আমার দেশ সম্পাদক ও ন্যাশনাল এডিটরস কাউন্সিলের (এনইসি) যুগ্ম আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান বলেছেন, বাংলাদেশে মাদরাসা শিক্ষা ও আলেম সমাজকে অবমূল্যায়নের ধারা শুরু হয় শেখ মুজিবুর রহমানের শাসনামল থেকে। তার দাবি, ইসলামের নামে রাজনীতি নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্তের পর থেকেই আলেম-উলামা ও মাদরাসা শিক্ষার প্রতি রাষ্ট্রীয় অবহেলা এবং বৈষম্যের সংস্কৃতি গড়ে ওঠে।
রোববার (২ আগস্ট) রাজধানীর কাকরাইলে ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনের মুক্তিযোদ্ধা হলে আয়োজিত ‘অগ্নিঝরা জুলাই গণঅভ্যুত্থানে মাদরাসা: ছাত্র-শিক্ষকদের অবদান ও প্রত্যাশা’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানের আয়োজন করে ঢাকার তা’মীরুল মিল্লাত কামিল মাদরাসা ছাত্র সংসদ।
বক্তব্যে মাহমুদুর রহমান বলেন, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ ছিল জালিমের বিরুদ্ধে মজলুমের লড়াই। তবে স্বাধীনতার পর সেই সংগ্রামকে ইসলামের বিরুদ্ধে অবস্থান হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা করা হয় বলে তিনি অভিযোগ করেন। এর ফলে আলেম সমাজ ও মাদরাসা শিক্ষার্থীরা দীর্ঘদিন ধরে অবমূল্যায়ন ও নিপীড়নের শিকার হয়েছেন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, ১৯৭২ সালের পর বহু আলেমকে আত্মগোপনে থাকতে হয়েছে। আলেমদের রাজাকার ও রাষ্ট্রবিরোধী আখ্যা দিয়ে অপমান করা হয়েছে এবং অনেককে বিচারবহির্ভূতভাবে হত্যা করা হয়েছে বলেও তিনি দাবি করেন।
মাহমুদুর রহমান বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে মাদরাসা শিক্ষার্থীদের গুরুত্বপূর্ণ অবদান থাকা সত্ত্বেও তাদের ভূমিকা যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা হয় না। তিনি বলেন, “সব শহীদের মর্যাদা সমান। কিন্তু মাদরাসার ছাত্রদের অবদান সমাজে কাঙ্ক্ষিত স্বীকৃতি পায় না, যা স্বাধীনতার পর থেকেই চলে আসা বৈষম্যেরই বহিঃপ্রকাশ।”
শাপলা চত্বরের ঘটনার প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, সেখানে মাদরাসার শিক্ষার্থীরা নিহত হলেও সমাজে প্রত্যাশিত প্রতিবাদ দেখা যায়নি। তার ভাষায়, এটি মাদরাসা শিক্ষার্থীদের প্রতি দীর্ঘদিনের সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিরই প্রতিফলন।
তিনি বলেন, মাদরাসার ছাত্র-শিক্ষকদের রাষ্ট্রের কাছে সম্মান ভিক্ষা না করে নিজেদের যোগ্যতা, জ্ঞান ও নৈতিকতার মাধ্যমে সেই মর্যাদা অর্জন করতে হবে। জ্ঞান-বিজ্ঞান ও আধুনিক শিক্ষায় এগিয়ে যাওয়ারও আহ্বান জানান তিনি।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে তা’মীরুল মিল্লাতসহ বিভিন্ন মাদরাসার শিক্ষার্থীদের ভূমিকার প্রশংসা করে মাহমুদুর রহমান বলেন, টঙ্গী, উত্তরা ও বিশেষ করে যাত্রাবাড়ীতে তাদের অংশগ্রহণ দেশের ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। তিনি জানান, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে সেই ইতিহাস তুলে ধরতে কাজ করে যাবে আমার দেশ।
কওমি সনদের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে তিনি বলেন, শেখ হাসিনা সরকার আলেম সমাজকে নিয়ন্ত্রণের রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে এটি ব্যবহার করেছিল। তবে প্রকৃত সম্মান সংগ্রামের মাধ্যমেই অর্জন করতে হয় বলে মন্তব্য করেন তিনি।
মাহমুদুর রহমান বলেন, মাদরাসা শিক্ষার্থীরা যদি জ্ঞান, গবেষণা ও নৈতিক নেতৃত্বে এগিয়ে যেতে পারেন, তবে ভবিষ্যতে রাষ্ট্রীয় নেতৃত্বেও তাদের ভূমিকা প্রতিষ্ঠিত হবে। একই সঙ্গে ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাসের সঙ্গে ২০১৮ সালের কোটা সংস্কার ও নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের ধারাবাহিকতা সংরক্ষণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, ফ্যাসিবাদের পতন হলেও ষড়যন্ত্র শেষ হয়নি। এ প্রেক্ষাপটে তিনি জুলাই আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানান।
সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন তা’মীরুল মিল্লাত কামিল মাদরাসার ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ ড. মুহাম্মদ খলিলুর রহমান মাদানী। প্রধান আলোচক ছিলেন সংসদ সদস্য ও জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান। বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন সংসদ সদস্য ও জামায়াতের নির্বাহী পরিষদের সদস্য নূরুল ইসলাম বুলবুল। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সেক্রেটারি সিবগাতুল্লাহ সিবগা।
মাদরাসা ছাত্র সংসদের ভিপি তোফায়েল আহমেদের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন ইসলামি স্কলার মুফতি আলী হাসান উসামা, জামায়াতের ঢাকা মহানগর দক্ষিণের নায়েবে আমির আবদুস সবুর ফকির, শায়খুল হাদিস আবু তাহের জিহাদি, তানযিমুল উম্মাহ ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান হাবীবুল্লাহ মুহাম্মদ ইকবাল এবং মুফাসসিরে কোরআন আবুল কাশেম রাযি।
এই সংস্করণে মূল বক্তব্য ও তথ্য অপরিবর্তিত রেখে ভাষা, বানান, উপস্থাপনা ও কাঠামো জাতীয় দৈনিক পত্রিকার সংবাদধারার উপযোগী করে পরিমার্জন করা হয়েছে।

মো. জাকির হোসাইন,স্টাফ রিপোর্টার