সিরাজগঞ্জের সলঙ্গায় রাজমিস্ত্রী কাজের সন্ধানে গিয়ে চোর অপবাদে মধ্যযুগীয় কায়দায় নির্মম নির্যাতনের শিকার হয়েছেন মোঃ বাবু মিয়া (২৬) নামে এক যুবক।
কারেন্টের শর্ট ও দেশীয় অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে জোরপূর্বক মিথ্যা স্বীকারোক্তি আদায় এবং গাছে বেঁধে মারধরের দৃশ্য ধারণ করে সেই ভিডিও ফেসবুকে ছড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগে সলঙ্গা থানায় লিখিত অভিযোগ দিয়েছে ভুক্তভোগী বাবু।
গত মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) সলঙ্গা থানার হাটিকুমরুল ইউনিয়নের ধোপাকান্দি মৌজাস্থ ফুড সিটি হোটেলে এ ঘটনা ঘটে। ভুক্তভোগী বাবু মিয়া সলঙ্গা থানার নলকা ইউনিয়নের নলকা সেনগাতী গ্রামের মোঃ শহিদুল ইসলামের ছেলে। তিনি পেশায় একজন রাজমিস্ত্রী।
থানায় দায়ের করা লিখিত অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, কাজের সন্ধানে গত ১৮ আগস্ট ধোপাকান্দি এলাকার ফুড সিটি হোটেলে গিয়ে এক অপরিচিত ব্যক্তির সাথে রডমিস্ত্রী কাজের বিষয়ে কথা বলছিলেন বাবু। ওই সময় ধোপাকান্দি এলাকার মোঃ ফরিদ আলী (৪০)-র হুকুমে অজ্ঞাতনামা ১০ থেকে ১৫ জন লোক তাকে জোরপূর্বক একটি ঘরের ভেতর নিয়ে যায়।
সেখানে কারেন্টের শর্ট দেওয়া ও দেশীয় অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে তাকে চুরির কথা স্বীকার করতে বলা হয়।
অভিযোগে আরও উল্লেখ করা হয়, প্রাণের ভয়ে বাবু তাদের কথামতো মিথ্যা কথা স্বীকার করলে বিবাদীরা তাকে একটি আমগাছের সাথে রশি দিয়ে বেঁধে অতর্কিতভাবে শরীরের বিভিন্ন স্থানে মারধর করে এবং হত্যার উদ্দেশ্যে আঘাত করে।
উক্ত নির্যাতনের দৃশ্য অভিযুক্তরা নিজেদের মোবাইল ফোনে ভিডিও ধারণ করে এবং পরবর্তীতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে পোস্ট করে।
ভুক্তভোগী বাবু মিয়ার দাবি, তিনি কোনো চুরি করেননি এবং এই সম্পূর্ণ ঘটনাটি একটি সাজানো ষড়যন্ত্র। অভিযুক্তরা প্রভাবশালী ও খারাপ প্রকৃতির লোক হওয়ায় এবং টাকার বলে এই ঘটনা ঘটিয়ে সমাজে তার মান-সম্মান ক্ষুণ্ণ করেছে। বিবাদীদের ভয়ে এলাকার সাধারণ মানুষ প্রতিবাদ করার সাহস পায় না।
ঘটনার পর ভুক্তভোগী বাবু পরিবার ও স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গের পরামর্শে সলঙ্গা থানায় উপস্থিত হয়ে ১ নং বিবাদী মোঃ ফরিদ আলীসহ অজ্ঞাতনামা ১০ থেকে ১৫ জনের বিরুদ্ধে একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন।
অভিযুক্ত আলহাজ্ব ফরিদুল ইসলাম থানার ধোপাকান্দি গ্রামের মৃত আলহাজ আব্দুস সাত্তারের ছেলে। সে ন্যাশনাল ফুড সিটি হোটেলের মালিক।
অভিযোগের বিষয়ে মুঠোফোনে আলহাজ্ব ফরিদুল ইসলাম বলেন, এঘটনার ভিডিও সবাই দেখেছে এটা অস্বীকার করার কোন সুযোগ নাই। আমি তাকে আটক করেছি, আমাদের ভুল হয়েছে তাকে পুলিশে না দেয়া।
তার কাছে কোন চোরাই মালামাল পেয়েছিলেন কিনা জানাতে চাইলে তিনি পাননি বলে জানান।
চোরকে আটক করে পুলিশের হাতে তুলে নাদিয়ে মধ্যযুগিয় কায়দায় গাছের সাথে বেঁধে মারপিটের কথা জানতে চাইলে তিনি খেপে গিয়ে বলেন, আপনারা চোরের পক্ষ নিয়ে আমাদের হয়রানি করছেন।
উল্লেখ্য গত মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া কয়েকটি ভিডিওতে দেখা যায়, ন্যাশনাল ফুডসিটি হোটেলের মালিক আলহাজ ফরিদুল ইসলামের নির্দেশে ধোপাকান্দি পূর্বপাড়া গ্রামের মৃত আব্দুস সামাদ ড্রাইভারের ছেলে সাইদুলসহ আরও একজন বৃষ্টির মধ্যে এক যুবককে গাছের সঙ্গে দড়ি দিয়ে বাঁধছেন। এরপর একই গ্রামের আলতাফের ছেলে রিপন বৃষ্টিতে ভিজে ও খালি গায়ে হাতে লাঠি নিয়ে গাছের সঙ্গে হাত-পা বাঁধা ওই যুবককে পেটাচ্ছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ওই ভিডিওতে যুবককে বিভিন্ন প্রশ্ন করতেও দেখা যায় ধোপাকান্দি ন্যাশনাল ফুডসিটি হোটেলের মালিক আলহাজ ফরিদুল ইসলামকে।
এবিষয়ে ভুক্তভোগী বাবু ইসলাম তার নিজের শরীরের বিভিন্ন স্থানের মারের জখম হওয়া ক্ষতস্থান দেখিয়ে বলেন, চোরের অপবাদ দিয়ে আমাকে প্রায় এক ঘন্টা যাবত একটি ঘরের মধ্যে মারধর করেন। এবং আমাকে তারা মেরে ফেলার ভয় দেখিয়ে আমার কাছে থেকে স্বীকারোক্তি নেন। পরে তারা বাহিরে এনে একটি গাছের সাথে বেঁধে আবারো মারতে করেন এবং সেই মারের ভিডিও করে ফেসবুক সহ বিভিন্ন যায়গা ছেড়ে দেন। এর পর থেকে আমি এই মিথ্যা অপবাদের কারনে গ্রাম সমাজে বের হতে পারছি না। ফরিদুলসহ আমাকে যারা মিথ্যা অপবাদ দিয়ে মারধর করেছেন আমি তাদের শাস্তি চাই।
এ বিষয়ে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার রায়গঞ্জ সার্কেল সাইফুল ইসলাম খান অভিযোগের বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, ভুক্তভোগীর অভিযোগের ভিত্তিতে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

প্রথম দর্পণ,ডেস্ক