জ্বালানি সংকটের ৬ কারণ তুলে ধরে নাহিদের ১৫ দফা প্রস্তাব

  • প্রথম দর্পণ,ডেস্ক
  • আপলোড সময় : ১২ আগস্ট ২০২৬, ১১:১৪ রাত
  • ৫৫৯২ বার পড়া হয়েছে

Banner Ad
https://prothomdorpan.com/admin/fav-icon-logo/image/1761146741.250..125.jpg

দেশের চলমান জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকটের জন্য বিএনপি সরকারের ‘পরিকল্পনাহীনতা ও জ্বালানি ক্রয়ে সিদ্ধান্তহীনতাকে’ দায়ী করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম। সংকটের পেছনে ছয়টি কারণ তুলে ধরে তাৎক্ষণিক, মধ্যমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি সমাধানে ১৫ দফা প্রস্তাব দিয়েছেন তিনি।

বুধবার (১২ আগস্ট) গণমাধ্যমে দেওয়া এক দীর্ঘ বিবৃতিতে নাহিদ ইসলাম এসব কথা বলেন।

বিবৃতিতে তিনি অভিযোগ করেন, বিএনপি নির্বাচনী ইশতেহারে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ খাতে দায়মুক্তি আইনসহ বিভিন্ন কালাকানুন বাতিলের প্রতিশ্রুতি দিলেও সরকার এখন সেই প্রতিশ্রুতির বিপরীত পথে হাঁটছে। তার দাবি, বেসরকারিকরণের নামে জ্বালানি খাতে প্রভাবশালী ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর আধিপত্য প্রতিষ্ঠার সুযোগ তৈরি করা হচ্ছে।

জ্বালানি সংকটের ছয় কারণ

নাহিদ ইসলামের মতে, বর্তমান সংকটের প্রথম কারণ বিএনপির নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি থেকে সরে যাওয়া। তিনি বলেন, পরিশোধিত জ্বালানি তেল বেসরকারি খাতে আমদানি, মজুত, পরিবহন, বিতরণ ও বিপণনের নীতিমালা প্রণয়নে তড়িঘড়ি করা হচ্ছে। এ জন্য অংশীজনদের মতামত নেওয়ার পর্যাপ্ত সময় না দেওয়ারও সমালোচনা করেন তিনি।

তিনি উল্লেখ করেন, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ গত ৬ আগস্ট বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনকে (বিপিসি) চার দিনের মধ্যে সংশ্লিষ্ট নীতিমালার খসড়া জমা দিতে নির্দেশ দেয়। একই সঙ্গে সেপ্টেম্বর-ডিসেম্বর মেয়াদের জ্বালানি তেল আমদানির আন্তর্জাতিক দরপত্রের সময়সীমা ৪২ দিন থেকে কমিয়ে ১০ দিন করার সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেন তিনি। নাহিদের দাবি, এতে আন্তর্জাতিক সরবরাহকারীদের অংশগ্রহণ কমে গিয়ে প্রতিযোগিতা হ্রাস এবং দাম বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

দ্বিতীয় কারণ হিসেবে বিএনপি সরকারের অতীত আমলের লোডশেডিং পরিস্থিতির কথা তুলে ধরেন নাহিদ। তার ভাষ্য, ২০০১-২০০৬ মেয়াদে বিদ্যুৎ উৎপাদন না বাড়িয়ে বিতরণ অবকাঠামো সম্প্রসারণের যে অসমন্বিত নীতি নেওয়া হয়েছিল, দুই দশক পরও তার পুনরাবৃত্তি হচ্ছে।

তৃতীয় কারণ হিসেবে তিনি সরকারের অর্থসংকটের যুক্তি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। নাহিদের দাবি, বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে দেশের মোট রিজার্ভ প্রায় ৩৬ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলার এবং বিপিএম-৬ পদ্ধতিতে ব্যবহারযোগ্য রিজার্ভ প্রায় ৩২ বিলিয়ন ডলার। একই সময়ে রেমিট্যান্স প্রবাহও শক্তিশালী রয়েছে। তার মতে, অর্থের ঘাটতির চেয়ে সময়মতো জ্বালানি ক্রয় পরিকল্পনা না করাই সংকটের বড় কারণ।

