আধুনিকায়নের অগ্রগতি, ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণে বিতর্ক: মোহাম্মদ বিন সালমানের নেতৃত্বের ১০ দিক

  • প্রথম দর্পণ,আন্তর্জাতিক ডেস্ক
  • আপলোড সময় : ০৪ নভেম্বর ২০২৬, ০৬:৩০ বিকাল
  • ৩৬২৫ বার পড়া হয়েছে

Banner Ad
https://prothomdorpan.com/admin/fav-icon-logo/image/1761146741.250..125.jpg মোহাম্মদ বিন সালমান
সৌদি আরবের ক্রাউন প্রিন্স ও কার্যত রাষ্ট্র পরিচালনার প্রধান নীতিনির্ধারক মোহাম্মদ বিন সালমান (এমবিএস) সমসাময়িক মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম প্রভাবশালী ও আলোচিত নেতা। তাঁর নেতৃত্বে দেশটিতে অর্থনৈতিক, সামাজিক, প্রশাসনিক ও কূটনৈতিক ক্ষেত্রে ব্যাপক পরিবর্তন ঘটছে। তেলনির্ভর অর্থনীতি থেকে বেরিয়ে আসা, নারীর কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, পর্যটন ও বিনোদনশিল্পের বিকাশ এবং আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ আকর্ষণে নেওয়া উদ্যোগ সৌদি আরবকে নতুন পরিচয়ে প্রতিষ্ঠার পথ তৈরি করেছে।

তবে এসব অগ্রগতির পাশাপাশি রাজনৈতিক ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ, মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ, মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় সীমাবদ্ধতা, সাংবাদিক জামাল খাশোগি হত্যাকাণ্ড এবং ইয়েমেন যুদ্ধের মতো বিষয় তাঁর নেতৃত্বকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।

ফলে এমবিএসের নেতৃত্বকে একদিকে আধুনিকায়নের উদ্যোগ, অন্যদিকে কর্তৃত্ববাদী শাসনব্যবস্থার বিস্তার—এই দুই বাস্তবতার আলোকে মূল্যায়ন করতে হয়। তাঁর নেতৃত্বের উল্লেখযোগ্য পাঁচটি ইতিবাচক ও পাঁচটি নেতিবাচক দিক সৌদি আরবের পরিবর্তনের চিত্র তুলে ধরে।

নেতৃত্বের ইতিবাচক পাঁচ দিক১. তেলনির্ভরতা কমিয়ে অর্থনীতির বহুমুখীকরণ

এমবিএসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগগুলোর একটি হলো ‘ভিশন ২০৩০’। ২০১৬ সালে ঘোষিত এই পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য সৌদি আরবের অর্থনীতিকে তেলের ওপর অতিনির্ভরতা থেকে বের করে পর্যটন, শিল্প, প্রযুক্তি, খনিজ সম্পদ, পরিবহন, বিনোদন ও আর্থিক সেবাসহ বিভিন্ন খাতে সম্প্রসারণ করা।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ২০২৬ সালের সৌদি আরববিষয়ক মূল্যায়নে বলা হয়েছে, ভিশন ২০৩০-এর সংস্কার অর্থনীতির কাঠামোগত পরিবর্তন, বেসরকারি খাতের সম্প্রসারণ এবং অ-তেল খাতের বিকাশে ভূমিকা রেখেছে। ২০২৫ সালে দেশটির মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) বেসরকারি খাতের অবদান ৫১ শতাংশে পৌঁছেছে, যা ২০১৬ সালে ছিল ৪৪ শতাংশ।

এটি সৌদি অর্থনীতির কাঠামোগত পরিবর্তনের গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। তবে তেল এখনো দেশটির রপ্তানি আয় ও সরকারি রাজস্বের অন্যতম প্রধান উৎস। ফলে অর্থনীতিতে বহুমুখীকরণ ঘটলেও তেলনির্ভরতা পুরোপুরি কাটেনি।

২. নারীর কর্মসংস্থান ও সামাজিক অংশগ্রহণ বৃদ্ধি

এমবিএসের আমলে সৌদি নারীদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক অংশগ্রহণে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে। নারীদের গাড়ি চালানোর অনুমতি, কর্মক্ষেত্রে প্রবেশের সুযোগ বৃদ্ধি এবং বিনোদন ও জনপরিসরে অংশগ্রহণের ক্ষেত্র সম্প্রসারণ দেশটির দীর্ঘদিনের সামাজিক কাঠামোয় পরিবর্তন এনেছে।

