প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, ফ্যাসিবাদের সুবিধাভোগীরা রাষ্ট্র, রাজনীতি ও প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ে এখনো সক্রিয় রয়েছে। এরই মধ্যে একটি চক্র জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতকে অস্থিতিশীল করতে নানা তৎপরতা চালাচ্ছে এবং বিভ্রান্তিকর বক্তব্য ছড়াচ্ছে।
শনিবার (৮ আগস্ট) দুপুরে রাজধানীতে ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ড্যাব) ৩৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত চিকিৎসক সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময় দুর্বল অর্থনীতি, বিভক্ত প্রশাসন এবং ভঙ্গুর শিক্ষা ও স্বাস্থ্যব্যবস্থা পেয়েছে। সেই পরিস্থিতি থেকে দেশকে ঘুরে দাঁড় করাতে সরকার কাজ করে যাচ্ছে। তবে একটি চক্র কৌশলে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছে।
রাজনীতিতে শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও পেশাজীবীদের সম্পৃক্ততার বিষয়ে তিনি বলেন, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত প্রায় সব কর্মকাণ্ডকেই প্রভাবিত করে। তাই শিক্ষার্থী, শিক্ষক কিংবা পেশাজীবীদের নিজ নিজ মতাদর্শ অনুযায়ী রাজনৈতিকভাবে সচেতন বা সংগঠিত থাকা অযৌক্তিক নয়। তবে অতিরিক্ত রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা যাতে পেশাগত দায়িত্ব পালনে বাধা সৃষ্টি না করে, সে বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে।
তিনি বলেন, প্রচলিত রাজনীতির বাইরে গিয়ে রাজনীতির গুণগত পরিবর্তন এখন সময়ের দাবি। শিক্ষার্থী ও পেশাজীবীরা রাজনীতিতে কতটা সম্পৃক্ত থাকবেন, তা নিয়ে সমাজে নানা মত রয়েছে। তবে পেশাগত দায়িত্বের সঙ্গে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের ভারসাম্য বজায় রাখা জরুরি।
চিকিৎসাসেবায় প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থায় গুরুত্ব
চিকিৎসকদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, চিকিৎসাসেবার উন্নয়নে শুধু অবকাঠামো নির্মাণ যথেষ্ট নয়; রোগ প্রতিরোধ ও জনসচেতনতার ওপরও গুরুত্ব দিতে হবে।
এ প্রসঙ্গে মার্কিন উদ্ভাবক ও ব্যবসায়ী টমাস এডিসনের একটি বক্তব্যের উল্লেখ করে তিনি বলেন, ভবিষ্যতের চিকিৎসাব্যবস্থায় রোগীদের মানবদেহের যত্ন, খাদ্যাভ্যাস এবং রোগের কারণ ও প্রতিরোধ সম্পর্কে সচেতন করার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকারের স্বাস্থ্যসেবা নীতির সঙ্গেও এ চিন্তার মিল রয়েছে। সরকারের নীতি হলো—‘প্রিভেনশন ইজ বেটার দ্যান কিউর’। মানুষকে শুরুতেই রোগের কারণ ও প্রতিকার সম্পর্কে সচেতন করা গেলে অনেক রোগ সহজেই প্রতিরোধ বা নিরাময় করা সম্ভব।
তিনি জানান, বিদ্যমান চিকিৎসাব্যবস্থার পাশাপাশি সরকার নতুন করে আরও এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের উদ্যোগ নিয়েছে। এসব স্বাস্থ্যকর্মী সাধারণ মানুষকে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা সম্পর্কে সচেতন করবেন। তাদের যথাযথ প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রে চিকিৎসকদের নেতৃত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
চিকিৎসকদের বিভিন্ন প্রস্তাব বিবেচনার আশ্বাস
স্বাস্থ্যব্যবস্থা ও চিকিৎসাসেবা আরও কার্যকর ও জনবান্ধব করতে চিকিৎসকদের পক্ষ থেকে উত্থাপিত বিভিন্ন প্রস্তাবের কথাও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী।
