ট্রপতিকে শপথবাক্য পাঠ করান। শপথ শেষে মির্জা ফখরুল শপথনামায় স্বাক্ষর করেন। পরে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীরবিক্রম তাকে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানান। এরপর নির্ধারিত রাষ্ট্রপতির আসনে বসেন মির্জা ফখরুল।

রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই তিনি মন্ত্রিসভায় নতুন যুক্ত হওয়া চার মন্ত্রী ও দুই প্রতিমন্ত্রীকে পৃথক দুই দফায় শপথ পড়ান। রাষ্ট্রপতি ও নতুন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের শপথ অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব ড. নাসিমুল গনি।

অনুষ্ঠানে মির্জা ফখরুলের স্ত্রী রাহাত আরা বেগম এবং দুই মেয়ে ড. মির্জা শামারুহ ও মির্জা সাফারুহসহ পরিবারের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। রাষ্ট্রপতির শপথ উপলক্ষে বঙ্গভবনে ১২ শতাধিক অতিথিকে আমন্ত্রণ জানানো হয়।

২৫৫ ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত

এর আগে বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে ভোটের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। ৩৪৯টি ভোটের মধ্যে তিনি ২৫৫ ভোট পান। তার প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যের প্রার্থী কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বীরবিক্রম পান ৮৮ ভোট।

বৃহস্পতিবার দুপুর ২টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত সংসদ ভবনের সংসদ কক্ষে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। ভোট গণনা শেষে নির্বাচনি কর্তা ও প্রধান নির্বাচন কমিশনার নাসির উদ্দিন ফল ঘোষণা করেন। একই রাতে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ফলাফলের গেজেট প্রকাশ করা হয়।

দীর্ঘ ৩৫ বছর পর রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে একাধিক প্রার্থী থাকায় এবার সংসদ সদস্যদের সরাসরি ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়।

পদত্যাগ করেছিলেন বিএনপির দায়িত্ব থেকে

রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার পর সংবিধান অনুযায়ী মির্জা ফখরুল বিএনপির দলীয় পদ থেকে পদত্যাগ করেন। একই সঙ্গে মন্ত্রিসভার দায়িত্বও ছাড়েন তিনি। এর আগে তিনি বিএনপির মহাসচিবের পাশাপাশি স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন।

তার রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার পর বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব হিসেবে সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীকে দায়িত্ব দেওয়া হয়।

শপথের আগে জিয়া ও খালেদার সমাধিতে শ্রদ্ধা

রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেওয়ার আগে শুক্রবার জুমার নামাজ শেষে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন মরহুমা খালেদা জিয়ার সমাধিতে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন মির্জা ফখরুল।

জিয়া স্মৃতি কমপ্লেক্সে গিয়ে তিনি দুই নেতার সমাধিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। পরে কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে ফাতেহা পাঠ ও মোনাজাত করেন।

প্রায় এক মাস ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্বে হাফিজ উদ্দিন

এর আগে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পাওয়া মো. সাহাবুদ্দিন চুপ্পু গত ২৪ জুলাই গুরুতর অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে পদত্যাগ করেন। রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হওয়ার পর সংবিধানের ৫৪ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন।

প্রায় এক মাস রাষ্ট্রপ্রধানের দায়িত্ব পালনের পর নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের মধ্য দিয়ে তার ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্বের অবসান ঘটে। বৃহস্পতিবার বঙ্গভবনে শেষ কর্মদিবসে আনুষ্ঠানিক বিদায় নেন হাফিজ উদ্দিন। এ সময় সশস্ত্র বাহিনীর একটি চৌকস দল তাকে গার্ড অব অনার দেয়।

দীর্ঘ রাজনৈতিক পথ পেরিয়ে রাষ্ট্রপতি

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের রাজনৈতিক জীবনের শুরু ছাত্রাবস্থায়। ১৯৪৮ সালের ২৬ জানুয়ারি ঠাকুরগাঁওয়ের কালীবাড়ী এলাকায় জন্মগ্রহণ করেন তিনি। ঢাকা কলেজে উচ্চমাধ্যমিক শেষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে ভর্তি হন। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের রাজনীতিতে যুক্ত হন এবং ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের সময় সংগঠনটির বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি নির্বাচিত হন।

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় বামপন্থি মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠক হিসেবে ভূমিকা রাখেন তিনি। স্বাধীনতার পর শিক্ষকতা ও সরকারি চাকরিতে যুক্ত হন। ১৯৭২ থেকে ১৯৮৬ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন সরকারি দায়িত্ব পালন করেন। এ সময় ঢাকা কলেজসহ বিভিন্ন সরকারি কলেজে শিক্ষকতা এবং সরকারি পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরে দায়িত্ব পালন করেন। তৎকালীন উপপ্রধানমন্ত্রী এসএ বারীর একান্ত সচিব হিসেবেও কাজ করেন তিনি।

১৯৮৬ সালে সরকারি চাকরি ছেড়ে সক্রিয় রাজনীতিতে প্রবেশ করেন মির্জা ফখরুল। ১৯৮৮ সালে ঠাকুরগাঁও পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। পরে নব্বইয়ের দশকের শুরুতে বিএনপিতে যোগ দিয়ে দলটির সাংগঠনিক বিভিন্ন পর্যায়ে দায়িত্ব পালন করেন।

২০০১ সালের জাতীয় নির্বাচনে প্রথমবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে বিএনপি সরকারের কৃষি প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পান। পরে বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্বও পালন করেন।

২০১১ সালে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব পাওয়ার পর ২০১৬ সালের ৩০ মার্চ দলের মহাসচিব হিসেবে স্থায়ীভাবে দায়িত্ব নেন। বিএনপি প্রতিষ্ঠার পর দীর্ঘ সময় মহাসচিবের দায়িত্ব পালনকারী নেতা হিসেবে তিনি দলের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি করেন।

২০১৮ সালের নির্বাচনে বগুড়ার একটি আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হলেও দলীয় সিদ্ধান্তে তিনি শপথ নেননি। পরে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে সরকার গঠন করলে মির্জা ফখরুল স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান।

দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে দলীয় প্রতিকূলতা, আন্দোলন ও কারাবরণের মধ্য দিয়েও বিএনপির নেতৃত্বে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন তিনি। এবার সেই দীর্ঘ রাজনৈতিক পথ পেরিয়ে দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদ রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করলেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।




কমেন্ট করুন:

ফেসবুকে আমরা
সর্বশেষ সংবাদ
Sidebar Ad