আইএমএফের ২০২৬ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সৌদি নারীদের শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণের হার ২০১৬ সালের ২২ দশমিক ৮ শতাংশ থেকে ২০২৫ সালে ৩৫ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। ২০৩০ সালের মধ্যে এ হার ৪০ শতাংশে নেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে দেশটির সরকার।

নারীর কর্মসংস্থান বৃদ্ধি শুধু শ্রমবাজারেই প্রভাব ফেলছে না; পরিবার, ভোক্তা অর্থনীতি ও সেবা খাতেও নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে। তবে কর্মক্ষেত্রে অগ্রগতির পাশাপাশি আইনগত সমতা ও ব্যক্তিস্বাধীনতার ক্ষেত্রে এখনো সীমাবদ্ধতা রয়েছে।

৩. পর্যটন ও বিনোদনশিল্পের বিকাশ

দীর্ঘদিন সৌদি আরবের আন্তর্জাতিক পরিচিতি মূলত হজ ও ওমরাহকেন্দ্রিক ছিল। এমবিএস সেই পরিচয়ের পাশাপাশি দেশটিকে পর্যটন, খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক আয়োজন, সংগীত ও চলচ্চিত্রশিল্পের আন্তর্জাতিক গন্তব্য হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছেন।

আল-উলা, লোহিত সাগর উপকূল, ঐতিহাসিক দিরিয়াহ, রিয়াদের বিনোদন প্রকল্প এবং আন্তর্জাতিক ক্রীড়া আয়োজন এ পরিকল্পনার অংশ। ২০৩৪ সালের ফুটবল বিশ্বকাপ আয়োজনের স্বত্বও পেয়েছে সৌদি আরব।

এসব উদ্যোগের মাধ্যমে পর্যটন আয় বাড়ানো, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং হোটেল, পরিবহন ও স্থানীয় ব্যবসার সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি হচ্ছে। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের জন্য বিনোদন ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের পরিসর আগের তুলনায় অনেক বিস্তৃত হয়েছে।

৪. প্রশাসনিক সংস্কার ও সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে গতি

সৌদি আরবের প্রশাসনিক ব্যবস্থায় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমন্বয় বাড়াতে এমবিএসের নেতৃত্বে একাধিক সংস্কার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ডিজিটাল সরকারি সেবা, বিনিয়োগ ব্যবস্থাপনা, উন্নয়ন প্রকল্পের তদারকি এবং অর্থনৈতিক খাতভিত্তিক লক্ষ্য নির্ধারণে নতুন কাঠামো গড়ে তোলা হয়েছে।

বিশেষ করে সরকারি বিনিয়োগ তহবিলের (পিআইএফ) মাধ্যমে বড় প্রকল্প পরিচালনা এবং নতুন অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার উদ্যোগ রাষ্ট্রের উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নে গতি এনেছে।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের (সিএসআইএস) ৬ জুলাই ২০২৬-এর গবেষণায় সৌদি আরবের ডিজিটাল সরকারি সেবা, অর্থনৈতিক বৈচিত্র্য ও প্রশাসনিক সক্ষমতার অগ্রগতির বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে।

তবে সিদ্ধান্ত গ্রহণের গতি বাড়লেও ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ ও প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহির ঘাটতি নিয়ে বিতর্ক রয়েছে।

৫. আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে প্রভাব ও বহুমুখী সম্পর্ক

এমবিএসের নেতৃত্বে সৌদি আরব যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঐতিহ্যগত সম্পর্ক বজায় রাখার পাশাপাশি চীন, রাশিয়া, ভারত, ইউরোপ ও এশিয়ার বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সম্পর্ক সম্প্রসারণ করেছে।

২০২৩ সালে চীনের মধ্যস্থতায় সৌদি আরব ও ইরানের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনঃপ্রতিষ্ঠার উদ্যোগ মধ্যপ্রাচ্যের কূটনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হয়।

এ ছাড়া আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ, জ্বালানি বাজার, আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও বহুপক্ষীয় আলোচনায় সৌদি আরবের ভূমিকা বেড়েছে। ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বিনিয়োগ ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা সম্প্রসারণের উদ্যোগও দেশটির কূটনৈতিক অবস্থানকে আলোচনায় এনেছে।

