জনপ্রিয়তার শীর্ষে ইব্রাহিম ত্রাওরে, তবে কঠিন বাস্তবতার মুখে তার নেতৃত্ব

  • প্রথম দর্পণ,আন্তর্জাতিক ডেস্ক
  • আপলোড সময় : ০৪ আগস্ট ২০২৬, ০১:৪৫ দুপুর
  • ৩৪৭১ বার পড়া হয়েছে

Banner Ad
https://prothomdorpan.com/admin/fav-icon-logo/image/1761146741.250..125.jpg

মাত্র ৩৮ বছর বয়সী সেনা কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন ইব্রাহিম ত্রাওরে বর্তমানে আফ্রিকার অন্যতম আলোচিত নেতা। ২০২২ সালে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে বুরকিনা ফাসোর ক্ষমতায় আসার পর তিনি জাতীয় সার্বভৌমত্ব, বিদেশি প্রভাবমুক্ত রাষ্ট্রব্যবস্থা এবং আত্মনির্ভরশীল অর্থনীতির প্রতীক হিসেবে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। তবে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তার জনপ্রিয়তা বাড়লেও দেশের অভ্যন্তরে তার শাসনব্যবস্থা নিয়ে নানা প্রশ্ন ক্রমেই জোরালো হচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে বিধিনিষেধ, দীর্ঘস্থায়ী নিরাপত্তা সংকট এবং গণতন্ত্রের পরিবর্তে বিপ্লবী রাষ্ট্রব্যবস্থার ওপর জোর দেওয়ার কারণে ত্রাওরের নেতৃত্ব এখন কঠিন পরীক্ষার মুখে।

গণতন্ত্র নয়, ‘বিপ্লবী সময়’

চলতি বছরের এপ্রিলে দেওয়া এক বক্তব্যে ত্রাওরে দেশবাসীকে সাময়িকভাবে ‘গণতন্ত্র ভুলে যেতে’ আহ্বান জানান। তিনি বলেন, বুরকিনা ফাসো বর্তমানে একটি বিপ্লবী সময় অতিক্রম করছে এবং এই সময়ে প্রচলিত গণতান্ত্রিক কাঠামোর চেয়ে রাষ্ট্র পুনর্গঠন বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

এর পরপরই সামরিক নেতৃত্বাধীন রূপান্তরকাল আরও দীর্ঘায়িত করা হয় এবং রাজনৈতিক দলগুলো বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়। এতে স্পষ্ট হয়, দ্রুত বেসামরিক সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর বর্তমান সরকারের তাৎক্ষণিক পরিকল্পনায় নেই।

কেন জনপ্রিয় ত্রাওরে?

শুধু বুরকিনা ফাসো নয়, আফ্রিকার বিভিন্ন দেশেও ইব্রাহিম ত্রাওরের জনপ্রিয়তা রয়েছে। বিদেশি সামরিক হস্তক্ষেপ, অর্থনৈতিক নির্ভরতা এবং রাজনৈতিক অভিজাতদের প্রতি জনঅসন্তোষকে তিনি দক্ষতার সঙ্গে কাজে লাগিয়েছেন।

ক্ষমতায় আসার পর তিনি দেশ থেকে ফরাসি সেনা প্রত্যাহার করেন, রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করেন এবং স্থানীয় শিল্প ও কৃষি খাতকে অগ্রাধিকার দেন। পাশাপাশি অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতাকে রাষ্ট্রীয় নীতির অন্যতম ভিত্তি হিসেবে তুলে ধরেন।

তার বক্তব্যে প্রায়ই উঠে আসে বুরকিনা ফাসোর সাবেক বিপ্লবী নেতা থমাস সাঙ্কারার আদর্শ। ১৯৮৩ থেকে ১৯৮৭ সাল পর্যন্ত দেশটির শাসক থাকা সাঙ্কারা আফ্রিকায় সাম্রাজ্যবাদবিরোধী ও আত্মনির্ভরতার প্রতীক হিসেবে পরিচিত।

নাইজেরিয়ার নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও বেকন কনসালটিং লিমিটেডের প্রতিষ্ঠাতা কবির আদামুর মতে, বুরকিনা ফাসোয় জনগণের কাছে কার্যকারিতার চেয়ে জাতীয় সার্বভৌমত্বের প্রশ্নটি এখন বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে এবং ত্রাওরে সেই মনোভাবকে রাজনৈতিক শক্তিতে রূপ দিয়েছেন।

