৭ আগস্ট মক্কায় সৌদি যুবরাজ ও প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ বিন সালমান, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ এবং তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়েব এরদোয়ান মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। চুক্তিতে বলা হয়েছে, তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর সশস্ত্র হামলাকে তিন দেশের সবার ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে। পাশাপাশি প্রতিরক্ষা সহযোগিতার বিভিন্ন ক্ষেত্র জোরদারের কথা বলা হয়েছে।
সৌদি ভূখণ্ডে হামলা, বাড়ছে চাপসাম্প্রতিক সময়ে ইয়েমেনে হুথিদের সঙ্গে সৌদি-সমর্থিত বাহিনীর সংঘাত তীব্র হয়েছে। একই সময়ে সৌদি ভূখণ্ডেও ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার ঘটনা ঘটছে। ১৯ সেপ্টেম্বর সৌদি কর্তৃপক্ষ জানায়, হুথিরা রিয়াদে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার চেষ্টা করেছিল, যা প্রতিহত করা হয়েছে। হুথিরা রিয়াদ ও ইয়ানবুর বিভিন্ন স্থাপনায় হামলার দাবি করলেও এসব দাবির সবগুলো স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি।
এর আগে পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ বলেছিলেন, সৌদি আরবের ওপর হামলা হলে মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি কার্যকর হতে পারে। তাঁর বক্তব্যের পর চুক্তির সামরিক প্রতিশ্রুতি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়।
পাকিস্তানের অবস্থান এখনো প্রতিরক্ষামূলকতবে ইসলামাবাদ এখনো ইয়েমেনে হুথিদের বিরুদ্ধে সরাসরি সামরিক অভিযানে যাওয়ার ঘোষণা দেয়নি। পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, মক্কা চুক্তি মূলত আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা রক্ষায় প্রতিরোধমূলক ও প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা জোরদারের উদ্দেশ্যে করা হয়েছে।
১০ সেপ্টেম্বরের ব্রিফিংয়ে পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র বলেন, পাকিস্তান ইয়েমেনে শান্তি ও স্থিতিশীলতার পক্ষে এবং আন্তর্জাতিক উদ্যোগগুলোকে সমর্থন করে। একই সঙ্গে সৌদি আরবের সার্বভৌমত্ব, ভৌগোলিক অখণ্ডতা ও নিরাপত্তার প্রতি পাকিস্তানের অবিচল সমর্থনের কথাও পুনর্ব্যক্ত করা হয়।
ফলে সৌদি ভূখণ্ডের বিমান প্রতিরক্ষা, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, প্রশিক্ষণ বা অন্যান্য প্রতিরক্ষা সহযোগিতা এবং ইয়েমেনের ভেতরে সরাসরি সামরিক হামলা—দুই বিষয়কে আলাদা করে দেখছে ইসলামাবাদ।
তুরস্কও সামরিক সহায়তার কথা বলছেএদিকে তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান ১৯ সেপ্টেম্বর বলেছেন, সৌদি আরবের সামরিক সহায়তার প্রয়োজন হতে পারে এবং মক্কা চুক্তির অংশীদার হিসেবে বিষয়টি পাকিস্তানের সঙ্গে আলোচনা করা হবে। তুরস্ক প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত সামরিক সহায়তা দেওয়ার বিষয়েও প্রস্তুত রয়েছে বলে তিনি জানান।
এতে মক্কা চুক্তির বাস্তব প্রয়োগ নিয়ে আলোচনা আরও জোরালো হয়েছে। তবে তিন দেশের চুক্তিতে সম্মিলিত প্রতিরক্ষার নীতি থাকলেও কোনো সদস্য আক্রান্ত হলে ঠিক কী ধরনের সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া হবে, তার বিস্তারিত প্রকাশ্য তথ্য এখনো সীমিত।
ইয়েমেনে সরাসরি জড়ানোর প্রশ্নপাকিস্তানের জন্য পরিস্থিতি বিশেষভাবে সংবেদনশীল। সৌদি আরবের সঙ্গে দেশটির দীর্ঘদিনের প্রতিরক্ষা সম্পর্ক রয়েছে। অন্যদিকে ইয়েমেনের হুথিদের সঙ্গে ইরানের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে বলে ব্যাপকভাবে উল্লেখ করা হয়। ফলে ইয়েমেনে সরাসরি সামরিক অভিযান পাকিস্তানকে আঞ্চলিকভাবে আরও জটিল পরিস্থিতির মধ্যে ফেলতে পারে।
২০১৫ সালের ইয়েমেন যুদ্ধের সময়ও পাকিস্তান সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক অভিযানে সরাসরি অংশ নেয়নি। বর্তমান পরিস্থিতিতেও ইসলামাবাদের প্রকাশ্য অবস্থানে সৌদি নিরাপত্তার প্রতি অঙ্গীকার এবং ইয়েমেনের ভেতরে সরাসরি যুদ্ধে অংশ নেওয়ার মধ্যে পার্থক্য বজায় রাখা হচ্ছে।
এদিকে ইয়েমেনে হুথিদের সাম্প্রতিক অগ্রযাত্রা ও সৌদি ভূখণ্ডে হামলা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হুথিরা লোহিত সাগরের উপকূলে গুরুত্বপূর্ণ কিছু এলাকায় অগ্রসর হয়েছে এবং সৌদি-সমর্থিত বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষ বেড়েছে।
সব মিলিয়ে, মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তির প্রথম বড় পরীক্ষা এখন সৌদি আরবের নিরাপত্তা পরিস্থিতি। সৌদি ভূখণ্ডে হামলার জবাবে পাকিস্তান ও তুরস্ক কী ধরনের সহায়তা দেয় এবং সেই সহায়তা কোথায় সীমারেখা টানে—তার ওপরই চুক্তিটির বাস্তব কার্যকারিতা অনেকটা নির্ভর করবে। এখন পর্যন্ত পাকিস্তানের প্রকাশ্য অবস্থান হলো, সৌদি নিরাপত্তার প্রতি তার অঙ্গীকার রয়েছে; তবে ইয়েমেনের যুদ্ধে সরাসরি প্রবেশের কোনো সিদ্ধান্ত ঘোষণা করা হয়নি।

প্রথম দর্পণ,আন্তর্জাতিক ডেস্ক