জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নিহত কিশোর আদিলের শেষ দিনের স্মৃতি আজও তাড়িয়ে বেড়ায় তার পরিবারকে। মৃত্যুর আগের দিন মায়ের কাছে নিজের পরিচয়পত্র (আইডি কার্ড) চেয়েছিল সে। কারণ, আন্দোলনে কেউ নিহত হলে যেন সহজেই তার পরিচয় শনাক্ত করা যায়। কিন্তু ছেলেকে বাইরে যেতে না দেওয়ার আশায় মা আইডি কার্ডটি লুকিয়ে রাখেন। পরদিন আন্দোলনে গিয়ে গুলিবিদ্ধ হয়ে প্রাণ হারায় আদিল। পরিচয়পত্র সঙ্গে না থাকায় তাকে শনাক্ত করতেও দেরি হয়।
সোমবার (৭ জুলাই) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে এক আবেগঘন স্ট্যাটাসে শহীদ আদিলের বাবা আবুল কালামের স্মৃতিচারণ তুলে ধরেন এনসিপির সাবেক নেত্রী ডা. তাসনিম জারা। সেখানে আদিলের শেষ দিনের ঘটনাগুলো এবং নতুন বাংলাদেশের জন্য তার বাবার তিনটি প্রত্যাশার কথাও উল্লেখ করা হয়।
তাসনিম জারা জানান, আদিল তখন দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী। ২০২৫ সালে তার দাখিল পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার কথা ছিল। আন্দোলনের উত্তাল সময়ের একদিন আগে সে মাকে প্রশ্ন করেছিল, ‘এত মানুষ মারা যাচ্ছে, তাদের পরিচয় মানুষ কীভাবে জানে?’ জবাবে মা বলেছিলেন, পরিচয়পত্র দেখে।
পরদিন সকালে আদিল মায়ের কাছে আইডি কার্ড চায়। কিন্তু ছেলের নিরাপত্তার কথা ভেবে মা সেটি লুকিয়ে ফেলেন এবং কঠোরভাবে বাইরে যেতে নিষেধ করেন। আদিল মাকে আশ্বস্ত করে জানায়, সে বাইরে যাবে না, শুধু ছাদে যাবে।
বের হওয়ার আগে মাকে বলেছিল, ‘আম্মু, আজ সন্ধ্যায় আমরা গ্রিল খাব।’ সংসারে আর্থিক সংকটের কথা জানালে নিজের জমানো টাকা থেকে ৫০০ টাকার একটি নোট মায়ের হাতে তুলে দেয়। সেই নোটটি আজও ছেলের স্মৃতি হিসেবে আগলে রেখেছেন মা।
কিন্তু ছাদে যাওয়ার কথা বলে আদিল নেমে যায় রাজপথে। আন্দোলনে অংশ নেওয়ার সময় গুলিবিদ্ধ হয় সে। পরিচয়পত্র সঙ্গে না থাকায় তাকে দ্রুত শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। পরে আন্দোলনকারীদের সহায়তায় তাকে বাসায় আনা হলেও ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে যায়। হাসপাতালে নেওয়ার আগেই তার মৃত্যু হয়।
এই ঘটনার পর থেকে আদিলের মা এক গভীর অনুশোচনায় ভোগেন। তার বিশ্বাস, পরিচয়পত্রটি সঙ্গে থাকলে হয়তো দ্রুত পরিচয় নিশ্চিত করা যেত, দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া সম্ভব হতো, আর হয়তো ছেলেটিকে বাঁচানোর সামান্য হলেও সুযোগ তৈরি হতে পারত।
পরিবারের সদস্যরা জানান, আদিলের এক হাতের কব্জিতে এবং পিঠে জাতীয় পতাকা বাঁধা ছিল। এতে তারা বুঝতে পারেন, আন্দোলনে অংশ নেওয়ার জন্য সে আগেই নিজেকে মানসিকভাবে প্রস্তুত করেছিল।
তিন ভাইয়ের মধ্যে আদিল ছিল একজন। বড় ভাই বিদেশে উচ্চশিক্ষায় ছিলেন। পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য, আজও কেউ জানতে চাইলে তারা কত ভাই—এই প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে তারা থমকে যান।
নতুন বাংলাদেশের কাছে নিজের কোনো ব্যক্তিগত দাবি না জানিয়ে শহীদ আদিলের বাবা তিনটি প্রত্যাশার কথা তুলে ধরেছেন।
তার প্রথম দাবি, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদদের কোনো রাজনৈতিক দলের সম্পত্তি হিসেবে দেখানো যাবে না। তারা দেশের জন্য জীবন দিয়েছেন, তাই তারা পুরো জাতির।
দ্বিতীয়ত, বিচারব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ স্বাধীন করতে হবে, যাতে সাধারণ মানুষ সহজে ন্যায়বিচার পান।
তৃতীয়ত, একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন গঠন করতে হবে, যাতে দেশে অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন নিশ্চিত হয়।
আদিলের বাবার ভাষায়, শহীদদের আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে দেশ একটি নতুন সম্ভাবনার সামনে দাঁড়িয়েছে। সেই আত্মত্যাগের মর্যাদা রক্ষা করে ন্যায়ভিত্তিক ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ে তোলাই হওয়া উচিত জাতির প্রধান দায়িত্ব।

প্রথম দর্পণ,ডেস্ক