চতুর্থ কারণ হিসেবে তিনি ‘উৎপাদিত সংকটের’ অভিযোগ করেন। নাহিদের দাবি, বিপিসিকে আমদানির অনুমতি না দেওয়ার চেয়ে ক্রয় শিডিউল অনুমোদনে বিলম্বই সংকটকে তীব্র করেছে। তার প্রশ্ন, পছন্দের সরবরাহকারীর বিষয়ে চাপ সৃষ্টি করতে গিয়ে আমদানির সময়সূচি বিপর্যস্ত হয়েছে কি না।

পঞ্চম কারণ হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধকে সংকটের একমাত্র কারণ হিসেবে দেখানোর সমালোচনা করেন তিনি। নাহিদের দাবি, ১০ আগস্ট রাত ১টায় দেশে সর্বোচ্চ ৩ হাজার ৭৫৭ মেগাওয়াট লোডশেডিং হয়েছে। এর আগে ৯ আগস্ট ৩ হাজার ৬৭১ এবং ৩ আগস্ট ৩ হাজার ৫১২ মেগাওয়াট লোডশেডিং হয়েছিল। তার দাবি, ৪১টি বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ এবং ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানি প্রায় অর্ধেকে নেমে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, যুদ্ধ শুরুর আগেই এপ্রিল মাসে লোডশেডিং পরিস্থিতি নাজুক ছিল। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ বর্তমান সংকটের একমাত্র কারণ নয়।

ষষ্ঠ কারণ হিসেবে মহেশখালীর ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ড ও দেশের দুর্যোগ মোকাবিলা সক্ষমতার প্রশ্ন তোলেন নাহিদ। তার দাবি, গত ২১ জুলাই মহেশখালীতে এক্সিলারেট এনার্জির ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে আগুন লাগার পর দৈনিক প্রায় ৫১ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। ৫ আগস্ট আংশিক সরবরাহ পুনরায় শুরু হয়। এ ঘটনায় স্বাধীন কারিগরি তদন্ত হয়েছে কি না এবং হয়ে থাকলে প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়েছে কি না—সে প্রশ্ন তোলেন তিনি।

১৫ দফা প্রস্তাব

সংকট মোকাবিলায় আগামী ৩০ দিনের মধ্যে পাঁচটি পদক্ষেপ নেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছেন নাহিদ ইসলাম।

প্রথমত, তড়িঘড়ি বেসরকারিকরণ প্রক্রিয়া স্থগিত করে উন্মুক্ত অংশীজন আলোচনার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

দ্বিতীয়ত, আন্তর্জাতিক দরপত্রের সময়সীমা ১০ দিন থেকে আবার ৪২ দিনে ফিরিয়ে নেওয়ার প্রস্তাব দেন।

তৃতীয়ত, সেপ্টেম্বর-ডিসেম্বর মেয়াদের জ্বালানি তেল আমদানির ক্রয় শিডিউল দ্রুত অনুমোদন এবং আগামী চার থেকে ছয়টি অর্থনৈতিক প্রান্তিকের জন্য চাহিদাভিত্তিক ক্রয় ক্যালেন্ডার প্রকাশের দাবি জানান।

চতুর্থত, মহেশখালীর এফএসআরইউ দুর্ঘটনার স্বাধীন কারিগরি তদন্ত করে প্রতিবেদন প্রকাশের প্রস্তাব দেন।

পঞ্চমত, গ্যাস বরাদ্দে ডেটাভিত্তিক অগ্রাধিকার সূচক চালুর কথা বলেন তিনি। তার প্রস্তাব অনুযায়ী, জ্বালানি-দক্ষ, রপ্তানিমুখী ও শ্রমঘন শিল্পকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে এবং বরাদ্দের ক্ষেত্রে স্বচ্ছ মানদণ্ড অনুসরণ করা হবে।

মধ্যমেয়াদি পরিকল্পনা

ছয় থেকে ১৮ মাসের মধ্যে আরও ছয়টি পদক্ষেপ নেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছেন নাহিদ। এর মধ্যে রয়েছে বিপিসির একচেটিয়া ব্যবস্থা ভেঙে প্রতিযোগিতামূলক ও উন্মুক্ত দরপত্র চালু করা এবং রাষ্ট্রের হাতে কৌশলগত নিয়ন্ত্রণ রেখে একাধিক অংশীদারকে সুযোগ দেওয়া।

