গণতন্ত্রের মাপকাঠি শুধু নির্বাচন নয়, মানুষের কল্যাণও

  • প্রথম দর্পণ,ডেস্ক
  • আপলোড সময় : ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৪:০৪ দুপুর
  • ৭৩৪৮ বার পড়া হয়েছে

Banner Ad
https://prothomdorpan.com/admin/fav-icon-logo/image/1761146741.250..125.jpg
গণতন্ত্রের সাফল্য শুধু অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন কিংবা রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের কার্যকারিতায় সীমাবদ্ধ নয়। নাগরিকের জীবনমান, নিরাপত্তা, মর্যাদা, সামাজিক আস্থা এবং সামগ্রিক কল্যাণও গণতন্ত্রের কার্যকারিতা নির্ধারণের গুরুত্বপূর্ণ সূচক হতে পারে। ভুটানের রাজনৈতিক রূপান্তর ও ‘গ্রস ন্যাশনাল হ্যাপিনেস’ (জিএনএইচ) ধারণা থেকে এমন শিক্ষা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।

‘হোয়্যার হ্যাপিনেস ইজ আ মেজার অভ গভর্ন্যান্স: হোয়াট ভুটান্‌জ ডেমোক্র্যাটিক কনসলিডেশন ক্যান টিচ গ্লোবাল সাউথ নেশন্স’ শীর্ষক নিবন্ধে এ বিশ্লেষণ তুলে ধরা হয়েছে। নিবন্ধটির লেখক সামিয়া ইফফাত।

নিবন্ধে বলা হয়েছে, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রাজনৈতিক মেরুকরণ, বৈষম্য, আইনের শাসনের দুর্বলতা, প্রাতিষ্ঠানিক আস্থার সংকট এবং জনঅংশগ্রহণের ঘাটতির কারণে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান নিয়ে অসন্তোষ বাড়ছে। এ অবস্থায় ভুটানের অভিজ্ঞতা উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য বিকল্প চিন্তার সুযোগ তৈরি করতে পারে।

ভুটান নিরঙ্কুশ রাজতন্ত্র থেকে সাংবিধানিক গণতান্ত্রিক রাজতন্ত্রে রূপান্তরিত হয়েছে। দেশটির এই পরিবর্তন ব্যাপক গণআন্দোলন বা বাইরের চাপের পরিবর্তে নিজস্ব রাজনৈতিক দর্শনের সঙ্গে যুক্ত ছিল। সাবেক রাজা জিগমে সিংয়ে ওয়াংচুকের সময় ‘গ্রস ন্যাশনাল হ্যাপিনেস’ ধারণার বিকাশ ঘটে। এ দর্শনে শুধু জিডিপি দিয়ে উন্নয়ন পরিমাপ না করে মানুষের সুখ, কল্যাণ ও পরিবেশ সুরক্ষাকেও উন্নয়নের অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

জিএনএইচের চারটি প্রধান ভিত্তি হলো—টেকসই ও ন্যায্য আর্থসামাজিক উন্নয়ন, পরিবেশ সংরক্ষণ, সাংস্কৃতিক সংরক্ষণ এবং সুশাসন। এসব বিষয়কে আরও কয়েকটি ক্ষেত্রে মূল্যায়ন করা হয়। ফলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি জীবনমান, সামাজিক সম্পর্ক, পরিবেশ, সংস্কৃতি ও প্রশাসনের কার্যকারিতাও উন্নয়নের সূচক হয়ে ওঠে।

সীমিত অর্থনৈতিক সম্পদ থাকা সত্ত্বেও ভুটান শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও গ্রামীণ উন্নয়নে বিনিয়োগ করেছে। পরিবেশ সংরক্ষণকেও রাষ্ট্রীয় নীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ করা হয়েছে। দেশটির ৭০ শতাংশের বেশি ভূমি বনাঞ্চলের আওতায় রয়েছে এবং সংবিধানে বন সংরক্ষণের বিষয়টি সুরক্ষিত। নিবন্ধে ভুটানকে বিশ্বের একমাত্র কার্বন-নেগেটিভ দেশ হিসেবেও উল্লেখ করা হয়েছে।

