যুক্তরাজ্যের গ্লাসগো বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক দীর্ঘ এক দশকেরও বেশি সময় ধরে ৯১ হাজারের বেশি মানুষের জীবনযাত্রা ও স্বাস্থ্যঝুঁকি পর্যবেক্ষণ করে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য পেয়েছেন। বিখ্যাত চিকিৎসা সাময়িকী ‘প্লস মেডিসিন’ (PLOS Medicine)-এ গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে।
প্রতি ঘণ্টার অলসতায় ঝুঁকি বাড়ে ১০%গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, প্রতিদিন এই ধরনের একটানা নিষ্ক্রিয় সময় এক ঘণ্টা করে বাড়লে ক্যানসারে মৃত্যুর ঝুঁকি আরও ১০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়। গবেষকরা ‘ইউকে বায়োব্যাংক’-এর অংশগ্রহণকারীদের পরিধানযোগ্য ডিভাইসের (Wearable Device) ডাটা বিশ্লেষণ করে গড়ে ১২ বছর ধরে এই পর্যবেক্ষণ চালিয়েছেন। পূর্বে দীর্ঘ সময় বসে থাকার সাথে হৃদরোগ বা ক্যানসারের সম্পর্কের কথা জানা থাকলেও, একটানা অলস সময় কীভাবে শরীরে ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে, তা এই গবেষণায় সুনির্দিষ্টভাবে উঠে এসেছে।
মুক্তির উপায়: সামান্য নড়াচড়াতবে এই আশঙ্কাজনক খবরের পাশাপাশি গবেষকরা একটি সহজ সমাধানের কথাও জানিয়েছেন। গবেষণা দলের প্রধান ড. ফ্রেডেরিক হো বলেন:
"আমাদের গবেষণায় দেখা গেছে যে একটানা ৩০ মিনিটের বেশি বসে থাকা ক্যানসারে মৃত্যুর উচ্চ ঝুঁকির সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। তবে সুখবর হলো, প্রতি ৩০ মিনিট পরপর অল্প সময়ের জন্য হাঁটার মতো সহজ শারীরিক নড়াচড়াও এই ঝুঁকি অনেকাংশে কমাতে সাহায্য করতে পারে।"
তিনি আরও উল্লেখ করেন, প্রচলিত স্বাস্থ্য নির্দেশিকাগুলোতে সবসময় মাঝারি বা উচ্চমাত্রার ভারী ব্যায়ামের ওপর জোর দেওয়া হয়। তবে সুস্থ থাকতে দৈনন্দিন জীবনের হালকা নড়াচড়াকেও সমান গুরুত্ব দেওয়া উচিত।
অলসতা কাটাতে যা করতে পারেন:গবেষণায় দেখা গেছে, দীর্ঘ সময় অলস বসে থাকার বদলে হালকা কিছু শারীরিক কর্মকাণ্ড করলে ক্যানসারে মৃত্যুর ঝুঁকি কমে। এর জন্য খুব কঠিন কোনো কসরতের প্রয়োজন নেই। উপকারী হালকা কাজের মধ্যে রয়েছে:
ধীরগতিতে সামান্য হাঁটাচলা করা। অফিসের কাজের ফাঁকে আধা ঘণ্টা পরপর সিট থেকে উঠে একটু দাঁড়ানো বা স্ট্রেচিং করা। ঘরের টুকিটাকি কাজ, কাপড় ইস্ত্রি করা বা বাসন ধোয়ার মতো দৈনন্দিন কাজ। পাঁচ মিনিটের ব্যায়ামেই মিলবে বড় সুফল!
গবেষকদের হিসাব অনুযায়ী, প্রতিদিনের নিষ্ক্রিয় সময় কমিয়ে সামান্য সক্রিয় হলে মৃত্যুর ঝুঁকি যেভাবে কমে:
নিষ্ক্রিয়তার পরিবর্তন
শারীরিক কর্মকাণ্ডের ধরন
ঝুঁকি হ্রাসের হার
১ ঘণ্টা হ্রাস
হালকা শারীরিক কর্মকাণ্ড (হাঁটা, ঘরের কাজ)
১২% ঝুঁকি কমে
৩০ মিনিট হ্রাস
মাঝারি মাত্রার ব্যায়াম (স্বাভাবিক গতিতে হাঁটা)
৮% ঝুঁকি কমে
মাত্র ৫ মিনিট হ্রাস
উচ্চমাত্রার ব্যায়াম
২২% ঝুঁকি কমে
বিশেষজ্ঞদের মতযদিও এটি একটি পর্যবেক্ষণভিত্তিক গবেষণা হওয়ায় সরাসরি কার্যকারণ সম্পর্ক এখনই শতভাগ নিশ্চিত করা সম্ভব নয় বলে গবেষকরা সতর্ক করেছেন। ওপেন ইউনিভার্সিটির ফলিত পরিসংখ্যান বিভাগের ইমেরিটাস অধ্যাপক কেভিন ম্যাককনওয়ে বলেন, এই ফলাফলগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, তবে বিষয়টি আরও গভীরভাবে নিশ্চিত করতে ভবিষ্যতে আরও বিস্তৃত ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল বা গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে।
তাই সুস্থ থাকতে এবং ক্যানসারের মতো মরণব্যাধির ঝুঁকি এড়াতে এখন থেকেই সচেতন হোন। ঘড়ির কাঁধের দিকে নজর রাখুন—আধা ঘণ্টা পার হলেই আসন ছেড়ে একটু উঠে দাঁড়ান, নিজেকে সচল রাখুন। (তথ্যসূত্র: দ্য গার্ডিয়ান)

প্রথম দর্পণ,ডেস্ক