পরিশোধিত তেল আমদানির পরিবর্তে অপরিশোধিত তেল আমদানির সুযোগ দেওয়ার প্রস্তাবও দিয়েছেন তিনি। একই সঙ্গে আমদানিকারকদের নিজস্ব রিফাইনারি স্থাপনের শর্ত আরোপ, ইস্টার্ন রিফাইনারির দ্বিতীয় ইউনিটের কাজ দ্রুত শেষ করা এবং পাচার ঠেকাতে এলসি ব্যবস্থায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ রাখার কথা বলেন।

এ ছাড়া বিদ্যুৎ খাতের ক্যাপাসিটি চার্জের পূর্ণাঙ্গ নিরীক্ষা, প্রকৃত বিনিয়োগের সঙ্গে প্রাপ্ত অর্থের হিসাব মিলিয়ে দেখা এবং দায়মুক্তি আইন বাতিলের দাবি জানিয়েছেন তিনি।

আইপিপির বকেয়া নিষ্পত্তির পাশাপাশি বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থাগুলোর সিস্টেম লস কমানো ও আদায় দক্ষতা বাড়ানোর বাধ্যতামূলক লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণের প্রস্তাবও রয়েছে তার তালিকায়।

বিদ্যুৎ বিলে স্মার্ট মিটার বাধ্যতামূলক করার পাশাপাশি ম্যানুয়াল মিটার রিডিং বন্ধের প্রস্তাব দেন নাহিদ। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সিস্টেম লস কমানো এবং এর সঙ্গে জড়িত অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

এলপিজির দাম মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে ফিরিয়ে আনতে বাজারে নতুন প্রতিযোগী আনার প্রস্তাবও দিয়েছেন এনসিপির এই নেতা।

দীর্ঘমেয়াদি রোডম্যাপ

দীর্ঘমেয়াদে দেশে আরও দুটি এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের প্রস্তাব দিয়েছেন নাহিদ ইসলাম। বর্তমানে মহেশখালীতে থাকা দুটি এফএসআরইউর পাশাপাশি তৃতীয় ও চতুর্থ এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের কথা বলেন তিনি।

সাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে পিএসসি প্রণয়ন এবং দীর্ঘদিনের সিদ্ধান্তহীনতায় বাংলাদেশ ছেড়ে যাওয়া বিদেশি অংশীদারদের ফিরিয়ে আনতে সরকারি পর্যায়ে আলোচনার প্রস্তাব দিয়েছেন তিনি।

বাপেক্সে বিনিয়োগ বাড়ানোর পাশাপাশি প্রযুক্তি ও গবেষণার ঘাটতি পূরণে অভিজ্ঞ বিদেশি অংশীদার নেওয়ার কথাও বলেছেন নাহিদ।

সবশেষে সৌরবিদ্যুৎকে সাধারণ মানুষের জন্য আরও সহজলভ্য করার প্রস্তাব দেন তিনি। প্যানেল, কনভার্টার, ব্যাটারি ও সৌরচালিত যন্ত্রপাতির শুল্ক কমানো বা শূন্যে নামিয়ে আনা, বিভিন্ন পর্যায়ে সৌরবিদ্যুৎ সম্প্রসারণ, নেট মিটারিং ও ফিড-ইন কাঠামো স্পষ্ট করা এবং নির্দিষ্ট আয়তনের বাণিজ্যিক ও শিল্প ভবনের ছাদে সৌরবিদ্যুৎ বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব দিয়েছেন।

২০৩০ সালের মধ্যে ১০ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণের কথাও উল্লেখ করেন তিনি।

বিবৃতির শেষাংশে নাহিদ ইসলাম বলেন, জ্বালানি খাত জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। এ খাতে ভুল সিদ্ধান্তের খেসারত কৃষক, শ্রমিক, শিক্ষার্থী ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের দিতে হয়। সরকারের দায়িত্ব কোনো ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর পরিবর্তে জনগণের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া।

তিনি বলেন, এনসিপি জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে ‘মাফিয়া তোষণের’ নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান নেবে।




কমেন্ট করুন:

ফেসবুকে আমরা
সর্বশেষ সংবাদ
Sidebar Ad