ছাত্রদলের নতুন কমিটির অপেক্ষায় পদপ্রত্যাশীরা

  • শাহিন রেজা,মাল্টিমিডিয়া ইনচার্জ
  • আপলোড সময় : ১২ আগস্ট ২০২৬, ১২:২৮ দুপুর
  • ৭৫৯৪ বার পড়া হয়েছে

Banner Ad
https://prothomdorpan.com/admin/fav-icon-logo/image/1761146741.250..125.jpg

জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটির মেয়াদ শেষ হয়েছে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে। এরপর থেকেই সংগঠনটির নতুন নেতৃত্ব নিয়ে চলছে নানা আলোচনা। নতুন কমিটি গঠনের প্রস্তুতিও প্রায় শেষ বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট নেতারা। এখন শুধু নতুন নেতৃত্বের হাতে দায়িত্ব হস্তান্তরের অপেক্ষা।

নতুন কমিটিকে সামনে রেখে পদপ্রত্যাশীরা নিজ নিজ বলয়ে তৎপরতা বাড়ানোর পাশাপাশি বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের নজরে আসার চেষ্টা করছেন। তবে ছাত্রদলের নতুন কমিটি গঠনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন সংগঠনটির সাংগঠনিক অভিভাবক ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান।

২০২৪ সালের ১ মার্চ ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটির দায়িত্ব পান সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব ও সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন নাছির। সংগঠনটির খসড়া গঠনতন্ত্র অনুযায়ী কেন্দ্রীয় সংসদের মেয়াদ দুই বছর প্রস্তাব করা হয়েছে। সে হিসাবে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি বর্তমান কমিটির মেয়াদ শেষ হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, ছাত্রদলের নতুন কমিটি এখন বিএনপি চেয়ারম্যানের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রয়েছে। যেকোনো সময় নতুন কমিটি ঘোষণা হতে পারে। এর মধ্য দিয়ে রাকিব-নাছির নেতৃত্বাধীন কমিটির অধ্যায় শেষ হবে।

ছাত্রদলের সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব বলেন, ‘আমাদের কাজ প্রায় শেষ। ছাত্রদলের সাংগঠনিক অভিভাবক বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান যখন প্রয়োজন মনে করবেন, তখন নতুন কমিটির ঘোষণা আসবে।’

বিএনপি ও ছাত্রদলের একাধিক নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নতুন নেতৃত্ব বাছাইয়ে বেশ কিছু বিষয় বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে। বিশেষ করে আগামী দিনের রাজনৈতিক কর্মসূচি ও রাজপথের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সক্ষম, পরীক্ষিত, দক্ষ, আস্থাভাজন ও কর্মীবান্ধব নেতৃত্ব বেছে নেওয়ার বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অতীতের আন্দোলন-সংগ্রামে যাদের সক্রিয় ভূমিকা ছিল, হামলা-মামলা ও কারাবরণের পরও যারা মাঠে ছিলেন এবং শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যাদের নিবিড় যোগাযোগ রয়েছে, তাদের মধ্য থেকে নেতৃত্ব বাছাইয়ের সম্ভাবনা রয়েছে। পাশাপাশি নেতৃত্বে স্বচ্ছতা ও সাংগঠনিক দক্ষতাকেও গুরুত্ব দেওয়া হতে পারে।

ঢাবি থেকে আলোচনায় একাধিক নেতা

ছাত্রদলের শীর্ষ দুই পদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) থেকে আসার সম্ভাবনা রয়েছে বলে সংগঠনটির সাবেক ও বর্তমান নেতাদের অনেকে মনে করছেন। এ ক্ষেত্রে ২০০৮-০৯, ২০০৯-১০ এবং ২০১০-১১ শিক্ষাবর্ষের নেতাদের মধ্যে কয়েকজনের নাম আলোচনায় রয়েছে।

২০০৮-০৯ শিক্ষাবর্ষের সম্ভাব্যদের মধ্যে বর্তমান কেন্দ্রীয় কমিটির সহসভাপতি খোরশেদ আলম সোহেল, মনজুরুল আলম রিয়াদ, এবিএম ইজাজুল কবির রুয়েল ও সাফি ইসলাম রয়েছেন।

খোরশেদ আলম সোহেল ছাত্রদলের বিভিন্ন পর্যায়ে দায়িত্ব পালন করেছেন। আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় থাকার পাশাপাশি হামলা, মামলা, গ্রেপ্তার ও কারাবরণের শিকার হয়েছেন তিনি। ২০১৮ সালের ১৯ জানুয়ারি জিয়াউর রহমানের কবরে শ্রদ্ধা জানাতে গিয়ে পুলিশের হামলায় তার ডান পা ভেঙে যায়। ২০১৯ সালের ডাকসু নির্বাচনে তিনি ছাত্রদলের এজিএস প্রার্থী ছিলেন।

