জার্মান নাৎসি নেতা অ্যাডলফ হিটলারের জন্মস্থানে দীর্ঘদিনের বিতর্কের অবসান ঘটিয়ে সেখানে একটি পুলিশ স্টেশন চালু করেছে অস্ট্রিয়া। কর্তৃপক্ষের আশা, এর মাধ্যমে ভবনটিকে ঘিরে নব্য-নাৎসিদের সমাগম ও নাৎসি মতাদর্শের প্রকাশ ঠেকানো সম্ভব হবে।
১৮৮৯ সালের ২০ এপ্রিল অস্ট্রিয়ার ব্রাউনাউ আম ইন শহরের একটি ভাড়া বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন অ্যাডলফ হিটলার। জীবনের প্রথম কয়েক সপ্তাহ তিনি ওই বাড়িতেই কাটান। সম্প্রতি ভবনটিতে দেশটির পুলিশের একটি বিশেষ মাদকবিরোধী ইউনিটের কার্যালয় স্থাপন করা হয়েছে।
অস্ট্রিয়ার পুলিশ জানিয়েছে, জার্মানি সীমান্তঘেঁষা এই এলাকা মাদক পাচারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রুট। ফলে সেখানে পুলিশের স্থায়ী উপস্থিতি যেমন আইনশৃঙ্খলা জোরদার করবে, তেমনি ভবনটিকে কেন্দ্র করে অবৈধ নাৎসি প্রদর্শন ও চরমপন্থিদের কর্মকাণ্ডও নিয়ন্ত্রণ করা সহজ হবে।
প্রায় দুই কোটি ইউরো ব্যয়ে ভবনটির সংস্কারকাজ সম্পন্ন করা হয়েছে। সংস্কারের সময় সরিয়ে ফেলা ইট-পাথরের ধ্বংসাবশেষও গোপন স্থানে সংরক্ষণ করা হয়েছে, যাতে হিটলারপন্থীরা সেগুলো সংগ্রহ করে স্মারক হিসেবে ব্যবহার করতে না পারে।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অস্ট্রিয়ার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী গেরহার্ড কার্নার বলেন, “এই ভবনটি এখন থেকে গণতন্ত্র, আইনের শাসন ও নিরাপত্তার প্রতীক। তবে ইতিহাস কখনো মুছে যাবে না।”
স্থানীয়দের কাছে ভবনটি দীর্ঘদিন ধরেই ‘অশুভ গৃহ’ হিসেবে পরিচিত ছিল। প্রতিবছর হিটলারের জন্মদিনে নব্য-নাৎসি সমর্থকেরা সেখানে জড়ো হয়ে ফুল দেওয়া, ছবি তোলা এবং নাৎসি কায়দায় অভিবাদন জানানোর মতো কর্মকাণ্ড চালাত।
ভবনটির ভবিষ্যৎ ব্যবহার নিয়ে দীর্ঘদিন বিতর্ক চললেও বিশেষজ্ঞ কমিটি এটি ভেঙে ফেলার বিরোধিতা করে। তাদের মতে, ভবনটি ধ্বংস করলে ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় মুছে যাবে। আবার এটিকে জাদুঘরে রূপান্তর করলে সেটি নাৎসি অনুসারীদের জন্য আকর্ষণীয় তীর্থস্থানে পরিণত হতে পারে। তাই প্রশাসনিক বা সামাজিক কাজে ব্যবহারের সুপারিশ করা হয়।
জনমত জরিপেও অধিকাংশ অস্ট্রিয়ান নাগরিক ভবনটিকে রাজনৈতিক শিক্ষা বা প্রশাসনিক কাজে ব্যবহারের পক্ষে মত দেন।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
সতেরো শতকে নির্মিত ভবনটিতে একসময় সরাইখানা ও বিয়ার তৈরির কারখানা ছিল। ওপরের তলার একটি কক্ষে অল্প সময়ের জন্য ভাড়াটিয়া হিসেবে বসবাস করেছিল হিটলারের পরিবার। ২০১১ সাল পর্যন্ত এটি একটি প্রতিবন্ধী সেবা কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হলেও পরে ভবনটি পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে ছিল।
সম্প্রতি অসাধু হ্যাকাররা গুগল ম্যাপে ভবনটির ঠিকানার সঙ্গে ‘৮৮’ সংখ্যা যুক্ত করে দেয়, যা নব্য-নাৎসিদের সংকেত ভাষায় ‘হেইল হিটলার’-এর প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
এদিকে, জার্মানির মিউনিখে হিটলারের ব্যবহৃত ব্যক্তিগত অ্যাপার্টমেন্টও ১৯৪০-এর দশক থেকে পুলিশ স্টেশন হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
উল্লেখ্য, ১৯৩৮ সালে হিটলার অস্ট্রিয়াকে জার্মানির সঙ্গে একীভূত করেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে সাবেক নাৎসি সদস্যদের উদ্যোগে গঠিত সুদূর-ডানপন্থি ফ্রিডম পার্টি অব অস্ট্রিয়া (এফপিও) সাম্প্রতিক নির্বাচনে জয় পেলেও অন্য মূলধারার দলগুলোর বিরোধিতার কারণে সরকার গঠন করতে পারেনি। এই রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের মধ্যেই হিটলারের জন্মস্থানকে চরমপন্থী প্রচারণার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হওয়া থেকে রক্ষা করতে অস্ট্রিয়া সরকার ভবনটিকে পুলিশ স্টেশনে রূপান্তরের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করেছে।
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান

প্রথম দর্পণ,আন্তর্জাতিক ডেস্ক