এর ফলে আন্তর্জাতিক দর-কষাকষিতে সৌদি আরবের সক্ষমতা বেড়েছে। তবে আঞ্চলিক সংঘাত ও নিরাপত্তা সংকট মোকাবিলায় দেশটির কূটনৈতিক কৌশল এখনো বড় পরীক্ষার মুখে রয়েছে।

নেতৃত্বের নেতিবাচক পাঁচ দিক৬. রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অতিরিক্ত কেন্দ্রীকরণ

এমবিএসের নেতৃত্বের অন্যতম সমালোচিত দিক হলো রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা তাঁর হাতে কেন্দ্রীভূত হওয়া। রাজপরিবারের প্রতিদ্বন্দ্বী সদস্য, প্রভাবশালী ব্যবসায়ী ও সাবেক কর্মকর্তাদের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে তিনি নিজের অবস্থান সুসংহত করেছেন।

২০১৭ সালে রিয়াদের রিটজ-কার্লটন হোটেলে রাজপরিবারের সদস্য, ব্যবসায়ী ও সাবেক কর্মকর্তাদের আটক করা হয়। সৌদি সরকার অভিযানটিকে দুর্নীতিবিরোধী পদক্ষেপ হিসেবে ব্যাখ্যা করলেও আটক ব্যক্তিদের অধিকার, সম্পদ হস্তান্তরে চাপ প্রয়োগ এবং যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছিল কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।

কার্নেগি এনডাওমেন্টের ১০ মার্চ ২০২৫-এর বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ভিশন ২০৩০ বাস্তবায়নের মাধ্যমে প্রশাসনিক সমন্বয় বাড়লেও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ব্যক্তিকেন্দ্রীকরণ ত্বরান্বিত হয়েছে।

এর ফলে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হলেও স্বাধীন মতামত, প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি ও ক্ষমতার ভারসাম্য ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

৭. মানবাধিকার ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় সীমাবদ্ধতা

সৌদি আরবে অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংস্কার এগোলেও রাজনৈতিক স্বাধীনতার ক্ষেত্রে একই ধরনের অগ্রগতি দেখা যায়নি। সরকারের সমালোচনা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিন্নমত প্রকাশ এবং মানবাধিকার নিয়ে কাজ করা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের ২০২৫ সালের সৌদি আরববিষয়ক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শান্তিপূর্ণ মতপ্রকাশের কারণে সমালোচক ও মানবাধিকারকর্মীরা দীর্ঘমেয়াদি কারাদণ্ড, অন্যায্য বিচার এবং ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার মুখোমুখি হয়েছেন। একই প্রতিবেদনে ২০২৫ সালে দেশটিতে রেকর্ডসংখ্যক মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বিষয়টিও উল্লেখ করা হয়েছে।

এতে সৌদি আরবের আধুনিকায়ন পরিকল্পনার একটি বড় সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট হয়। নাগরিকদের জীবনযাত্রা ও অর্থনৈতিক সুযোগে পরিবর্তন এলেও রাজনৈতিক অধিকার, সংগঠন করার স্বাধীনতা এবং সরকারের সমালোচনার অধিকার এখনো সংকুচিত।

৮. জামাল খাশোগি হত্যাকাণ্ডে আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত

২০১৮ সালের ২ অক্টোবর তুরস্কের ইস্তাম্বুলে সৌদি কনস্যুলেটের ভেতরে সাংবাদিক ও ওয়াশিংটন পোস্টের কলাম লেখক জামাল খাশোগি হত্যাকাণ্ড আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সৌদি আরবের ভাবমূর্তিতে বড় ধাক্কা দেয়।

যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় গোয়েন্দা পরিচালকের দপ্তর ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত এক মূল্যায়নে বলেছিল, খাশোগিকে আটক বা হত্যার অভিযানে এমবিএস অনুমোদন দিয়েছিলেন বলে তাদের ধারণা। সৌদি নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা সংস্থার ওপর তাঁর নিয়ন্ত্রণ এবং অভিযানে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভূমিকার ভিত্তিতে এ মূল্যায়ন করা হয়। তবে এমবিএস হত্যাকাণ্ডে নিজের দায় অস্বীকার করেছেন।