মনজুরুল আলম রিয়াদও বর্তমান কমিটির সহসভাপতি। এর আগে কেন্দ্রীয় সংসদের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও অমর একুশে হলের সদস্য সচিবের দায়িত্ব পালন করেন। তিনি একাধিক মামলায় কারাভোগ করেছেন এবং জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানে ছাত্রদলের প্রথম সারির নেতাদের একজন ছিলেন।

এবিএম ইজাজুল কবির রুয়েলও ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন। তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা রয়েছে এবং তিনি কয়েক দফা গ্রেপ্তার হয়ে কারাভোগ করেছেন।

২০০৯-১০ শিক্ষাবর্ষ থেকে আলোচনায় রয়েছেন কেন্দ্রীয় কমিটির ১ নম্বর যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মমিনুল ইসলাম জিসান, ২ নম্বর যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ফারুক হোসেন, সাংগঠনিক সম্পাদক আমানউল্লাহ আমান ও মোস্তাফিজুর রহমান।

মমিনুল ইসলাম জিসান দীর্ঘদিন ধরে সংগঠক হিসেবে কাজ করেছেন। বিভিন্ন সময়ে গ্রেপ্তার ও কারাভোগের পাশাপাশি হামলার শিকার হয়েছেন তিনি। ছাত্রদলের কর্মী সংগ্রহ ও সাংগঠনিক কার্যক্রমে তার ভূমিকা রয়েছে।

ফারুক হোসেনকে সংগঠনের নেতাকর্মীদের কাছে কর্মীবান্ধব ও দক্ষ সংগঠক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। আন্দোলন-সংগ্রামের সময় মামলা ও হামলার শিকার হওয়ার পাশাপাশি দীর্ঘদিন বাড়িছাড়া ছিলেন তিনি। জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের সময়ও তিনি সক্রিয় ছিলেন।

সাংগঠনিক সম্পাদক আমানউল্লাহ আমান ঢাবি ছাত্রদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদকসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। আন্দোলনের সময় একাধিকবার হামলার শিকার হয়েছেন। ২০২৩ সালের ২৮ অক্টোবর নয়াপল্টনে বিএনপির সমাবেশকে কেন্দ্র করে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনায় দায়ের করা মামলায় তাকে গ্রেপ্তার ও রিমান্ডে নেওয়া হয়েছিল।

এ ছাড়া ২০১৯ সালের ডাকসু নির্বাচনে ছাত্রদলের ভিপি প্রার্থী মোস্তাফিজুর রহমানও শীর্ষ নেতৃত্বের আলোচনায় রয়েছেন।

২০১০-১১ শিক্ষাবর্ষের নেতাদের মধ্যে কেন্দ্রীয় সংসদের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক তারিকুল ইসলাম তারিক, ঢাবি শাখার সভাপতি গণেশ চন্দ্র সাহস, সিনিয়র সহসভাপতি মাসুম বিল্লাহ মাসুম ও সহসভাপতি আনিসুর রহমান খন্দকার অনিকের নাম আলোচনায় রয়েছে।

তারিকুল ইসলাম তারিক আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় থাকার পাশাপাশি একাধিকবার হামলা, মামলা ও গ্রেপ্তারের শিকার হয়েছেন। জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানেও তিনি মাঠে সক্রিয় ছিলেন। দলীয় কর্মীদের কাছে তার সাংগঠনিক দক্ষতা ও কর্মীবান্ধব ভূমিকার কথা উল্লেখ করা হয়।

আনিসুর রহমান অনিক ২০১৯ সালের ডাকসু নির্বাচনে ছাত্রদলের জিএস প্রার্থী ছিলেন। বিভিন্ন সময় তিনি হামলা, গ্রেপ্তার ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। তার বক্তব্য ও রাজনৈতিক চিন্তাভাবনার কারণে শিক্ষার্থীদের মধ্যে তার গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে বলে সংগঠনের নেতারা মনে করেন।

২০১১-১২ শিক্ষাবর্ষ থেকেও আলোচনায় কয়েকজন

২০১১-১২ শিক্ষাবর্ষের নেতাদের মধ্যে কেন্দ্রীয় সংসদের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক রাজু আহামেদ, গাজী মো. সাদ্দাম হোসেন, সাহিত্য ও প্রকাশনা সম্পাদক মিনহাজ আহমেদ প্রিন্স এবং ঢাবি ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক নাহিদুজ্জামান শিপনের নাম আলোচনায় রয়েছে।

এর মধ্যে রাজু আহামেদের নাম সাধারণ সম্পাদক পদের সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে জোরালোভাবে আলোচিত হচ্ছে। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ঢাবির রাজনীতিতে সক্রিয় থাকার পাশাপাশি তিনি বিভিন্ন সময় গ্রেপ্তার ও শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।

