ইসলামি বিশ্বের মারাগা ও সমরকন্দের গণিত ও জ্যোতির্বিজ্ঞানকেন্দ্র এ বিকাশে বিশেষ অবদান রাখে। এসব কেন্দ্রে নিয়মিত আকাশ পর্যবেক্ষণ, গাণিতিক হিসাব ও মহাজাগতিক গতিবিধির মডেল তৈরির মাধ্যমে জ্যোতির্বিজ্ঞান ক্রমে একটি শক্তিশালী জ্ঞানশাস্ত্রে পরিণত হয়।
ধর্মীয় ও ব্যবহারিক প্রয়োজনইসলামি সমাজে জ্যোতির্বিজ্ঞানের গুরুত্ব বৃদ্ধির অন্যতম কারণ ছিল এর ব্যবহারিক প্রয়োজনীয়তা। নামাজের সময় নির্ধারণ, কিবলার দিক নির্ণয়, রমজানের শুরু নির্ধারণ এবং ইসলামি বর্ষপঞ্জি প্রণয়নে জ্যোতির্বিজ্ঞানের জ্ঞান প্রয়োজন হতো। ফলে এ শাস্ত্র কেবল দার্শনিক বা রাজদরবারের আলোচনায় সীমাবদ্ধ থাকেনি; মসজিদ ও মাদ্রাসাতেও এর চর্চা বিস্তৃত হয়।
অনেক মুসলিম জ্যোতির্বিজ্ঞানীর কাছে আকাশ পর্যবেক্ষণ ছিল সৃষ্টিজগতের শৃঙ্খলা এবং স্রষ্টার নিদর্শন অনুধাবনের একটি মাধ্যম। এ কারণে ইসলামি জ্ঞানচর্চায় জ্যোতির্বিজ্ঞান একই সঙ্গে ব্যবহারিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক মর্যাদা লাভ করে।
ইবনে সিনার হাত ধরে নতুন ধারাএই বুদ্ধিবৃত্তিক ধারায় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনেন ইবনে সিনা। তিনি জ্যোতির্বিজ্ঞানকে জ্যোতিষশাস্ত্র থেকে পৃথক করার চেষ্টা করেন। পর্যবেক্ষণ ও গাণিতিক প্রমাণের ওপর গুরুত্ব দিয়ে জ্যোতির্বিজ্ঞানকে একটি স্বতন্ত্র জ্ঞানক্ষেত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন। তবে তাঁর জ্যোতির্বিজ্ঞানচর্চা তখনও অ্যারিস্টটলের মহাবিশ্ব ও প্রকৃতিবিদ্যার ধারণার সঙ্গে যুক্ত ছিল।
পরবর্তী সময়ে ইমাম গাজ্জালি ও আদুদুদ্দিন আল-ইজি জ্যোতির্বিজ্ঞানের গাণিতিক সক্ষমতা ও ব্যবহারিক গুরুত্ব স্বীকার করলেও মহাবিশ্বের চূড়ান্ত বাস্তবতা সম্পর্কে সিদ্ধান্ত দেওয়ার ক্ষেত্রে এর সীমাবদ্ধতা রয়েছে বলে মনে করতেন। অর্থাৎ জ্যোতির্বিজ্ঞান আকাশের গতিবিধি নির্ভুলভাবে গণনা করতে পারলেও সৃষ্টিজগতের প্রকৃত স্বরূপ সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেওয়ার ক্ষমতা এর নেই—এমন ধারণা তাঁদের আলোচনায় প্রতিফলিত হয়।
মারাগায় তুসির অবদানমারাগা জ্যোতির্বিজ্ঞান বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা নাসিরুদ্দিন তুসি জ্যোতির্বিজ্ঞানকে আরও শক্তিশালী গাণিতিক ভিত্তির ওপর দাঁড় করানোর চেষ্টা করেন। তাঁর গবেষণা ও চিন্তায় জ্যোতির্বিজ্ঞানের গাণিতিক কাঠামো আরও সুসংহত হয়। তবে কিছু ক্ষেত্রে তিনিও অ্যারিস্টটলীয় প্রকৃতিদর্শনের ওপর নির্ভরশীল ছিলেন।
এরপর সৈয়দ শরিফ আল-জুরজানি জ্যোতির্বিজ্ঞানের মডেল ও বাস্তবতার সম্পর্ক নিয়ে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি উপস্থাপন করেন। তাঁর মতে, জ্যোতির্বিজ্ঞানে ব্যবহৃত মডেলগুলো কেবল হিসাব-নিকাশের সুবিধাজনক পদ্ধতি নয়; এগুলোর সঙ্গে বাস্তবতারও একটি সম্পর্ক রয়েছে।
