বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফার সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো বর্তমানে তার নেতৃত্বের সবচেয়ে বড় সংকটের মুখে পড়েছেন। অল্প কিছুদিন আগেও তিনি প্রায় বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় চতুর্থ মেয়াদে নির্বাচিত হওয়ার পথে ছিলেন। তবে বিশ্বকাপসহ ফিফার প্রধান প্রতিযোগিতাগুলোর বাণিজ্যিক স্বত্বের একটি অংশ বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের কাছে হস্তান্তরের পরিকল্পনা প্রকাশের পর পরিস্থিতি নাটকীয়ভাবে বদলে যায়।
বিতর্কিত পরিকল্পনাটি শেষ পর্যন্ত প্রত্যাহার করা হলেও সমালোচনা থামেনি। ইউরোপীয় ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা উয়েফা প্রকাশ্যে ইনফান্তিনোর নেতৃত্বের ওপর অনাস্থা জানিয়েছে। একই সঙ্গে উত্তর ও মধ্য আমেরিকার ফুটবল সংস্থা কনকাকাফ এবং এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশন (এএফসি)ও তার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। ফলে এখন প্রশ্ন উঠেছে—ইনফান্তিনো নিজে পদত্যাগ করবেন, নাকি ভোটের মাধ্যমে তাকে অপসারণ করা হবে?
গত সপ্তাহে ফিফা ‘ফিফা ফরোয়ার্ড এন্টারপ্রাইজ’ (এফএফই) নামে একটি নতুন বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান গঠনের পরিকল্পনা প্রকাশ করে। প্রায় ২০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার মূল্যমানের এই প্রতিষ্ঠানের সংখ্যালঘু মালিকানা বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের কাছে বিক্রি করে প্রায় ৪.২ বিলিয়ন ডলার সংগ্রহের লক্ষ্য ছিল সংস্থাটির। প্রতিষ্ঠানটি বিশ্বকাপ ও ক্লাব বিশ্বকাপের মতো বড় টুর্নামেন্টের বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালনা করত। সংখ্যাগরিষ্ঠ মালিকানা ফিফার কাছেই থাকলেও সদস্য দেশগুলোকে আর্থিক সুবিধা দেওয়ার প্রতিশ্রুতির বিনিময়ে বিনিয়োগকারীদের অংশীদার করার পরিকল্পনা করা হয়েছিল।
তবে পরিকল্পনাটি ঘোষণার পরই ফিফার ভেতরে ও বাইরে তীব্র প্রতিক্রিয়া শুরু হয়। সবচেয়ে কঠোর অবস্থান নেয় উয়েফা। তারা বিশ্বকাপ বয়কটের হুঁশিয়ারি দিয়ে জানায়, এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে ফিফার সঙ্গে সম্পর্ক নতুন করে মূল্যায়ন করা হবে। পরে কনকাকাফও বিষয়টির পূর্ণাঙ্গ পর্যালোচনার দাবি জানায়। এরপর এএফসিও উয়েফা ও কনকাকাফের অবস্থানের প্রতি সমর্থন জানায়। ফলে পরিকল্পনার পক্ষে প্রয়োজনীয় সমর্থন পাওয়ার সম্ভাবনা কার্যত শেষ হয়ে যায়।
ফিফার অভ্যন্তরেও দেখা দেয় নজিরবিহীন বিরোধ। ইনফান্তিনোর দীর্ঘদিনের উপদেষ্টা কার্লোস কর্দেইরো এ উদ্যোগকে ‘ফুটবলের জন্য খারাপ চুক্তি’ আখ্যা দিয়ে পদত্যাগ করেন। পরে প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা কেভিন ল্যামোর জানান, প্রকল্পটি সম্পর্কে ফিফার প্রশাসনের অনেকেই আগে থেকে অবগত ছিলেন না। এই অভ্যন্তরীণ চাপই শেষ পর্যন্ত ইনফান্তিনোকে পরিকল্পনা প্রত্যাহারে বাধ্য করে।
তবে পরিকল্পনা বাতিল করেও সংকট কাটেনি। উয়েফা স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, বর্তমান নেতৃত্বের ওপর তাদের আর আস্থা নেই। ইউরোপীয় লিগগুলোর সংগঠনের প্রধান ক্লডিয়াস শেফারের মতে, অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানে এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে নেতৃত্ব পরিবর্তন অনেক আগেই ঘটত।
এদিকে ইনফান্তিনোকে অপসারণের সাংগঠনিক প্রক্রিয়াও আলোচনায় এসেছে। ফিফার ৩৭ সদস্যের কাউন্সিলের অন্তত ১৯ সদস্য জরুরি সভার দাবি জানালে সভাপতির ওপর পদত্যাগের চাপ তৈরি হতে পারে। তিনি সরে না দাঁড়ালে ২১১ সদস্য দেশের অন্তত ৪৩টি লিখিত আবেদনের মাধ্যমে বিশেষ কংগ্রেস আহ্বান করা সম্ভব। সেখানে কার্যত অনাস্থা ভোট অনুষ্ঠিত হতে পারে এবং ইনফান্তিনোকে অপসারণে প্রয়োজন হবে অন্তত ১০৬টি ভোট।
যদিও ইউরোপের ৫৫টি ভোট তার বিরোধীদের পক্ষে থাকতে পারে, তবে আফ্রিকা, এশিয়া ও লাতিন আমেরিকার দেশগুলোর অবস্থানই শেষ পর্যন্ত নির্ধারণ করবে তার ভবিষ্যৎ।
অন্যদিকে ইনফান্তিনো এখনো পদ ছাড়ার কোনো ইঙ্গিত দেননি। পরিকল্পনা প্রত্যাহারের ঘোষণা দিয়ে তিনি বলেছেন, ফিফার লক্ষ্য বিভাজন নয়, বরং ঐক্য প্রতিষ্ঠা করা। সব পক্ষকে আবারও আলোচনার টেবিলে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চালিয়ে যাবেন বলেও জানান তিনি। ইতোমধ্যে কাতারের পাশাপাশি মরক্কো ও মিসর তার পরিকল্পনা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে, যা তার জন্য কিছুটা ইতিবাচক বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
তবে ফুটবল রাজনীতির বর্তমান বাস্তবতায় সংকট সহজে কাটছে না। আগামী মার্চে অনুষ্ঠিতব্য ফিফা কংগ্রেসকে সামনে রেখে সদস্য দেশগুলোর সমর্থন ধরে রাখা এবং নতুন সমর্থন অর্জনের লড়াই শুরু হয়ে গেছে। একদিকে ইনফান্তিনো নিজের অবস্থান রক্ষার চেষ্টা চালাবেন, অন্যদিকে উয়েফা ও তাদের মিত্ররা তাকে এমন অবস্থায় নিয়ে যেতে চাইবে, যেখানে পদত্যাগ অথবা অনাস্থা ভোট—দুইয়ের একটির মুখোমুখি হতে হবে।
বিশ্ব ফুটবলের ক্ষমতার কেন্দ্র এখন ১০৬ ভোটের হিসাব-নিকাশে ব্যস্ত। আগামী কয়েক মাসের কূটনৈতিক ও সাংগঠনিক তৎপরতাই নির্ধারণ করবে, জিয়ান্নি ইনফান্তিনো স্বেচ্ছায় দায়িত্ব ছাড়বেন, নাকি অনাস্থার ভোটে বিদায় নিতে বাধ্য হবেন।

প্রথম দর্পণ,স্পোর্টস ডেক্স