বিলুপ্তির পথে কামারখন্দের ঐতিহ্যবাহী শীতলপাটি শিল্প

  • প্রথম দর্পণ,ডেস্ক
  • আপলোড সময় : ৩০ আগস্ট ২০২৬, ০১:৫৪ দুপুর
  • ৭৬৬৫ বার পড়া হয়েছে

Banner Ad
https://prothomdorpan.com/admin/fav-icon-logo/image/1761146741.250..125.jpg
একসময় গ্রামবাংলার ঘরে ঘরে ছিল শীতলপাটির ব্যাপক কদর। গরমের দিনে মাটির ঘরের মেঝে কিংবা বারান্দায় শীতলপাটি বিছিয়ে স্বস্তি পেতেন মানুষ। অতিথি আপ্যায়ন থেকে শুরু করে দৈনন্দিন নানা কাজে ব্যবহৃত হতো দেশীয় ঐতিহ্যের এই পাটি। তবে আধুনিকতার প্রভাব, প্লাস্টিক ও কৃত্রিম উপকরণের সহজলভ্যতা, কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি এবং কারিগদের অনাগ্রহে সিরাজগঞ্জের কামারখন্দে ধীরে ধীরে হারিয়ে যেতে বসেছে ঐতিহ্যবাহী শীতলপাটি শিল্প।

স্থানীয়ভাবে শীতলপাটি তৈরির সঙ্গে জড়িত মননজয় চন্দ্র বলেন, একসময় শীতলপাটির চাহিদা ছিল অনেক বেশি। পরিবারের নারীরা অবসর সময়ে পাটি বুনে বাড়তি আয় করতেন। একটি পাটি তৈরিতে কয়েক দিন থেকে এক সপ্তাহ পর্যন্ত সময় লাগলেও সে অনুযায়ী ন্যায্য মূল্য পাওয়া যায় না। ফলে অনেকেই বাধ্য হয়ে এ পেশা ছেড়ে অন্য কাজে চলে যাচ্ছেন।

আরেক কারিগর অনিতা রাণী বলেন, কাঁচামালের দাম বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি শ্রমের তুলনায় পারিশ্রমিক কম। এর ওপর বাজারে আধুনিক ম্যাট ও প্লাস্টিকের পণ্যের আধিপত্য শীতলপাটি শিল্পের জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এতে নতুন প্রজন্মও এ কাজ শেখার প্রতি আগ্রহ হারাচ্ছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে অদূর ভবিষ্যতে কামারখন্দ থেকে শীতলপাটি তৈরির ঐতিহ্য হারিয়ে যেতে পারে।

স্থানীয় প্রবীণ বিল্লু চন্দ্র বলেন, শীতলপাটি শুধু একটি ব্যবহার্য সামগ্রী নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে গ্রামীণ সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও মানুষের জীবনযাত্রা। একসময় বিয়ে, সামাজিক অনুষ্ঠান ও অতিথি আপ্যায়নে শীতলপাটির বিশেষ গুরুত্ব ছিল। কিন্তু আধুনিক নানা পণ্যের ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় বর্তমানে এর চাহিদা ও ব্যবহার অনেকটাই কমে গেছে।

সচেতন মহলের মতে, কামারখন্দের ঐতিহ্যবাহী শীতলপাটি শিল্প টিকিয়ে রাখতে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগ জরুরি। কারিগদের প্রশিক্ষণ, সহজ শর্তে ঋণ, প্রয়োজনীয় কাঁচামালের নিশ্চয়তা, ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা এবং দেশ-বিদেশে বাজার সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া গেলে এ শিল্প আবারও ঘুরে দাঁড়াতে পারে।

কারিগর পূর্ণিমা রাণী বলেন, যথাযথ উদ্যোগ ও পৃষ্ঠপোষকতা পেলে কামারখন্দের হারিয়ে যেতে বসা শীতলপাটি শিল্পে নতুন প্রাণ ফিরবে। এই ঐতিহ্য রক্ষা করা গেলে একদিকে যেমন বহু পরিবারের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে, অন্যদিকে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা গ্রামীণ কারুশিল্পও টিকে থাকবে।

কামারখন্দ উপজেলা পল্লী উন্নয়ন কর্মকর্তা আব্দুর রাজ্জাক বলেন, কামারখন্দের তৈরি শীতলপাটি দেশের বিভিন্ন স্থানে বিক্রি করেন কারিগরা। বর্তমানে প্রায় ৩০০ পরিবার এ কাজের সঙ্গে জড়িত। ঐতিহ্যবাহী শীতলপাটি তৈরিতে আধুনিক যন্ত্রপাতির ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে কারিগদের দক্ষতা বাড়াতে আধুনিক ও মানসম্মত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে।

তিনি আরও বলেন, শীতলপাটির বাজারজাতকরণ ও প্রচার-প্রচারণার জন্য কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি কারিগর ও উদ্যোক্তাদের সহজ শর্তে স্বল্প সুদে ঋণ সুবিধা দেওয়া প্রয়োজন।

সিরাজগঞ্জের জেলা প্রশাসক আমিনুল ইসলাম বলেন, জেলার প্রাচীন ঐতিহ্য ও কারিগদের সুরক্ষায় প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে। বিশেষ করে কারিগদের সহজ শর্তে ঋণ সুবিধা এবং তৈরি পণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে বিপণন সহায়তার উদ্যোগ নেওয়া হবে।

স্থানীয়দের প্রত্যাশা, সমন্বিত উদ্যোগ ও কার্যকর পৃষ্ঠপোষকতার মাধ্যমে কামারখন্দের হারিয়ে যেতে বসা শীতলপাটি শিল্প আবারও তার পুরোনো ঐতিহ্য ফিরে পাবে।




কমেন্ট করুন:

ফেসবুকে আমরা
সর্বশেষ সংবাদ
Sidebar Ad