জাতিসংঘের বিশেষ প্রতিবেদক অ্যাগনেস ক্যালামার্ডের ২০১৯ সালের তদন্তেও হত্যাকাণ্ডে সৌদি রাষ্ট্রের দায় এবং উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের ভূমিকা নিয়ে অধিকতর তদন্তের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়েছিল।

ঘটনাটি প্রমাণ করে, আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ, ক্রীড়া আয়োজন ও উন্নয়ন প্রকল্পের মাধ্যমে কোনো দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করার চেষ্টা করা হলেও মানবাধিকার ও জবাবদিহির প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব নয়।

৯. ইয়েমেন যুদ্ধ ও মানবিক বিপর্যয়ের দায়

২০১৫ সালে সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট ইয়েমেনে হুথি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরু করে। সে সময় সৌদি আরবের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ছিলেন এমবিএস। পরবর্তী সময়ে দেশটির প্রধান নীতিনির্ধারক হিসেবে তিনি আঞ্চলিক সামরিক ও নিরাপত্তানীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

দীর্ঘস্থায়ী এই সংঘাত ইয়েমেনকে বিশ্বের অন্যতম ভয়াবহ মানবিক সংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছে। জাতিসংঘের ২০২৬ সালের জুনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশটির ২ কোটি ১০ লাখের বেশি মানুষের মানবিক সহায়তা প্রয়োজন। প্রায় ১ কোটি ৮৩ লাখ মানুষ তীব্র খাদ্যনিরাপত্তাহীনতায় রয়েছেন এবং পাঁচ বছরের কম বয়সী ২২ লাখ শিশু তীব্র অপুষ্টিতে ভুগছে।

অবশ্য ইয়েমেনের মানবিক বিপর্যয়ের জন্য শুধু সৌদি আরবকে দায়ী করা যায় না। হুথি বাহিনী, ইয়েমেনের বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামরিক পক্ষ, আঞ্চলিক শক্তি এবং আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপ—সব মিলিয়ে সংঘাত দীর্ঘায়িত হয়েছে। তবে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের বিমান হামলা ও সামরিক অভিযানে বেসামরিক মানুষের প্রাণহানি এবং অবকাঠামো ধ্বংসের অভিযোগ রয়েছে।

এ সংঘাত দেখিয়েছে, সামরিক শক্তি দিয়ে আঞ্চলিক প্রভাব প্রতিষ্ঠার চেষ্টা দীর্ঘমেয়াদে নিরাপত্তা সংকট ও মানবিক বিপর্যয় সৃষ্টি করতে পারে।

১০. উচ্চাভিলাষী মেগা প্রকল্পে ব্যয় ও অর্থনৈতিক ঝুঁকি

এমবিএসের ভিশন ২০৩০-এর অন্যতম উচ্চাভিলাষী উদ্যোগ নিওম প্রকল্প। এর আওতায় দ্য লাইন, অক্সাগন ও ট্রোজেনার মতো ভবিষ্যৎনির্ভর নগর ও অবকাঠামো প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি পর্যটন, খেলাধুলা ও বিনোদন খাতে বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করা হচ্ছে।

তবে এসব প্রকল্পের বিপুল ব্যয়, বাস্তবায়নযোগ্যতা, বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং প্রত্যাশিত আয় নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

রয়টার্সের ১৪ আগস্ট ২০২৫-এর এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে সৌদি আরবের সরকারি বিনিয়োগ তহবিলের বার্ষিক প্রতিবেদনের বরাতে বড় প্রকল্পগুলোর হিসাবি মূল্য প্রায় ৮০০ কোটি ডলার কমে যাওয়ার তথ্য তুলে ধরা হয়। ব্যয় বৃদ্ধি, প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্ব এবং বাজার পরিস্থিতির পরিবর্তন এর পেছনে ভূমিকা রেখেছে।

এ ছাড়া সেমাফোরের ২০২৬ সালের জুনের এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে নিওমের কিছু চুক্তি বাতিল ও প্রকল্প পুনর্বিন্যাসের সম্ভাব্য ব্যয় নিয়ে আলোচনা করা হয়।

আইএমএফের ২০২৬ সালের মূল্যায়নেও সৌদি আরবের বাজেট ও চলতি হিসাবের ঘাটতি নিয়ন্ত্রণ, বিনিয়োগের দক্ষতা বাড়ানো এবং তেলনির্ভরতা আরও কমানোর প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়েছে।

ফলে প্রশ্ন উঠেছে, উচ্চাভিলাষী উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তব অর্থনৈতিক সক্ষমতা, বিনিয়োগের চাহিদা ও বাজার পরিস্থিতির সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ।

সংস্কারক নাকি ক্ষমতাকেন্দ্রিক শাসক?

