রাষ্ট্রায়ত্ত পাঁচ ব্যাংকে খেলাপি ঋণ কমানোর নানা উদ্যোগ নেওয়া হলেও পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতি হয়নি। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে এসব ব্যাংকের সম্মিলিত খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৬ হাজার ৩০৪ কোটি টাকা। একই সঙ্গে কয়েকটি ব্যাংকে প্রভিশন ও মূলধন ঘাটতিও বড় আকার ধারণ করেছে।
রাষ্ট্রায়ত্ত পাঁচ ব্যাংক হলো—সোনালী, জনতা, অগ্রণী, রূপালী ও বেসিক ব্যাংক। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত জুন শেষে এসব ব্যাংকের মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৫১ হাজার ৩৪৩ কোটি টাকা। গত ডিসেম্বর শেষে যা ছিল ১ লাখ ৪৫ হাজার ৩৯ কোটি টাকা।
ছয় মাসের ব্যবধানে খেলাপি ঋণ বাড়লেও সোনালী ও বেসিক ব্যাংকে সামান্য কমেছে। বিপরীতে জনতা, অগ্রণী ও রূপালী ব্যাংকে খেলাপি ঋণ বেড়েছে।
অগ্রণী ব্যাংকে বেড়েছে সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকা
ছয় মাসে সবচেয়ে বেশি খেলাপি ঋণ বেড়েছে অগ্রণী ব্যাংকে। গত ডিসেম্বর শেষে ব্যাংকটির খেলাপি ঋণ ছিল ২৮ হাজার ৬১৫ কোটি টাকা। জুন শেষে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩২ হাজার ১৩৩ কোটি টাকা। অর্থাৎ ছয় মাসে বেড়েছে ৩ হাজার ৫১৮ কোটি টাকা। একই সময়ে ব্যাংকটির প্রভিশন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১২ হাজার ৩৩৭ কোটি টাকা।
অগ্রণী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আনোয়ারুল ইসলাম জানান, ব্যাংকটির মোট খেলাপি ঋণের প্রায় অর্ধেকই শীর্ষ ২০ বড় ঋণগ্রহীতার কাছে আটকে আছে। এসব গ্রাহক ঋণ পরিশোধে এগিয়ে না আসায় খেলাপি ঋণ কমানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
তার মতে, আইনি প্রক্রিয়া ধীরগতির হওয়ায় ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। ফলে বড় ঋণখেলাপিদের কাছ থেকে অর্থ আদায়েও গতি আসছে না।
জনতা ব্যাংকে খেলাপি ঋণ ৭৫ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে
রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি খেলাপি ঋণ রয়েছে জনতা ব্যাংকে। গত ডিসেম্বর শেষে ব্যাংকটির খেলাপি ঋণ ছিল ৭২ হাজার ৫৩৮ কোটি টাকা। জুন শেষে তা বেড়ে হয়েছে ৭৫ হাজার ৫৫৮ কোটি টাকা। ছয় মাসে বেড়েছে ৩ হাজার ২০ কোটি টাকা।
জুন শেষে ব্যাংকটির প্রভিশন ঘাটতিও বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫০ হাজার ২২৬ কোটি টাকা। ব্যাংকটির মোট খেলাপি ঋণের মধ্যে শীর্ষ ২০টি গ্রুপের কাছেই আটকে আছে ৫২ হাজার ৪১৮ কোটি টাকা, যা মোট খেলাপি ঋণের প্রায় ৭২ শতাংশ। বড় খেলাপি গ্রাহকদের মধ্যে বেক্সিমকো ও এস আলম গ্রুপ রয়েছে।
ব্যাংক কর্মকর্তাদের ভাষ্য, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অনেক ব্যবসায়ী দেশ ছেড়েছেন কিংবা গ্রেপ্তার হয়েছেন। এতে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ঋণ আদায় কার্যক্রম অনেক ক্ষেত্রে ধীর হয়ে গেছে।
