শহীদ পরিবারের প্রধান দাবি বিচার, সংসদে রোকেয়া বেগমের আবেগঘন বক্তব্য

Banner Ad
https://prothomdorpan.com/admin/fav-icon-logo/image/1761146741.250..125.jpg

জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নিহতদের হত্যাকাণ্ডের দৃশ্যমান ও দ্রুত বিচার নিশ্চিত না হলে ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার সম্পূর্ণ অবসান সম্ভব নয় বলে মন্তব্য করেছেন জুলাই বিপ্লবের শহীদ জাবির ইব্রাহিমের মা এবং জামায়াতে ইসলামীর সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য রোকেয়া বেগম।

সোমবার জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি বলেন, শহীদ পরিবারগুলোর সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা হলো হত্যাকাণ্ডের বিচার নিশ্চিত করা এবং বিচার কার্যক্রমের অগ্রগতি নিয়মিতভাবে সংসদকে অবহিত করা।

বক্তব্যের শুরুতে নিজের ছেলে জাবির ইব্রাহিমের স্মৃতিচারণ করে রোকেয়া বেগম বলেন, ৫ আগস্ট গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে তার ছেলে মৃত্যুবরণ করে। আবেগঘন কণ্ঠে তিনি বলেন, “আমার সন্তানের মতো অসংখ্য শহীদের রক্তের বিনিময়ে আজ জাতীয় সংসদে স্বাধীনভাবে বাজেট আলোচনা সম্ভব হয়েছে।”

তিনি বলেন, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে জুলাই শহীদ পরিবারের জন্য মাসিক ভাতা, আহত যোদ্ধাদের জন্য শ্রেণিভিত্তিক ভাতা এবং আবাসন সহায়তায় ৩০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। তবে আর্থিক সহায়তার পাশাপাশি বিচার নিশ্চিত করাই শহীদ পরিবারগুলোর প্রধান দাবি।

রোকেয়া বেগম সংসদে জানান, আইনমন্ত্রীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী জুলাইয়ের মানবতাবিরোধী অপরাধের ঘটনায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে ৮০টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে সাতটির রায় হয়েছে, ২২টির সাক্ষ্যগ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে এবং ৫১টি মামলা তদন্তাধীন রয়েছে।

তিনি বলেন, প্রায় দুই বছরে মাত্র সাতটি মামলার রায় হওয়া বিচার প্রক্রিয়ার ধীরগতির ইঙ্গিত দেয়। মামলাগুলোতে মোট ৪৬৩ জন আসামির মধ্যে ১৭৪ জন গ্রেপ্তার হলেও ২৮৮ জন এখনও পলাতক রয়েছেন। পলাতকদের গ্রেপ্তারে অগ্রগতির বিষয়ে জানতে চেয়ে তিনি প্রতিটি অধিবেশনে বিচার কার্যক্রমের হালনাগাদ তথ্য সংসদে উপস্থাপনের দাবি জানান।

শহীদদের স্বীকৃতির প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নিহতের সংখ্যা এক হাজারের বেশি হলেও এখন পর্যন্ত ৮৩৪ জনকে গেজেটভুক্ত করা হয়েছে। আরও প্রায় ৫০ জন শহীদের নাম এখনও তালিকাভুক্ত হয়নি। সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে বাকি শহীদ ও আহতদের স্বীকৃতি প্রদানের উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

আহত যোদ্ধাদের শ্রেণিবিন্যাস নিয়েও প্রশ্ন তোলেন রোকেয়া বেগম। তিনি বলেন, গুরুতর অঙ্গহানির শিকার ব্যক্তিদের নিম্ন শ্রেণিতে অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন। এ বিষয়ে যথাযথ তদন্ত ও পুনর্মূল্যায়নের দাবি জানান তিনি।

সংসদ সদস্য জানান, বর্তমানে ৮৩৪ জন শহীদ এবং ১৪ হাজার ৪০৭ জন আহত যোদ্ধা রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পেয়েছেন। তিনি বলেন, এসব সংখ্যা কেবল পরিসংখ্যান নয়; প্রতিটির পেছনে রয়েছে একটি করে ক্ষতবিক্ষত পরিবার।

জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশনের কার্যক্রমের প্রশংসা করে তিনি বলেন, প্রতিষ্ঠানটি এ পর্যন্ত ৮৩১টি শহীদ পরিবার ও ৬২৭ জন আহত যোদ্ধাকে প্রায় ১২০ কোটি টাকা সহায়তা প্রদান করেছে। তবে গত তিন মাস ধরে ফাউন্ডেশনের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বেতন ও উৎসব ভাতা না পাওয়ার বিষয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি।

এ সময় তিনি ফাউন্ডেশনের জন্য পৃথক আর্থিক কোডের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় বরাদ্দ নিশ্চিত করা, সরকারের প্রতিশ্রুত অবশিষ্ট ২৬৩ কোটি টাকা দ্রুত ছাড় করা এবং ফাউন্ডেশনকে সরকারি সহযোগী প্রতিষ্ঠান হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার দাবি জানান।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বাস্তব জীবনে জুলাই যোদ্ধাদের বিরুদ্ধে হুমকি ও হয়রানির অভিযোগ তুলে রোকেয়া বেগম তাদের জন্য রাজনৈতিক ও আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করার বিষয়েও সরকারের অবস্থান স্পষ্ট করার আহ্বান জানান।

পরে তার বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে সংসদে বিবৃতি দেন আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। তিনি বলেন, শহীদ পরিবারের অনুভূতি ও প্রত্যাশা সরকারের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জুলাই যোদ্ধাদের সুরক্ষায় সরকার আইনি কাঠামোর মধ্যেই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে এবং ভবিষ্যতেও আইনগত পরিসরের মধ্যে থেকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত রয়েছে।

আইনমন্ত্রী আরও বলেন, জুলাইয়ের চেতনা ও গণঅভ্যুত্থানের অর্জন রক্ষায় সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং শহীদ পরিবার ও আহত যোদ্ধাদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে।




কমেন্ট করুন:

ফেসবুকে আমরা
সর্বশেষ সংবাদ
Sidebar Ad