এমবিএসের নেতৃত্বে সৌদি আরবের অর্থনীতি ও সমাজে যে পরিবর্তন এসেছে, তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। তেলনির্ভর অর্থনীতির বিকল্প তৈরি, নারীর কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, পর্যটন ও বিনোদনশিল্পের বিকাশ এবং আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ আকর্ষণের উদ্যোগ দেশটিকে নতুন সম্ভাবনার দিকে নিয়ে যাচ্ছে।

তবে অর্থনৈতিক আধুনিকায়নের সঙ্গে রাজনৈতিক উদারীকরণ, মানবাধিকার ও আইনের শাসনের সমান অগ্রগতি ঘটেনি। রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণে গতি এলেও ক্ষমতার জবাবদিহি, স্বাধীন মতপ্রকাশ এবং রাজনৈতিক অধিকার এখনো বড় প্রশ্ন হয়ে রয়েছে।

এ ছাড়া সৌদি আরবের পরিবর্তনকে শুধু এমবিএসের ব্যক্তিগত কৃতিত্ব হিসেবে দেখাও যথাযথ নয়। দেশটির বিপুল তেলসম্পদ, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, তরুণ জনগোষ্ঠী, সরকারি বিনিয়োগ তহবিল এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারত্বও এই রূপান্তরের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।

সব মিলিয়ে এমবিএস একই সঙ্গে একজন উচ্চাকাঙ্ক্ষী সংস্কারক এবং বিতর্কিত ক্ষমতাকেন্দ্রিক শাসক। তাঁর নেতৃত্বে সৌদি আরব অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তনের পথে এগোলেও মানবাধিকার, রাজনৈতিক স্বাধীনতা, ক্ষমতার ভারসাম্য এবং আঞ্চলিক সামরিক নীতির প্রশ্নে সমালোচনা অব্যাহত রয়েছে।

তাঁর নেতৃত্বের দীর্ঘমেয়াদি সাফল্য নির্ভর করবে তেলনির্ভরতা কতটা কমানো যায়, বেসরকারি খাতকে কতটা স্বনির্ভর করা সম্ভব হয়, নারীর অর্থনৈতিক অংশগ্রহণকে কতটা কার্যকর সমতায় রূপ দেওয়া যায় এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার সঙ্গে জবাবদিহির ভারসাম্য কতটা প্রতিষ্ঠিত হয় তার ওপর।

শেষ পর্যন্ত ইতিহাসে এমবিএসের অবস্থান শুধু তাঁর নির্মিত মেগা প্রকল্প, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কিংবা আন্তর্জাতিক প্রভাব দিয়ে নির্ধারিত হবে না; বরং সৌদি আরবে নাগরিক অধিকার, আইনের শাসন ও রাজনৈতিক জবাবদিহি প্রতিষ্ঠায় তাঁর নেতৃত্ব কতটা ভূমিকা রাখতে পারে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে থাকবে।

তথ্যসূত্র: আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ), ২০২৬ সালের সৌদি আরববিষয়ক মূল্যায়ন; সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ (সিএসআইএস), ৬ জুলাই ২০২৬; কার্নেগি এনডাওমেন্ট, ১০ মার্চ ২০২৫; অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, ২০২৫ সালের সৌদি আরববিষয়ক প্রতিবেদন; যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় গোয়েন্দা পরিচালকের দপ্তর, ফেব্রুয়ারি ২০২১; জাতিসংঘের বিশেষ প্রতিবেদক অ্যাগনেস ক্যালামার্ডের প্রতিবেদন, ২০১৯; জাতিসংঘের ইয়েমেনবিষয়ক মানবিক পরিস্থিতির প্রতিবেদন, জুন ২০২৬; রয়টার্স, ১৪ আগস্ট ২০২৫; সেমাফোর, জুন ২০২৬।




কমেন্ট করুন:

ফেসবুকে আমরা
সর্বশেষ সংবাদ
Sidebar Ad