মিনহাজ আহমেদ প্রিন্স দুঃসময়ে সংগঠনের কার্যক্রমে সক্রিয় ছিলেন। নেতাকর্মীদের কাছে তিনি দক্ষ ও সৃজনশীল সংগঠক হিসেবে পরিচিত।

নাহিদুজ্জামান শিপন জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানে সক্রিয় ভূমিকা রাখার পাশাপাশি সংগঠনের ইতিবাচক ভাবমূর্তি ধরে রাখতে কাজ করছেন। গাজী মো. সাদ্দাম হোসেনও বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক কর্মসূচিতে সক্রিয় ছিলেন।

এ ছাড়া ২০১২-১৩ শিক্ষাবর্ষের নূর আলম ভূঁইয়া ইমনের নামও সম্ভাব্য নেতৃত্বের আলোচনায় রয়েছে।

অন্যদিকে ২০০৭-০৮ শিক্ষাবর্ষের সিনিয়র নেতাদের মধ্য থেকে বর্তমান সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন নাছির ও সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শ্যামল মালুমের নামও সভাপতি পদে আলোচনায় রয়েছে। ঢাবি থেকে প্রচার সম্পাদক শরীফ প্রধান শুভ, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জাহিদ হাসান শাকিল ও ইব্রাহীম খলিলের নামও আলোচনায় আছে।

তবে নিজের নতুন কমিটিতে থাকার সম্ভাবনা নাকচ করে ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক নাছির বলেন, ‘না, আমি চাইও না। আমি নিজে আসলে চাই নতুন সাংগঠনিক কাঠামো দাঁড়াবে, আমরা দায়িত্ব শেষ করব ইনশাল্লাহ।’

ঢাবির বাইরেও সম্ভাব্য প্রার্থী

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে থেকেও কয়েকজনকে নিয়ে আলোচনা রয়েছে। তাদের মধ্যে ছাত্রদলের বর্তমান সহসভাপতি ডা. তৌহিদুর রহমান আউয়াল, কাজী জিয়াউদ্দিন বাসেত, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সভাপতি আবু হোরায়রা এবং সাধারণ সম্পাদক এম রাজীবুল ইসলাম তালুকদার বিন্দুর নাম রয়েছে।

ডা. তৌহিদুর রহমান আউয়াল আন্দোলন-সংগ্রামে আহতদের চিকিৎসাসেবায় ভূমিকা রাখার পাশাপাশি রাজপথের কর্মসূচিতে সক্রিয় ছিলেন। কাজী জিয়াউদ্দিন বাসেতও বিভিন্ন সময়ে মামলা, গ্রেপ্তার ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। ২০১৫ সালের অবরোধের সময় গুলিবিদ্ধ হয়ে দীর্ঘদিন চিকিৎসাধীন ছিলেন তিনি।

রেকর্ড সাংগঠনিক কার্যক্রমের দাবি

বর্তমান ছাত্রদল কমিটির দাবি, তাদের মেয়াদে সংগঠনের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে। সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন জানান, প্রায় ২ হাজার ১০০ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কমিটি দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে মেয়াদোত্তীর্ণ জেলা ও মহানগর কমিটির অধিকাংশই সম্পন্ন করা হয়েছে।

তিনি বলেন, এক হাজারের বেশি নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রদলের কমিটি গঠনের মাধ্যমে সংগঠনের সাংগঠনিক কাঠামো বিস্তৃত করা হয়েছে। কয়েকটি কমিটি এখনো বাকি থাকলেও সেগুলোর কাজ শেষ করে দলের কাছে জমা দেওয়ার প্রস্তুতি রয়েছে।

নাছির বলেন, ‘আমাদের দায়িত্বকালীন এবং ছাত্রদলের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি সাংগঠনিক কার্যক্রম আমরা শেষ করেছি।’

নতুন কমিটি ঘোষণার পর ভবিষ্যতে কোন পর্যায়ে দায়িত্ব পালন করবেন—এ বিষয়ে নাছির বলেন, দল যেখানে দায়িত্ব দেবে, সেখানেই কাজ করবেন। যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল কিংবা বিএনপির মূল দল—যে জায়গায় দল উপযুক্ত মনে করবে, সেখানেই দায়িত্ব পালন করবেন তিনি।

সব মিলিয়ে ছাত্রদলের নতুন নেতৃত্ব ঘিরে পদপ্রত্যাশীদের মধ্যে তৎপরতা বাড়লেও চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রয়েছেন সবাই। বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সিদ্ধান্তের পরই সংগঠনটির নতুন কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের চিত্র স্পষ্ট হবে।




কমেন্ট করুন:

ফেসবুকে আমরা
সর্বশেষ সংবাদ
Sidebar Ad