অর্থনৈতিক নীতিতে পরিবর্তনের উদ্যোগ

ত্রাওরের সরকার স্থানীয় উৎপাদন বৃদ্ধি, কৌশলগত খাতে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ জোরদার এবং বিদেশি অংশীদারদের ওপর নির্ভরতা কমানোর উদ্যোগ নিয়েছে।

সরকারের দাবি, কৃষি খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো হয়েছে। বিশেষ করে চাল ও ভুট্টাসহ খাদ্যশস্য উৎপাদনে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে স্থানীয় শিল্প ও প্রক্রিয়াজাতকরণ খাতের সম্প্রসারণ এবং অবকাঠামো উন্নয়নেও বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

সরকারের সমর্থকদের মতে, এসব উদ্যোগ দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক স্বাধীনতার ভিত্তি শক্তিশালী করবে।

নিরাপত্তা জোরদারে ‘ভলান্টিয়ার্স ফর দ্য ডিফেন্স অব দ্য হোমল্যান্ড’ নামে বেসামরিক সহায়ক বাহিনীর কার্যক্রমও সম্প্রসারণ করা হয়েছে, যা সেনাবাহিনীকে বিভিন্ন অভিযানে সহায়তা করছে।

সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ নিরাপত্তা

ক্ষমতায় আসার সময় দীর্ঘদিনের নিরাপত্তা সংকট মোকাবিলার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন ত্রাওরে। তবে বুরকিনা ফাসো এখনো সাহেল অঞ্চলের অন্যতম সহিংসতাপ্রবণ দেশ।

আল-কায়েদা-সংশ্লিষ্ট জামা'আত নুসরাত আল-ইসলাম ওয়াল মুসলিমিন (জেএনআইএম) এবং আইএসের পশ্চিম আফ্রিকা শাখার সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো এখনো দেশটির বিভিন্ন এলাকায় সক্রিয়।

সরকার বিভিন্ন শহর ও গুরুত্বপূর্ণ এলাকা পুনর্দখলের দাবি করলেও ঘানার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ মুস্তাফা বাতুরে সাল্লামার মতে, ত্রাওরের নেতৃত্বের সফলতা শেষ পর্যন্ত নির্ভর করবে দেশের নিরাপত্তা পরিস্থিতির প্রকৃত উন্নতির ওপর।

তিনি বলেন, বর্তমানে ২০ লাখের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত এবং বিপুলসংখ্যক মানুষ মানবিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল। পাশাপাশি সাংবাদিক, গবেষক ও মানবিক সংস্থাগুলোর প্রবেশাধিকার সীমিত থাকায় সরকারি দাবির স্বাধীন যাচাইও কঠিন হয়ে পড়েছে।

রাজনৈতিক স্বাধীনতা নিয়ে উদ্বেগ

ত্রাওরের সরকার ধীরে ধীরে ক্ষমতা আরও কেন্দ্রীভূত করছে বলে সমালোচকদের অভিযোগ। চলতি বছরের জানুয়ারিতে রাজনৈতিক দলগুলো বিলুপ্ত এবং রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড স্থগিত করা হয়। সরকারের দাবি, জাতীয় সংকটের সময়ে এসব কার্যক্রম বিভাজন সৃষ্টি করতে পারে।

এর আগে সামরিক রূপান্তরকালও বাড়ানো হয়, যার ফলে বেসামরিক শাসনে ফেরার প্রক্রিয়া আরও পিছিয়ে যায়।

বিশ্লেষকদের মতে, ইব্রাহিম ত্রাওরের সামনে এখন দুটি বড় চ্যালেঞ্জ—একদিকে দীর্ঘস্থায়ী নিরাপত্তা সংকট মোকাবিলা, অন্যদিকে রাজনৈতিক স্বাধীনতা, গণতান্ত্রিক প্রত্যাশা এবং জনগণের আস্থা ধরে রেখে রাষ্ট্র পরিচালনা করা।




কমেন্ট করুন:

ফেসবুকে আমরা
সর্বশেষ সংবাদ
Sidebar Ad