রূপালীতে বেড়েছে, বেসিকে সামান্য কমেছে
রূপালী ব্যাংকের খেলাপি ঋণও গত ছয় মাসে বেড়েছে। গত ডিসেম্বর শেষে ব্যাংকটির খেলাপি ঋণ ছিল ১৯ হাজার ৬৩১ কোটি টাকা। জুন শেষে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৯ হাজার ৭৯০ কোটি টাকা। অর্থাৎ বেড়েছে ১৫৯ কোটি টাকা। একই সময়ে ব্যাংকটির প্রভিশন ঘাটতি ছিল ১০ হাজার ৭৫৩ কোটি টাকা।
অন্যদিকে বেসিক ব্যাংকের খেলাপি ঋণ কিছুটা কমেছে। গত ডিসেম্বর শেষে ব্যাংকটির খেলাপি ঋণ ছিল ৮ হাজার ২৫৪ কোটি টাকা। জুন শেষে তা কমে হয়েছে ৮ হাজার ১৫২ কোটি টাকা। অর্থাৎ কমেছে ১০২ কোটি টাকা। তবে ব্যাংকটির মোট ঋণের বিপরীতে খেলাপি ঋণের হার এখনো প্রায় ৭০ শতাংশের কাছাকাছি।
সোনালী ব্যাংকে খেলাপি কমলেও চাপ রয়ে গেছে
সোনালী ব্যাংকের খেলাপি ঋণও সামান্য কমেছে। গত ডিসেম্বর শেষে প্রায় ১৬ হাজার কোটি টাকা খেলাপি ঋণ থাকলেও জুন শেষে তা কমে হয়েছে ১৫ হাজার ৭১০ কোটি টাকা। তবে মোট ঋণের তুলনায় খেলাপির হার এখনো প্রায় ১৫ শতাংশের কাছাকাছি।
ব্যাংক কর্মকর্তারা জানান, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের আগে বিতরণ করা ঋণের একটি অংশ সময়ের সঙ্গে খেলাপি হয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বেক্সিমকো গ্রুপের দুটি প্রতিষ্ঠান ঋণ পরিশোধ বন্ধ করে দেয়। এতে প্রতিষ্ঠান দুটির প্রায় ১ হাজার ৫৪৪ কোটি টাকা খেলাপি হয়ে পড়ে।
হল-মার্ক কেলেঙ্কারির পর থেকেই সোনালী ব্যাংক নতুন ঋণ বিতরণে তুলনামূলক সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে ব্যাংকটির ঋণ বাড়ার পরিবর্তে প্রায় ১১ হাজার কোটি টাকা কমেছে। টানা পাঁচ বছর ধরে ব্যাংকটির ঋণ প্রবৃদ্ধি নেতিবাচক ধারায় রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
সম্প্রতি সোনালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের সঙ্গে বৈঠক করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। বৈঠকে ব্যাংকটির ঋণ বিতরণ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
সংস্কারে দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই
সরকার পরিবর্তনের পর রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর সংস্কার, সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও ঋণ আদায় জোরদারের বিষয়ে নানা উদ্যোগের কথা বলা হলেও প্রথম ছয় মাসে দৃশ্যমান বড় কোনো অগ্রগতি দেখা যায়নি।
সংশ্লিষ্টদের মতে, ব্যাংকগুলোর শীর্ষ পর্যায়ে নেতৃত্ব পরিবর্তনের সম্ভাবনা এবং দায়িত্বের মেয়াদ নিয়ে অনিশ্চয়তার কারণে অনেক ক্ষেত্রেই সিদ্ধান্ত গ্রহণে ধীরগতি তৈরি হয়েছে। ফলে ঋণ আদায়, নতুন ঋণ বিতরণ ও খেলাপি ঋণ কমানোর কার্যক্রমে কাঙ্ক্ষিত গতি আসছে না।
ব্যাংক কর্মকর্তারা বলছেন, পুরোনো বড় ঋণখেলাপিদের কাছ থেকে অর্থ আদায় এবং নতুন করে ঋণখেলাপি হওয়া ঠেকানো না গেলে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের চাপ কমানো কঠিন হবে।

প্রথম দর্পণ,ডেস্ক