বাংলাদেশের মতো জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশের জন্য ভুটানের পরিবেশনীতি থেকে শিক্ষা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। নদীদূষণ, বন উজাড়, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, ম্যানগ্রোভ ধ্বংস ও তাপপ্রবাহ মানুষের জীবন ও জীবিকার ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে। তাই পরিবেশ সংরক্ষণকে মানবনিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অধিকারের সঙ্গে যুক্ত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

সাংস্কৃতিক সংরক্ষণকেও গণতান্ত্রিক স্থিতিশীলতার সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। ভুটান গণতান্ত্রিক রূপান্তরের পাশাপাশি নিজস্ব সাংস্কৃতিক পরিচয় ধরে রাখার চেষ্টা করেছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণের পাশাপাশি বহুত্ববাদ, অন্তর্ভুক্তি ও সংখ্যালঘু অধিকারের প্রতি সম্মান নিশ্চিত করার প্রয়োজন রয়েছে।

নিবন্ধে সুশাসনকে নাগরিক সুখের অন্যতম ভিত্তি হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। কার্যকর প্রশাসন, জবাবদিহি, স্বচ্ছতা, দ্রুত সরকারি সেবা এবং জনআস্থাকে নাগরিক কল্যাণের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করা হয়েছে।

এ দৃষ্টিভঙ্গিতে নির্দিষ্ট সময় পরপর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়াই গণতন্ত্রের একমাত্র মানদণ্ড নয়। নাগরিক অর্থনৈতিকভাবে নিরাপদ, সামাজিকভাবে সংযুক্ত, ব্যক্তিগতভাবে মর্যাদাপূর্ণ এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থাশীল কি না—তাও গণতন্ত্রের সাফল্য নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ।

গত দুই দশকে ভুটান জীবন প্রত্যাশা বৃদ্ধি, দারিদ্র্য হ্রাস, নারীর ক্ষমতায়ন, শিশুমৃত্যু কমানো ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে অগ্রগতি করেছে। তবে গণতন্ত্রের বিভিন্ন সূচকে দেশটির অবস্থান নিয়ে প্রশ্নও রয়েছে। ফলে ভবিষ্যৎ গণতান্ত্রিক উন্নয়নে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও নির্বাচনী প্রতিযোগিতার পাশাপাশি নাগরিক কল্যাণ, মানবিক মর্যাদা ও প্রাতিষ্ঠানিক আস্থাকে গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।

তবে বাংলাদেশের জন্য ভুটানের মডেল হুবহু অনুসরণের প্রয়োজন নেই। দুই দেশের আয়তন, জনসংখ্যা, রাজনৈতিক ইতিহাস, সংস্কৃতি ও সামাজিক বৈচিত্র্যের মধ্যে বড় পার্থক্য রয়েছে। বরং ভুটানের অভিজ্ঞতা থেকে নীতিগত শিক্ষা নিয়ে বাংলাদেশের বাস্তবতার উপযোগী মানবকেন্দ্রিক গণতান্ত্রিক কাঠামো গড়ে তোলার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

এ ক্ষেত্রে জিডিপি প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি জনআস্থা, সরকারি সেবায় সন্তুষ্টি ও মানুষের মানসিক সুস্থতার মতো বিষয় মূল্যায়নে অন্তর্ভুক্ত করার কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে জলবায়ু অভিযোজন, পরিবেশবান্ধব অবকাঠামো, নদী পুনরুদ্ধার ও নগর পরিবেশ ব্যবস্থাপনায় গুরুত্ব দেওয়ার সুপারিশ রয়েছে। সামাজিক সংহতি, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সংখ্যালঘুদের সামাজিক নিরাপত্তা জোরদারের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

গণতন্ত্রের প্রকৃত সাফল্য শুধু ব্যালট বাক্সে নয়; নাগরিকের দৈনন্দিন জীবন কতটা নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও কল্যাণমুখী—তার মধ্যেও এর প্রতিফলন ঘটে। ভুটানের ‘গ্রস ন্যাশনাল হ্যাপিনেস’ ধারণা তাই উন্নয়নশীল দেশগুলোকে গণতন্ত্রকে আরও মানবকেন্দ্রিকভাবে ভাবার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ তৈরি করতে পারে।

সূত্র: সাউথ এশিয়া মনিটর




কমেন্ট করুন:

ফেসবুকে আমরা
সর্বশেষ সংবাদ
Sidebar Ad