প্রস্তাবগুলোর মধ্যে রয়েছে—স্বল্পতম সময়ে বিশেষ বিসিএসের মাধ্যমে ৫ হাজার চিকিৎসক নিয়োগ, সরকারি চাকরিতে চিকিৎসকদের প্রবেশের বয়সসীমা ৩২ থেকে ৩৪ বছরে উন্নীত করা, চিকিৎসকদের অবসরের বয়সসীমা ৬১ থেকে ৬৫ বছরে বাড়ানো এবং চিকিৎসক ও রোগী উভয়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সময়োপযোগী স্বাস্থ্যসেবা সুরক্ষা আইন প্রণয়ন।
এ ছাড়া উপজেলা ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে কর্মরত চিকিৎসকদের জন্য বিশেষ ভাতা ও প্রণোদনা, বেসরকারি খাতে কর্মরত চিকিৎসকদের জন্য সুনির্দিষ্ট ও ন্যায্য বেতনকাঠামো এবং রাজধানীর বাইরে বিভাগ, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে বিশেষায়িত হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, চিকিৎসকদের এসব প্রস্তাব অযৌক্তিক নয়। ইতোমধ্যে শিশু হাসপাতালসহ ঢাকার বাইরে বেশ কয়েকটি বিশেষায়িত হাসপাতাল নির্মাণের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের কাজ শুরু হয়েছে। অন্যান্য প্রস্তাবও ইতিবাচকভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে পর্যায়ক্রমে বিবেচনা করা হবে।
স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর পরিকল্পনা
তারেক রহমান বলেন, সরকার শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও জ্বালানিসহ প্রতিটি খাতকে স্বয়ংসম্পূর্ণ ও স্বনির্ভর করতে বাস্তবমুখী পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করছে।
তিনি বলেন, দেশের স্বাস্থ্য ও চিকিৎসাব্যবস্থাকে আধুনিক ও স্বয়ংসম্পূর্ণ করতে বর্তমান সরকার দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো স্বাস্থ্য খাতে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বাজেট বরাদ্দ দিয়েছে। পর্যায়ক্রমে আগামী পাঁচ বছরে এ বরাদ্দ জিডিপির ৫ শতাংশে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
তিনি জানান, যত দ্রুত সম্ভব ই-হেলথ কার্ড চালুর কাজ শুরু হয়েছে। পাশাপাশি দেশের প্রতিটি উপজেলা হাসপাতালকে ১০১ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতালে উন্নীত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
চিকিৎসকদের আরও মানবিক হওয়ার আহ্বান
প্রধানমন্ত্রী বলেন, শুধু অবকাঠামোগত উন্নয়ন করলেই স্বাস্থ্য খাতে কাঙ্ক্ষিত সফলতা অর্জন সম্ভব নয়। চিকিৎসকদের সেবার মানসিকতা নিয়ে দায়িত্ব পালন করতে হবে।
দায়িত্ব পালনে চিকিৎসকদের বিভিন্ন সীমাবদ্ধতার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে চিকিৎসকদের নানা সীমাবদ্ধতার মুখোমুখি হতে হয়। তারপরও কিছু ক্ষেত্রে অনিচ্ছাকৃত অবহেলা বা দায়িত্ব পালনে শৈথিল্য সরকারের সামগ্রিক কার্যক্রমকে প্রশ্নবিদ্ধ করে এবং চিকিৎসক ও চিকিৎসাব্যবস্থা সম্পর্কে মানুষের মধ্যে অনাস্থা তৈরি করে।
চিকিৎসকদের আরও দায়িত্বশীল ও মানবিক ভূমিকা পালনের আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সবাইকে মিলে এমন একটি চিকিৎসাবান্ধব বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হবে, যেখানে দেশের প্রতিটি মানুষ মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা পাবে এবং উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে যেতে হবে না।

প্রথম দর্পণ,ডেস্ক