বাংলাদেশে কোন রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় রয়েছে, সেটি বিবেচনায় না নিয়ে দেশের সব প্রধান রাজনৈতিক দলের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতে আগ্রহী চীন। বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তার প্রশ্নে দুই দেশের রাজনৈতিক দর্শনে অভিন্নতা রয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন চীনের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিসি) কেন্দ্রীয় কমিটির আন্তর্জাতিক বিভাগের মন্ত্রী লিউ হাইশিং। তিনি বলেছেন, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে অভিজ্ঞতা বিনিময় ও পারস্পরিক সহযোগিতা বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করতে পারে।
বুধবার ঢাকায় বাংলাদেশ-চীন পার্টি অ্যান্ড স্টেট গভর্ন্যান্স স্টাডিজ সেন্টারের উদ্বোধন এবং ‘যেখানে ইতিহাস ভবিষ্যৎকে আলোকিত করে: চীন-বাংলাদেশ রাজনৈতিক দল প্লাস’ শীর্ষক সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনকালে এসব কথা বলেন লিউ হাইশিং।
ঢাকায় চীনা দূতাবাসের চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স ড. লিউ ইউয়িনের পরিচালনায় অনুষ্ঠিত সেমিনারে প্রধান অতিথি ছিলেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী আহমেদ। এতে জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার, জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম, বাংলাদেশ-চায়না চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি খোরশেদ আলম, ইনকিলাব সম্পাদক এ এম এম বাহাউদ্দীন এবং অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ বক্তব্য দেন।
এ ছাড়া প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা নজরুল ইসলাম খান, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম, বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এয়ার ভাইস মার্শাল (অব.) আলতাফ হোসেন চৌধুরীসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা ও সংসদ সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।
লিউ হাইশিং বলেন, বাংলাদেশের সঙ্গে চীনের সম্পর্ক কেবল সরকারকেন্দ্রিক নয়; বরং রাজনৈতিক দল, সরকার, ব্যবসায়ী, গবেষক, গণমাধ্যম ও সামাজিক সংগঠনগুলোর মধ্যে যোগাযোগ বাড়ানোর মধ্য দিয়ে এ সম্পর্ককে বহুমাত্রিক পর্যায়ে নেওয়া সম্ভব। ক্ষমতায় কোন দল রয়েছে, তা বিবেচনায় না নিয়ে বাংলাদেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতে চায় বেইজিং।
চীনা মন্ত্রী জানান, গত পাঁচ দশকে বাংলাদেশ ও চীনের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ১ কোটি ৫০ লাখ ডলার থেকে বেড়ে ২ হাজার ৩০০ কোটি ডলারে পৌঁছেছে। বাংলাদেশের সড়ক, সেতু ও টানেলসহ বিভিন্ন অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়নে চীনের সহযোগিতা দুই দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখছে।
তিনি বলেন, তিস্তা নদী পুনরুদ্ধার ও সমন্বিত ব্যবস্থাপনা এবং মোংলা বন্দর শিল্পপার্কের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প বাস্তবায়নে অগ্রগতি দুই দেশের জনগণের জন্য সুফল বয়ে আনবে বলে চীন আশা করে। নতুন উদ্বোধন হওয়া বাংলাদেশ-চীন পার্টি অ্যান্ড স্টেট গভর্ন্যান্স স্টাডিজ সেন্টার দুই দেশের শাসনব্যবস্থা, নীতি ও উন্নয়ন অভিজ্ঞতা বিনিময়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
চীনের নীতিকে সমর্থন বিএনপি-জামায়াত-এনসিপিরসেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী আহমেদ বলেন, বিএনপি বাংলাদেশ ও চীনের রাজনৈতিক সম্পর্ককে বিশেষ গুরুত্ব দেয়। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান দুই দেশের সম্পর্কের ভিত্তি রচনা করেছিলেন। পরবর্তী সময়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া সেই সম্পর্ককে এগিয়ে নেন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরের মধ্য দিয়ে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের ব্যাপারে চীনের নীতিকে বিএনপি গুরুত্বের সঙ্গে সমর্থন করে। চীন বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান বাণিজ্যিক ও উন্নয়ন সহযোগী। ‘এক চীন’ নীতির প্রতি বাংলাদেশের সমর্থন অকুণ্ঠ। লিউ হাইশিংয়ের সফর দুই দেশের সম্পর্কে নতুন মাত্রা যোগ করবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, বাংলাদেশ-চীন বন্ধুত্বের ক্ষেত্রে দুই দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর পারস্পরিক সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ। সরকার পরিবর্তন হলেও রাজনৈতিক দলগুলোর কার্যক্রম অব্যাহত থাকে। দারিদ্র্য বিমোচন, জনকল্যাণ ও রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে চীনের সর্বাত্মক সমর্থন ও সহযোগিতা কামনা করেন তিনি।
এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, চীনের সঙ্গে সম্পর্কের প্রশ্নে বাংলাদেশের সব রাজনৈতিক দল একই অবস্থানে রয়েছে। অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার চীনা নীতি বাংলাদেশের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শান্তিপূর্ণ ও স্থিতিশীল বাংলাদেশ গড়ে তুলতে দুই দেশের নতুন প্রজন্মের মধ্যে অংশীদারত্ব প্রতিষ্ঠার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
রাষ্ট্রপতির সঙ্গে বৈঠক, সহযোগিতা বাড়ানোর আশ্বাসবুধবার বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন লিউ হাইশিং। এ সময় রাষ্ট্রপতি চীনকে বাংলাদেশের বিশ্বস্ত বন্ধু ও গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অংশীদার হিসেবে উল্লেখ করে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরও জোরদারের আহ্বান জানান।
রাষ্ট্রপতি মোংলা বন্দর আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণ প্রকল্পের ফ্রেমওয়ার্ক চুক্তি স্বাক্ষর এবং চায়না ইকোনমিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের বিষয়টি তুলে ধরেন। এসব উদ্যোগ বাংলাদেশের যোগাযোগব্যবস্থা, শিল্পায়ন ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
কুনমিং ও চট্টগ্রামকে সংযুক্ত করার প্রস্তাবিত করিডোর এবং চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক করিডোরসহ আঞ্চলিক যোগাযোগব্যবস্থা সম্প্রসারণে চীনের উদ্যোগকে স্বাগত জানান রাষ্ট্রপতি। একই সঙ্গে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংকে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানান তিনি।
জবাবে লিউ হাইশিং সবুজ জ্বালানি, শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক বিনিময়সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা অব্যাহত রাখার আশ্বাস দেন। বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী জেনারেল হাসপাতালের অর্থায়ন ও নির্মাণে সহযোগিতার বিষয়টিও আলোচনায় উঠে আসে। রোহিঙ্গাদের নিরাপদ প্রত্যাবাসনে চীনের সক্রিয় ভূমিকা অব্যাহত রাখার প্রত্যাশা জানালে লিউ হাইশিং সহযোগিতা অব্যাহত রাখার আশ্বাস দেন।
রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে চীনের সহযোগিতা চাইলেন প্রধানমন্ত্রীবুধবার প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন লিউ হাইশিং। এ সময় তিনি চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের শুভেচ্ছা প্রধানমন্ত্রীর কাছে পৌঁছে দেন। জবাবে প্রধানমন্ত্রীও শি জিনপিং ও চীনের প্রধানমন্ত্রী লি ছিয়াংকে শুভেচ্ছা জানান।
বৈঠকে লিউ হাইশিং বলেন, প্রধানমন্ত্রীর বেইজিং সফরের সময় দুই দেশের ভবিষ্যৎ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক নিয়ে যে যৌথ ঘোষণা দেওয়া হয়েছে, তার আলোকে সহযোগিতার ক্ষেত্রগুলো আরও সম্প্রসারণে চীন আগ্রহী। বাংলাদেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতিতে চীনের সমর্থন অব্যাহত থাকবে। ঢাকার প্রতি বেইজিংয়ের অঙ্গীকার অপরিবর্তিত রয়েছে বলেও জানান তিনি।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সময় বাংলাদেশ-চীন সম্পর্কের ভিত্তি স্থাপিত হয়। দীর্ঘদিন ধরে দুই দেশের জনগণের মধ্যে এ সম্পর্কের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। ঐতিহাসিক বন্ধুত্বের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে তা এগিয়ে নেওয়া বর্তমান প্রজন্মের দায়িত্ব।
বৈঠকে চীনের কমিউনিস্ট পার্টি ও বিএনপির মধ্যে দলীয় পর্যায়ে যোগাযোগ ও সহযোগিতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়। লিউ হাইশিং বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদলকে চীন সফরের আমন্ত্রণ জানান।
এ ছাড়া বাংলাদেশ-চীন-মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডোর এবং আঞ্চলিক সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব (আরসিইপি)-এ বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তির বিষয়েও আলোচনা হয়। আরসিইপিতে বাংলাদেশের যোগদানের প্রতি চীনের সমর্থনের কথা জানান লিউ হাইশিং।
বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী ১৩ লাখ রোহিঙ্গার দীর্ঘদিনের অবস্থানের কারণে বাংলাদেশের অর্থনীতি, সমাজ, জনমিতি ও পরিবেশের ওপর সৃষ্ট চাপের বিষয়টি তুলে ধরেন। এ সংকটের টেকসই সমাধান এবং রোহিঙ্গাদের নিরাপদ প্রত্যাবাসনে চীনের সহযোগিতা কামনা করেন তিনি।
জবাবে লিউ হাইশিং বলেন, চীন রোহিঙ্গা সংকট সম্পর্কে অবগত রয়েছে। এ বিষয়ে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর উদ্বেগের কথা তিনি চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংকে অবহিত করবেন।
উল্লেখ্য, তিন দিনের সফরে মঙ্গলবার রাতে ঢাকায় আসেন চীনের কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির আন্তর্জাতিক বিভাগের এই মন্ত্রী। সফরকালে তিনি প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির সঙ্গে বৈঠক ছাড়াও সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার কবরে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।

প্রথম দর্পণ,জাতীয় ডেস্ক