এ আলোচনায় ‘নাফস আল-আমর’ ধারণাটি বিশেষ গুরুত্ব পায়। এর অর্থ হলো মানুষের চিন্তা বা ধারণার বাইরে বিদ্যমান বাস্তব অবস্থা। এ ধারণার মাধ্যমে জ্যোতির্বিজ্ঞানের গাণিতিক হিসাব ও মডেল বাস্তব জগত সম্পর্কে সত্য জ্ঞান দিতে পারে—এমন দৃষ্টিভঙ্গি আরও শক্তিশালী হয়।
আলী কুশজি ও জ্যোতির্বিজ্ঞানের স্বাতন্ত্র্যএই বুদ্ধিবৃত্তিক ধারার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়গুলোর একটি আসে আলী কুশজির মাধ্যমে। তিনি মনে করতেন, জ্যোতির্বিজ্ঞান কেবল হিসাব-নিকাশের কৌশল নয়; এর মাধ্যমে মহাবিশ্বের প্রকৃত শৃঙ্খলা এবং সৃষ্টিজগতের রহস্য সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করা সম্ভব।
আলী কুশজির বিশেষত্ব ছিল, জ্যোতির্বিজ্ঞানকে অ্যারিস্টটলীয় পদার্থবিদ্যা ও অধিবিদ্যার ওপর নির্ভরশীল রাখার প্রয়োজন তিনি দেখেননি। তাঁর মতে, ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য পর্যবেক্ষণ, অন্তর্দৃষ্টি ও গণিতের মাধ্যমে প্রকৃতি সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য জ্ঞান অর্জন করা সম্ভব।
ধর্মীয় চিন্তার বিরোধিতা না করেই, বরং আশআরী মতবাদের কার্যকারণ সম্পর্কের ধারণাকে গুরুত্ব দিয়ে আলী কুশজি জ্যোতির্বিজ্ঞানকে দর্শনের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা থেকে মুক্ত করার পথ তৈরি করেন। প্রকৃতিতে কোনো কারণ নিজে থেকেই অপরিহার্য নয়—এই ধারণা গ্রহণ করলে জ্যোতির্বিজ্ঞানকে অ্যারিস্টটলীয় পদার্থবিদ্যার কাঠামোর মধ্যেই আবদ্ধ থাকতে হবে, এমন বাধ্যবাধকতা থাকে না।
স্বতন্ত্র বিজ্ঞান হিসেবে প্রতিষ্ঠামুসলিম মনীষীদের এই দীর্ঘ বুদ্ধিবৃত্তিক ধারায় জ্যোতির্বিজ্ঞান ধীরে ধীরে একটি স্বতন্ত্র বৈজ্ঞানিক শাস্ত্র হিসেবে বিকশিত হয়। ইবনে সিনা জ্যোতির্বিজ্ঞানকে জ্যোতিষশাস্ত্র থেকে পৃথক করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। পরবর্তী সময়ে তুসি ও আল-জুরজানির মতো মনীষীদের চিন্তা ও গবেষণার ধারাবাহিকতায় বিষয়টি আরও সমৃদ্ধ হয়। আর আলী কুশজি জ্যোতির্বিজ্ঞানকে অ্যারিস্টটলীয় পদার্থবিদ্যা ও অধিবিদ্যার ওপর নির্ভরশীলতা থেকে মুক্ত করার পথে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেন।
ফলে ইসলামি বিশ্বের জ্ঞানচর্চায় জ্যোতির্বিজ্ঞান শুধু ধর্মীয় প্রয়োজনের সহায়ক কোনো বিদ্যা হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকেনি; পর্যবেক্ষণ, গণিত ও যুক্তিনির্ভর অনুসন্ধানের মাধ্যমে এটি একটি স্বতন্ত্র বৈজ্ঞানিক শাস্ত্র হিসেবে বিকাশ লাভ করে।
সূত্র: ডেইলি সাবাহ

প্রথম দর্পণ,ডেস্ক